Published : 04 Jul 2026, 05:12 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালাতে প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার অবকাঠামো দ্রুত বাড়াচ্ছে বড় সব প্রযুক্তি কোম্পানি। তবে, এ বিস্তারে সম্ভবত সবচেয়ে আগ্রাসী কোম্পানিটি গুগল। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে গুগলের এই সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পানি ব্যবহার, বিদ্যুৎ চাহিদা, কার্বন নিঃসরণ এবং সম্ভাব্য বায়ুদূষণ নিয়ে নতুন উদ্বেগও সামনে আসছে।
গুগল ২০২৭ সালের মধ্যে টেক্সাসে ডেটা সেন্টার অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। বিশাল এই বিনিয়োগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, এআই অবকাঠামোর পরিবেশগত ব্যয় কত দ্রুত বাড়ছে।
টেক্সাসের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। রিপাবলিকান-শাসিত রাজ্যটি সাধারণত বড় প্রযুক্তি বিনিয়োগকে স্বাগত জানায়। ব্যবসাবান্ধব নীতি, কম কর এবং তুলনামূলক শিথিল নিয়ন্ত্রণের কারণে গুগলের মতো কোম্পানিগুলো এখানে দ্রুত সম্প্রসারণের সুযোগ পাচ্ছে।
আর সেই পথ ধরেই অঙ্গরাজ্যটিতে বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি।
বড় ৩ চ্যালেঞ্জ: বিদ্যুৎ, পানি ও শীতলীকরণ
এআই চালাতে ব্যবহৃত সার্ভারগুলো বিপুল পরিমান তাপ উৎপন্ন করে। তাই ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে শক্তিশালী কুলিং ব্যবস্থা দরকার হয়। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) বলছে, ২০২২ সালে ডেটা সেন্টার ও ডেটা ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক মিলিয়ে বিশ্বে প্রায় ৪৬০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে—যা বৈশ্বিক বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২ শতাংশ। আর এ বছরই এই চাহিদা সম্ভবত হাজার টেরাওয়াট-ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাবে।
ডেটা সেন্টারের পানি ব্যবহার শুধু সরাসরি শীতলীকরণেই সীমাবদ্ধ নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যও অতিরিক্ত পানি লাগে। ফলে কোম্পানিগুলোর “প্রকাশিত হিসাবের চেয়ে প্রকৃত পানি ব্যবহার বেশি হতে পারে” বলে লিখেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
গুগলের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানি যখন একসঙ্গে হাজার কোটি ডলারের অবকাঠামো গড়ে তোলে, তখন এই পানি ও বিদ্যুৎ চাহিদা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় থাকে না, তা পরিবেশগত ঝুঁকির প্রশ্নেও পরিণত হয়। টেক্সাসের মতো রাজ্যে, যেখানে শক্তি বাজার, পানি ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পনীতি রাজনৈতিক আলোচনার অংশ, সেখানে ডেটা সেন্টারের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
টেক্সাসে পানি নিয়ে উদ্বেগ কতটা?
