Published : 04 Jul 2026, 01:19 PM
অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) বা বাতিকগ্রস্ত আচরণ সম্পর্কে চিরাচরিত ধারণা বদলে দিয়েছে সাম্পতিক এক গবেষণা, যেখানে ওসিডি’র আসল কারণ খুঁজে বের করার দাবি করেছেন গবেষকরা।
‘ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনি’ বা ইউটিএস-এর নতুন এক গবেষণা মানুষের ‘কমপালসিভ’ বা তাড়নামূলক আচরণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন ধারণা দিয়েছে।
ওসিডি এমন এক আচরণ যা মানুষ বারবার করতে থাকেন, এমনকি সেই কাজের ফলে নিজের ক্ষতি হতে পারে এমন জেনেও তারা তা থামাতে পারেন না, বারবার একই কাজ করেন।
এ ধরনের আচরণ ওসিডি, মাদকাসক্তি ও জুয়া খেলার মতো সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, মানুষ যখন কোনো ‘অভ্যাসের চক্রে’ আটকে যায় তখন ওসিডির মতো আচরণ করে। যা করছে তা কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই করে ফেলছে। বিষয়টি অনেকটা ‘অটোপাইলট’ মোডে থাকার মতো। এসব অভ্যাস এতটাই শক্তিশালী হয়ে যায় যে, তা ভাঙা সম্ভব হয় না। ফলে নিজের কাজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তারা।
তবে ইঁদুরের ওপর করা নতুন এ গবেষণায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণার ইঙ্গিত মিলেছে, যেখানে উঠে এসেছে, মস্তিষ্কের ‘স্ট্রিয়াটাম’ নামের অংশে প্রদাহের কারণে আসলে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে যায় এবং প্রতিটি কাজ অনেক বেশি চিন্তা করে করতে গিয়ে আটকে পড়ে। স্ট্রিয়াটাম মস্তিষ্কের এমন এক অংশ, যা দেহের নড়াচড়া ও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
এসব অভ্যাস সাধারণত আমাদের কীভাবে সাহায্য করে তা নিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনি’র আচরণগত স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. লরা ব্র্যাডফিল্ড।
তিনি বলেছেন, আমরা যখন দাঁত মাজি বা পরিচিত কোনো রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাই তখন আমাদের খুব বেশি চিন্তার প্রয়োজন হয় না। বিষয়টি আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে, যাতে আমরা অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে পারি।
তবে হঠাৎ অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে, যেমন কোনো শিশু দৌড়ে রাস্তার মাঝখানে চলে এলে তখন আমরা দ্রুত অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসে পুরোপুরি সচেতন হয়ে যাই এবং পরবর্তী পদক্ষেপে কী করতে হবে তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি।
বারবার হাত ধোয়া বা জুয়া খেলার নেশার মতো বাধ্যতামূলক আচরণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, মানুষ অভ্যাসের চক্রে আটকে সচেতনভাবে তা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তবে নতুন গবেষণা বলছে, বিষয়টি সম্ভবত আরও জটিল।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নিউরোসাইকোফার্মাকোলজি’-তে।
পিএইচডি কাজের অংশ হিসাবে এ গবেষণা দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ড. আরভি আবিয়েরো। ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রদাহ তৈরির পর কী ঘটে তা পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। এ প্রদাহটি তৈরি করা হয়েছে মস্তিষ্কের ‘স্ট্রিয়াটাম’ অংশে।
গবেষকদের অনুমান ছিল, এ প্রদাহের ফলে ইঁদুরগুলোর মধ্যে অভ্যাসগত আচরণ আরও বেড়ে যাবে। তবে বাস্তবে দেখা গেল উল্টো। এসব ইঁদুর আসলে আরও বেশি চিন্তা-ভাবনা বা পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে শুরু করল। যেসব ক্ষেত্রে অভ্যাসের বসে কাজ করার কথা ছিল, সেখানেও তারা বারবার পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের কাজ পরিবর্তন বা সমন্বয় করেছে।
ইঁদুরগুলোর কাজ আরও যান্ত্রিক বা সয়ংক্রিয় হওয়ার বদলে সেগুলো আরও বেশি লক্ষ্য-নির্ধারিত হয়ে উঠল। গবেষণার ফলাফলে ইঙ্গিত মেলে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক আচরণ মোটেও চিন্তা-ভাবনাহীন কোনো অভ্যাস নয়, বরং এগুলো হতে পারে অতিরিক্ত সচেতন প্রচেষ্টার ফল, যা সঠিক পথে পরিচালিত হচ্ছে না।
যেমন একজন ব্যক্তি বারবার হাত ধোয়ার কাজ করছেন, তিনি হয়ত যান্ত্রিক বা অভ্যাসের বশে তা করছেন না, বরং তিনি জীবাণু নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন বলেই এমনটি করছেন। তিনি সচেতনভাবেই কাজটি করার চেষ্টা করছেন। তবে এ কাজটি তাকে মানসিক প্রশান্তি দিচ্ছে না, তার দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করছে না।
গবেষণার ফলাফল তাড়নামূলক ব্যাধি বা কমপালসিভ ডিসঅর্ডারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন চিকিৎসা সাধারণত মানুষের এমন অভ্যাস ভেঙে ফেলার ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে কিছু ওসিডি যদি অতিরিক্ত সচেতন বা পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণের কারণে ঘটে থাকে তবে চিকিৎসকদের হয়ত ভিন্ন সমাধানের প্রয়োজন হতে পারে।