Published : 05 Jul 2026, 02:21 PM
সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট ও সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধ। এর অদ্ভুত গঠন ও রহস্যময় অবস্থান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দীর্ঘকাল ধরে বিভ্রান্ত করে রেখেছে। বর্তমান বিজ্ঞানের প্রচলিত গাণিতিক মডেল অনুসারে এ গ্রহটির অস্তিত্বই থাকার কথা নয়।
কেন বুধ এত ব্যতিক্রম? ২০২৬ সালে সালের নতুন মহাকাশ অভিযান কোটি বছরের এ মহাজাগতিক ধাঁধার জট খুলতে পারে।
বিবিসি লিখেছে, গ্রহটি এর আকারের তুলনায় সূর্যের অনেক বেশি কাছে অবস্থিত। একইসঙ্গে গ্রহ তৈরির প্রচলিত নিয়মগুলোর কোনোটিই বুধ মেনে চলে না।
দেখলে মনে হতে পারে সৌরজগতের সবচেয়ে একঘেয়ে বা নিরস গ্রহ বুধ। এর রুক্ষ পৃষ্ঠে তেমন কিছু নেই; অতীতে কখনো পানি থাকার প্রমাণ মেলেনি এবং এর বায়ুমণ্ডলও বেশ পাতলা। এ গ্রহের উত্তপ্ত জ্বালামুখগুলোর মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। তবুও গভীরভাব পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বুধ আসলে এক বিস্ময়কর ও রহস্যময় জগত।
অদ্ভুত গ্রহটি আকারে অনেক ছোট, পৃথিবীর তুলনায় ২০ ভাগের এক ভাগ মাত্র ভর ও চওড়ায় বড়জোর অস্ট্রেলিয়ার সমান। অথচ বড় এক ধাতব কেন্দ্রের কারণে ঘনত্বের দিক থেকে পৃথিবীর পরেই সৌরজগতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গ্রহ বুধ। গ্রহটির ভরের সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে এর ধাতব কেন্দ্র।
সূর্যের খুব কাছাকাছি বুধের এ অবস্থানটিও বেশ অদ্ভুত, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেন না। এসবকিছুই একটি মূল বিন্দুতে এসে মেলে, যেখানে আমরা আসলে জানি না বুধ গ্রহটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল। আমাদের জানা তথ্য অনুসারে, গ্রহটির অস্তিত্বই থাকার কথা নয়।
ফ্রান্সের ‘ইউনিভার্সিটি অফ বোর্দো’র গ্রহ গঠন ও গতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ শন রেমন্ড বলেছেন, “আমাদের চোখের সামনেই খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু সূক্ষ্ম বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে, যা আমরা ধরতে পারছি না। বিষয়টি লজ্জাজনক।”
বুধ আসলে কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে তৈরি হয়েছে ও কেন গ্রহটি দেখতে এমন তা সৌরজগতের অন্যতম বড় রহস্য। তবে, আশা করা যায়, এ রহস্যের কিছু উত্তর শিগগিরই মিলবে।
২০১৮ সালে ইউরোপ ও জাপানের যৌথ উদ্যোগে ‘বেপিকলম্বো’ নামে এক মহাকাশযান বুধের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপিত হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় পর এটাই হবে বুধ গ্রহে মানুষের পাঠানো প্রথম কোনো যান।
থ্রাস্টার বা ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে মহাকাশযানটি পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হলেও ২০২৬ সালের নভেম্বরে তা বুধের কক্ষপথে প্রবেশ করবে। এ মিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, বুধের উৎপত্তির সঠিক রহস্য খুঁজে বের করা।