টেক্সাসে ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস, অস্টিন নিউজের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাজ্যে ডেটা সেন্টার যত দ্রুত বাড়ছে, সে তুলনায় পানি ব্যবহারের বিষয়ে বড় প্রশ্ন অনেকটা আড়ালেই রয়ে গেছে। ওই প্রতিবেদনের শিরোনামই ছিল ‘ডেটা সেন্টারস আর গ্রোয়িং ইন টেক্সাস, বাট বিগ কোয়েশ্চনস রিমেইন অ্যাবাউট ওয়াটার ইউজ’।
২০৪০ সালের মধ্যে পানি, বিদ্যুৎ ও স্থানীয় অবকাঠামো নিয়ে আগাম পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে।
টেক্সাসের বিশেষত্ব হলো—একদিকে দ্রুত বাড়ছে প্রযুক্তি অবকাঠামো, অন্যদিকে বিশাল অঙ্গরাজ্যটির অনেক অঞ্চলই খরা ও পানি সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে। ‘গুগলের মতো কোম্পানির ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ স্থানীয় পানি ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে’ বলে উঠে এসেছে হিউস্টন ক্রনিকলের এক প্রতিবেদনে।
“সমালোচকদের মতে, উদ্যোগটি ইতিবাচক সূচনা হলেও এটি যথেষ্ট জোরালো নয়। কারণ, রাজ্যে আগে থেকেই চাপে থাকা নদী ও ভূগর্ভস্থ জলাধারের পানি কমিয়ে ফেলতে পারে ডেটা সেন্টারগুলো এবং অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর।”
সমালোচনার মুখে গুগলের প্রতিশ্রুতি
ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত ঝুঁকির প্রশ্নে গুগল বলছে, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে ‘ওয়াটার পজিটিভ’ হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। অর্থাৎ ডেটা সেন্টারগুলো যত পানি ব্যবহার করবে, তার চেয়ে বেশি পানি তারা স্থানীয় প্রকল্পের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করতে চায়।
টেক্সাসের পানি সংরক্ষণ প্রকল্পে অর্থায়নের ঘোষণাও দিয়েছে কোম্পানিটি। এ লক্ষ্যে তারা এক কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। নতুন কিছু ডেটা সেন্টারে পানি-নির্ভর কুলিংয়ের বদলে বায়ুভিত্তিক শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও বলেছে গুগল।
তবে, হিউস্টন ক্রনিকলের প্রতিবেদন বলছে, “এমন উদ্বেগ মোকাবিলায় এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।”
টেক্সাসে বড় কর্পোরেট বিনিয়োগকে সাধারণত ইতিবাচকভাবে দেখা হয়। ফলে পরিবেশগত শর্ত আরোপের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও যথেষ্ট হবে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে, গুগলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্ন নয়, স্থানীয় নীতি ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গেও জড়িত।
শুধু পানি নয়, বাড়ছে দূষণের শঙ্কাও
বিদ্যুতের জন্য ডেটা সেন্টারের রাক্ষুসে ক্ষুধা মেটানো বড় এক চ্যালেঞ্জ।
টেক্সাসে ডেটা সেন্টারের জন্য বাড়তি বিদ্যুত চাহিদা সামাল দিতে নতুন গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে গুগল। পরিবেশবাদী ও সমালোচকদের আশঙ্কা, এ ধরনের অবকাঠামো বাড়লে তা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণও বাড়িয়ে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ)র নির্গমন-ঘনত্ব ধরে হিসাব করলে, প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় চারশ থেকে পাঁচশ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়। সেই হিসাবে, ১ গিগাওয়াটের একটি গ্যাসচালিত বিদ্যুতকেন্দ্র যদি প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলে, তাহলে বছরে প্রায় ৩.১ থেকে ৩.৯ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবেশে যোগ হতে পারে। স্যান ফ্রান্সিসকো শহরের পরিবেশ দপ্তরের ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুসারে এটি শহরটির গোটা বছরের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের কাছাকাছি।
টেক্সাসে এই ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রের অন্য এলাকার চেয়ে আলাদা। রাজ্যের রিপাবলিকান নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই জীবাশ্ম জ্বালানি ও শক্তি উৎপাদনকে অর্থনৈতিক শক্তির অংশ হিসেবে দেখে এসেছে। ফলে নতুন গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা পরিবেশবাদীদের কাছে উদ্বেগের হলেও, নীতিনির্ধারকদের কাছে তা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শিল্প সম্প্রসারণের যুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে।
এআই যুগের নতুন সমীকরণ
গুগলসহ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো একদিকে এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতিও ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এআইয়ের দ্রুত বিস্তার বিদ্যুৎ, পানি ও ভূমির ওপর যে চাপ তৈরি করছে, তা প্রযুক্তি খাতের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। ব্যারনসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআই ডেটা সেন্টারের এই বিস্তার বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জলবায়ু লক্ষ্য ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান-শাসিত রাজ্যে একদিকে রাজ্য সরকার বড় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও কর আয়ের সুযোগ দেখতে চায়; অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা, গবেষক ও পরিবেশবিদরা পানি, বিদ্যুৎ ও জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন। ফলে গুগলের ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ শুধু প্রযুক্তি বা পরিবেশের গল্প নয়, এটি টেক্সাসের রাজনৈতিক অর্থনীতি, শক্তি নীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন মডেলেরও অগ্নিপরীক্ষা।