বুধ কীভাবে গঠিত হয়েছিল তা জানা কেবল সৌরজগতের ইতিহাস বোঝার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং অন্যান্য তারাকে ঘিরে থাকা গ্রহ বা ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ সম্পর্কে জানার জন্যও জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ বা এমআইটি’র গ্রহবিজ্ঞানী সাভেরিও ক্যাম্বিওনি বলেছেন, “অদ্ভুত গঠনের কারণে সম্ভবত বুধ আমাদের সৌরজগতের এমন এক গ্রহ, যা দেখতে অনেকটা ভিনগ্রহের মতো। গ্রহটি সত্যিই চমৎকার এক জগত।”
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম বুধের অস্বাভাবিকতা টের পান ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে। ওই সময় নাসার ‘মেরিনার ১০’ নামের মহাকাশযানটি তিনবার এই গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যায়।
সৌরজগতের সবচেয়ে ভেতরের এ গ্রহে সেটিই ছিল মানুষের প্রথম অভিযান। সেই ফ্লাইবাই বা পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া থেকে প্রাপ্ত মহাকর্ষীয় বিভিন্ন পরিমাপ বুধের ভেতরের গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের প্রথম ধারণা দেয় এবং এর অদ্ভুত অভ্যন্তরীণ রূপ উন্মোচন করে।
পৃথিবী, শুক্র ও মঙ্গল এ প্রতিটি গ্রহের কেন্দ্রে লোহাওয়ালা ‘কোর’ বা কেন্দ্র রয়েছে, যা বিভিন্ন গ্রহের ব্যাসার্ধের প্রায় অর্ধেক। পৃথিবীর ক্ষেত্রে এ কেন্দ্রটি দুটি স্তরে বিভক্ত, কঠিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র ও তরল বহিঃস্থ কেন্দ্র। এ তরল অংশটি ক্রমাগত ঘূর্ণনের ফলে পৃথিবীর আশপাশে সুরক্ষামূলক চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। এর উপরে রয়েছে ম্যান্টল এবং সবার উপরে ভূত্বক বা ক্রাস্ট, এখানে আমরা বাস করি।
তবে বুধের গঠন সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে গ্রহটির কেন্দ্র বা কোর এর ব্যাসার্ধের প্রায় ৮৫ শতাংশ জুড়ে অবস্থিত, যার উপরে পাথর ও মাটির স্তর (ম্যান্টল ও ক্রাস্ট) খুবই পাতলা। এ বড় কেন্দ্রটির কারণেই গ্রহটি এত বেশি ঘন। তবে কেন এর গঠন এমন তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
বার্লিনের জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টারের গ্রহবিজ্ঞানী নিকোলা তোসি বলেছেন, “বুধের গঠন বড় অমীমাংসিত এক সমস্যা। গ্রহটি কেন দেখতে এমন তা এখনও রহস্য।”
পরবর্তীতে নাসার ‘মেসেঞ্জার’ মিশন ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বুধকে প্রদক্ষিণ করে, যা রহস্য কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সূর্য থেকে কেবল ৬ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রহে দিনের বেলা তাপমাত্রা ৪৩০° সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে, আবার রাতে তা নেমে মাইনাস ১৮০° সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়।
তাপমাত্রার এত প্রচণ্ড ওঠানারর পরও ‘মেসেঞ্জার’ মহাকাশযান বুধের পৃষ্ঠে পটাশিয়াম ও তেজস্ক্রিয় থোরিয়ামের মতো উদ্বায়ী উপাদানের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। সূর্যের বিকিরণে এসব উপাদান অনেক আগেই বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার কথা ছিল।
এ ছাড়া ক্লোরিনের মতো জটিল অণু ও গ্রহটির মেরু অঞ্চলের ছায়াবৃত বিভিন্ন জ্বালামুখে জমাট বরফের উপস্থিতিও লক্ষ্য করেছে। এ ধরনের আবিষ্কারগুলো এমন ধারণাকে আরও জোরালো করেছে, বুধ আসলে সূর্যের এতো কাছের থাকার কথা নয়। কারণ মহাকাশের এ অঞ্চলে বুধের মতো গ্রহ তৈরি হওয়াই প্রায় অসম্ভব।
তারার আশপাশে ধূলিকণা ও গ্যাসের চাকতির মতো স্তর থেকেই সৌরজগতের জন্ম হয়। ধীরে ধীরে এসব গ্রহ সেই ধূলিকণা সরিয়ে নিজেদের জায়গা করে নেয় এবং আশপাশের বিভিন্ন উপাদান শুষে নিয়ে আকারে বড় হতে থাকে।
গ্রহ তৈরির গাণিতিক মডেল অনুসারে, শুক্র গ্রহ থেকে বুধের দূরত্ব এতটাই বেশি যে এ তত্ত্ব এখানে খাটে না। বিজ্ঞানীরা অনেক চেষ্টা করেও বর্তমানের বুধ গ্রহকে তাদের হিসাবে ফেলতে পারছেন না।
গবেষক শন রেমন্ডের ভাষায়, এমনটি বিরক্তিকর এক সমস্যা; হিসাব করলে দেখা যায় এমন গ্রহের অস্তিত্বই থাকার কথা নয়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে বুধের গঠন নিয়ে নানা নতুন মডেল ও ধারণা পরীক্ষা করছেন। যার মধ্যে প্রধান ধারণা, বুধ আগে অনেক বড় ছিল। সম্ভবত বর্তমান আকারের দ্বিগুণ ও প্রায় মঙ্গল গ্রহের সমান। বুধ হয়ত সূর্য থেকেও অনেকটা দূরে অবস্থিত ছিল।
বুধ গ্রহে পাওয়া পটাশিয়াম ও থোরিয়ামের মাত্রা এ ধারণাকে সমর্থন করে। কারণ এসব উপাদানের পরিমাণ মঙ্গল গ্রহের সঙ্গে বেশি মেলে। আর মঙ্গল সূর্য থেকে বেশ দূরে গঠিত হয়েছিল।
তত্ত্বটি হচ্ছে, জন্মের প্রথম ১ কোটি বছরের কোনো এক সময়ে এ আদি-বুধ অন্য কোনো বড় বস্তুর সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেয়েছিল। সম্ভবত সেটি ছিল মঙ্গল গ্রহের আকারেরই অন্য কোনো গ্রহ। সেই প্রচণ্ড সংঘর্ষের ফলে বুধের উপরের বিভিন্ন স্তর, অর্থাৎ এর ভূত্বক ও শিলাস্তর ছিন্নভিন্ন হয়ে মহাকাশে হারিয়ে যায়। পড়ে থাকে কেবল লোহাওয়ালা ঘন কেন্দ্রটি, যা আজকের বুধ গ্রহের প্রধান অংশ।
‘ফ্রান্সের কোত দ্য আজুর অবজারভেটরি’র বিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো মরবিডেলি বলেছেন, বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ ব্যাখ্যার দিকেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছেন। সাধারণ ধারণা, বুধ বড় আকারের সংঘর্ষের শিকার হয়েছিল, যার ফলে এর শিলাস্তরের বেশিরভাগ অংশই অপসারিত হয়ে গেছে।
তবে সংঘর্ষটি এমনভাবে পাশ ঘেঁষে হয়েছে, যাতে বুধ পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে যায়। বিজ্ঞানী ক্যাম্বিওনি বলেছেন, আদি সৌরজগতে সংঘর্ষ হওয়া খুব সাধারণ ঘটনা হলেও বুধ থেকে এত বেশি পরিমাণ উপাদান সরিয়ে ফেলার জন্য ঘণ্টায় ২ লাখ ২৪ হাজার মাইল বা সেকেন্ডে ১০০ কিলোমিটার বেগের প্রচণ্ড ধাক্কার প্রয়োজন।
তবে মহাকাশের বিভিন্ন বস্তু তখন একই দিকে ও প্রায় কাছাকাছি গতিতে সূর্যের আশপাশে ঘুরছিল, ঠিক যেমন গোলচত্বরে গাড়িগুলো ঘোরে। ফলে এত উচ্চগতিতে সংঘর্ষ হওয়ার ঝুঁকি বেশ কম।
এ ছাড়া, এমন বিধ্বংসী সংঘর্ষে থোরিয়ামের মতো উদ্বায়ী বিভিন্ন উপাদানেরও বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা। তবে ‘মেসেঞ্জার’ মহাকাশযান সেসব উপাদান ঠিকই খুঁজে পেয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় বিস্ফোরণের পরও সেগুলো সেখানে টিকে রইল কীভাবে?
কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই এসব উপাদান বুধের পৃষ্ঠে কীভাবে টিকে আছে তা এখনও রহস্য। যুক্তরাজ্যের ‘ওপেন ইউনিভার্সিটি’র গ্রহবিজ্ঞানী ডেভিড রদারি ‘বেপিকলম্বো’ মহাকাশযানের ‘মার্কারি ইমেজিং এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার’ নামের বিশেষ এক যন্ত্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “সূর্যের এত কাছে অবস্থিত কোনো বস্তুতে এত বিপুল পরিমাণ উদ্বায়ী উপাদান থাকার কথা নয়। তাহলে কি বুধ আসলে সূর্য থেকে অনেক দূরে তৈরি হতে শুরু করেছিল? নাকি যেসব উপাদান দিয়ে বুধ গঠিত হয়েছে সেগুলো অনেক দূর থেকে এসেছিল?”

বুধ হয়ত নিজে কোনো ধাক্কা খায়নি, বরং সে নিজেই ছিল এক ‘কামানগোলা’, যা শুক্রের মতো অন্য কোনো গ্রহকে গিয়ে ধাক্কা মেরেছিল এবং এরপর বর্তমান অবস্থানে এসে থিতু হয়েছে।
এ ধারণাটি বেশ জোরালো, কারণ এমন ‘হিট-অ্যান্ড-রান’ বা ধাক্কা দিয়ে চলে যাওয়া সংঘর্ষের মাধ্যমে বুধের উপরের শিলাস্তর ঝরিয়ে ফেলা অনেক সহজ।
বেলজিয়ামের লিউভেনের ‘ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি’র ভূতত্ত্ববিদ অলিভিয়ের নামুর বলেছেন, “বুধ নিজে ধাক্কা খাওয়ার চেয়ে অন্যকে ধাক্কা দিয়েছিল এ তত্ত্বটি দিয়ে এর গঠন ব্যাখ্যা করা বেশি সহজ।”
আদি সৌরজগতে বুধই একমাত্র গ্রহসম আকৃতির বস্তু ছিল না, যা এভাবে উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুটে বেড়াচ্ছিল। পৃথিবীর চাঁদও একইভাবে তৈরি হয়েছে। ‘থিয়া’ নামে মঙ্গল গ্রহের আকারের এক বস্তু আদি পৃথিবীকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে পৃথিবীর বড় অংশ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল।
তবে বুধের এসব সংঘর্ষ তত্ত্বগুলোতে একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়, বিস্ফোরণের ফলে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়া পাথুরে ধ্বংসাবশেষগুলো কেন পুনরায় গ্রহের ওপর আছড়ে পড়ল না? বা সেগুলো কেন বুধের কোনো চাঁদ তৈরি করল না? কারণ, বুধের কোনো চাঁদ নেই।
একটি কারণ হতে পারে ‘কলিশনাল গ্রাইন্ডিং’ নামের প্রক্রিয়া। এর মানে, সংঘর্ষের ফলে বুধ থেকে যেসব অংশ ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল সেগুলো নিজেদের মধ্যে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধুলোয় পরিণত হয়। পরবর্তীতে সূর্যের তীব্র সৌর বায়ুর ধাক্কায় সেসব ধুলা মহাকাশে ভেসে দূরে চলে যায়।
কানাডার ‘ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো’র গ্রহ গঠন বিশেষজ্ঞ জেনিফার স্কোরা বলেছেন, “কলিশনাল গ্রাইন্ডিং হচ্ছে, ধ্বংসাবশেষগুলো নিজেরাই নিজেদের পিষে ছোট থেকে আরও ছোট টুকরোয় পরিণত হওয়া। ফলে শেষ পর্যন্ত আমরা এমন এক বুধ গ্রহ পাই, যা আকারে ছোট হলেও ঘনত্বে অনেক বেশি। তবে এমনটি কার্যকর হতে হলে বিচূর্ণ হওয়ার হার অনেক বেশি হতে হবে, যা আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি হতে পারে।”
আরেকটি ধারণা হচ্ছে, বুধের ক্ষেত্রে হয়ত বড় কোনো সংঘর্ষই ঘটেনি। পরিবর্তে, বুধ আসলে সূর্যের কাছাকাছি থাকা এমন কিছু উপাদান থেকে তৈরি হয়েছিল, যাতে লোহার পরিমাণ অনেক বেশি ছিল।
এ তত্ত্বটিকে সমর্থন করেছেন ডেনমার্কের ‘ইউনিভার্সিটি অফ কোপেনহেগেন’ ও সুইডেনের ‘লুন্ড ইউনিভার্সিটি’র বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডার্স জোহানসন।
এ তত্ত্ব অনুসারে, বুধ সৌরজগতের এমন এক অঞ্চলে তৈরি হয়েছিল, যা অন্যান্য গ্রহের তুলনায় বেশি উত্তপ্ত ছিল। তরুণ সূর্যের প্রচণ্ড তাপে বুধের অবস্থানে থাকা হালকা বিভিন্ন ধূলিকণা বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যায় এবং কেবল ভারী লোহাওয়ালা উপাদানগুলোই সেখানে অবশিষ্ট ছিল, যা জমাট বেঁধে বুধ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞ জোহানসন বলেছেন, “এভাবেও লোহাওয়ালা একটি গ্রহ তৈরি হওয়া সম্ভব।”
তবে এখানেও কিছু সমস্যা আছে। এ তত্ত্ব সত্যি হলে বুধ বর্তমানের এ ছোট আকারে কেন থেমে গেল? আশপাশের লোহাওয়ালা বিভিন্ন উপাদান শুষে নিয়ে তা আরও বড় হলো না কেন?
বিশেষজ্ঞ জোহানসনের মতে, সেখানে তখন অনেক উপাদান ছিল। ফলে বুধ কেন আজকের মতো এত ছোট রয়ে গেল তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বুধের উৎপত্তি নিয়ে আরও একটি তত্ত্ব আছে, যেখানে ধারণা করা হয়, সৌরজগতের ভেতরের বিভিন্ন গ্রহ এখন যেখানে আছে সেখানে তৈরি হয়নি, বরং এরা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
সৌরজগতের একটি মডেল অনুসারে, বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল এ চারটি গ্রহ সূর্যের আশপাশের দুটি আলাদা ধূলিকণার বলয় বা রিং থেকে তৈরি হয়েছিল। পৃথিবী ও শুক্র গ্রহ বুধের সঙ্গেই ভেতরের বলয়টিতে তৈরি হয় তবে পরে এরা দূরে সরে যায়। তবে কম ভরের কারণে বুধ একা সেখানেই পড়ে থাকে।
এ ছাড়া আরও কিছু অদ্ভুত ধারণা রয়েছে। যেমন, বুধ আসলে কোনো পাথুরে গ্রহ নয়, বরং বৃহস্পতির মতো কোনো গ্যাস দানব গ্রহের নগ্ন কেন্দ্র, যার বায়ুমণ্ডল কোনোভাবে হারিয়ে গেছে। এমন ধারণা আগে দেওয়া হলেও বিজ্ঞানী ক্যাম্বিওনি মনে করেন এর সম্ভাবনা খুব কম। কারণ, বিশাল অভিকর্ষ বলের কারণে বৃহস্পতির মতো বড় গ্রহের বায়ুমণ্ডল পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা খুব কঠিন।
এসব তথ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনেক সূত্র দিলেও বুধ কীভাবে গঠিত হয়েছিল সে সম্পর্কে এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে ‘বেপিকলম্বো’ মিশন হয়ত কিছু উত্তর দিতে পারবে।
এই মিশনে আসলে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা বা ইএসএ ও জাপানি মহাকাশ সংস্থা জাক্সা’র তৈরি দুটি মহাকাশযান একসঙ্গে যোগ হয়ে কাজ করছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে বুধের কক্ষপথে প্রবেশের পর যান দুটি আলাদা হয়ে যাবে।
এরপর এরা নিজেদের উন্নত যন্ত্রপাতির সাহায্যে বুধের পৃষ্ঠের গঠন ম্যাপ এবং গ্রহটির মহাকর্ষ ও দুর্বল চৌম্বক ক্ষেত্রসহ অন্যান্য বিষয় বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
এ বছরের শুরুতে বুধের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ‘বেপিকলম্বো’ যেসব ছবি পাঠিয়েছে তাতে সেই প্রাচীন ম্যাগমা সমুদ্রের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ এখনও মেলেনি।
তবে ছবিতে গ্রহটির পৃষ্ঠজুড়ে অসংখ্য উল্কাপাতের চিহ্ন ও প্রাচীন লাভার স্রোতের দাগ দেখা গেছে। প্রায় ৩৭০ কোটি বছর আগের লাভা বন্যার অবশিষ্টাংশও সেখানে স্পষ্ট, যা কালক্রমে শক্ত হয়ে সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং পুরানো বিভিন্ন জ্বালামুখ ভরাট করে ফেলেছে।
এমনটি ম্যাগমা সমুদ্রের তুলনায় অনেক পরের ঘটনা হলেও এ সমতল পৃষ্ঠের ওপরের বিশেষ ধরনের ‘কুঁচকানো’ বিভিন্ন দাগ থেকে ইঙ্গিত মেলে, গত কয়েকশ কোটি বছরে ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রহটি নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়ে গেছে।
বুধের উৎপত্তি পুরোপুরি বুঝতে বিজ্ঞানীরা একদিন এ গ্রহে মহাকাশযান অবতরণ বা ল্যান্ড করার স্বপ্ন দেখেন। আপাতত অদূর ভবিষ্যতে এমন কোনো ল্যান্ডার মিশনের পরিকল্পনা নেই। তবে কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে।
ল্যান্ডারের বদলে এখন বিজ্ঞানীদের সেরা আশা হচ্ছে, বুধ থেকে আসা কোনো উল্কাপিণ্ড খুঁজে পাওয়া। এমনটি অসম্ভব নয়, কারণ পৃথিবীতে মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা শত শত উল্কাপিণ্ড মিলেছে। তবে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বুধ বা শুক্র থেকে আসা কোনো উল্কাপিণ্ড পাওয়া যায়নি।
আপাতত বুধের উৎপত্তির ধাঁধাটি অমীমাংসিতই রয়ে গেল। বাইরে থেকে দেখতে বুধ হয়ত গর্তে ভরা এক ধূসর ও নিস্প্রাণ জগত। তবে এ রহস্যময় গ্রহটির গভীর সম্ভবত সৌরজগতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোর একটি।
গবেষক স্কোরার মতে, “বুধ হয়ত স্রেফ এক অসম্ভাব্য গ্রহ, যা মহাবিশ্বের অন্য কোনো সময়ের হিসেবে অস্তিত্বহীন হলেও আমাদের এই সৌরজগতে বুক ফুলিয়ে টিকে আছে।”