Published : 27 Jul 2026, 11:40 AM
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২ হাজার ফুট বা ৬ হাজার ৭০০ মিটার উঁচুতে আগ্নেয়গিরির বরফশীতল চূড়ায় যেখানে মানুষের বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব সেখানকার তীব্র শীত ও অক্সিজেনের চরম ঘাটতি সামলে নিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে আন্দিজ লিফ-ইয়ার্ড ইঁদুর।
গবেষকরা বলছেন, বিশেষ বিপাকীয় প্রক্রিয়া, শক্তিশালী মাইটোকন্ড্রিয়া ও উদ্ভিদের বিষ হজম করার মতো জিনগত দক্ষতার বলেই হিমশীতল পর্বতচূড়ায় অনায়াসে রাজত্ব করছে এই সাহসী ক্ষুদে স্তন্যপায়ী প্রাণীটি।
রয়টার্স লিখেছে, গোল পাতার মতো কানের জন্য পরিচিত এ ইঁদুরটি দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে থাকা বড় আন্দিজ পর্বতমালার কঠিন প্রতিকূল পরিবেশে বসবাস করে, যা উত্তর চিলির মরুভূমি উপকূল থেকে শুরু হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দিজের বরফাবৃত পর্বতশৃঙ্গ পর্যন্ত। অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর এত উচ্চতায় বসবাসের নজির নেই।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ।
এ গবেষণার প্রধান গবেষক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা’র বিবর্তন জীববিজ্ঞানী জে স্টর্স বলেছেন, “আমরা প্রায় ৬ হাজার ৭০০ মিটার উঁচু পর্বতচূড়া থেকে যেসব ইঁদুরকে ধরেছি, সেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অক্সিজেনের পরিমাণ অর্ধেকেরও কম ও তাপমাত্রা প্রায় সব সময়ই হিমাঙ্কের নিচে থাকে।
“প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও দীর্ঘ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন দক্ষ পর্বতারোহী হয়ত এক দিনের জন্য এত উঁচুতে অক্সিজেনের এ তীব্র ঘাটতি সহ্য করে টিকে থাকতে পারেন। তবে স্থায়ীভাবে মানুষের বেঁচে থাকার সক্ষমতার সীমা তা অনেক আগেই ছাড়িয়ে যায়।”
স্তন্যপায়ী এ প্রজাতিটি কীভাবে এ চরম প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নেয় তা বুঝতে গবেষকরা তাদের উচ্চতার ভৌগোলিক পরিসর থেকে সংগৃহীত ১৬৭টি ইঁদুরের হোল-জিনোম তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় পাওয়া ফলাফল বলছে, এসব ইঁদুরের সফলভাবে টিকে থাকার আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এদের দেহের শক্তি ও অক্সিজেনের সঠিক ব্যবহারের সক্ষমতার মধ্যে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা’র বিবর্তন জীববিজ্ঞানী জে স্টর্স বলেছেন, “যখন কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী তীব্র শীতের মুখে পড়ে তখন এরা দেহের তাপমাত্রা স্থির রাখতে বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে। এ কাজের মূল জ্বালানি অক্সিজেন।
“যেহেতু উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেন কমতে থাকে ফলে এসব স্থানে বসবাসকারী স্তন্যপায়ীরা অক্সিজেন ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় এমন পরিবর্তন আনে, যাতে কম অক্সিজেনেও সর্বোচ্চ তাপ তৈরি করা যায়।”
গবেষকরা বলছেন, অতি উঁচুতে পাওয়া এসব ইঁদুরের শারীরবৃত্তীয় গঠন নিচু এলাকার ইঁদুরের চেয়ে ভিন্ন। নিচু এলাকার ইঁদুরের তুলনায় উঁচু পাহাড়ের বিভিন্ন ইঁদুর তীব্র শীতেও দেহের তাপ উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে বেশি পারদর্শী।
তাদের কঙ্কালের পেশিকোষে শক্তির মূল কেন্দ্র ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’র ভেতরে শক্তি উৎপাদনের বাড়তি সক্ষমতা দেখা গেছে। একইসঙ্গে তাদের দেহে তাপ উৎপাদনকারী ‘ব্রাউন ফ্যাট’ চর্বি পোড়াতেও বেশি কার্যকর, যা অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি ও হিমশীতল পরিবেশেও দেহ গরম রাখতে সহায়তা করে।
গবেষণায় চরম উচ্চতায় টিকে থাকার আরেকটি অপ্রত্যাশিত দিক উঠে এসেছে, যা হল খাদ্যাভ্যাস। গবেষকরা এমন কিছু জিনগত প্রমাণ পেয়েছেন, যা থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে, তীব্র শীত ও অক্সিজেনের ঘাটতির পাশাপাশি এ প্রজাতির ইঁদুর এদের বসবাসের বিভিন্ন উচ্চতায় থাকা উদ্ভিদের নানা ধরনের বিষাক্ত উপাদানের সঙ্গেও নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।
গবেষক স্টর্স বলেছেন, “এসব ইঁদুরের মধ্যে খাবারের বিষাক্ত উপাদান হজম করার এ বিবর্তনীয় সক্ষমতা খুঁজে পাওয়াটা ছিল অপ্রত্যাশিত। উচ্চভূমির রুক্ষ পরিবেশে মানসম্পন্ন কোনো খাবারই পাওয়া যায় না, সেখানে জন্মানো একমাত্র ভোজ্য উদ্ভিদগুলো বিষাক্ত উপাদানে ভরা। সব মিলিয়ে ওদের জীবন সত্যিই বেশ কঠিন।”
গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক ও চিলির ‘ইউনিভার্সিদাদ আউস্ট্রাল’-এর জেনোমিক্স ও প্রাণিবিজ্ঞানী গিইয়্যের্মো দে’লিয়া বলেছেন, “আমরা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরক্ষা ও খাদ্যের বিষাক্ত উপাদান হজমের সঙ্গে জড়িত জিনের ওপর বিশেষ বিবর্তনগত পরিবর্তনের লক্ষণ পেয়েছি।
“নির্বাচিত এসব জিন যে এই জৈবিক কাজে জড়িত তা আমরা নিশ্চিত। তবে নির্দিষ্ট কোন উদ্ভিদ বা কোন বিষের বিরুদ্ধে এই অভিযোজন তা এখনই বলা যাচ্ছে না।”
বিজ্ঞানীরা বলছেন, অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি থাকা পরিবেশেও প্রাণীরা কীভাবে জীবন ধারণ করতে পারে এ গবেষণাটি সে বিষয়ে আলোকপাত করছে।
গবেষক স্টর্স বলেছেন, “উঁচু এলাকার এ স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতির মধ্যেও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অনন্য সক্ষমতা পেয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে অক্সিজেনের এ ধরনের চরম ঘাটতি গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ তৈরি করে।”
স্টর্স বলেছেন, ইঁদুরের দেহ কীভাবে কম অক্সিজেনে কাজ করে তা বুঝতে পারলে মানুষের হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে সহায়তা মিলবে, বিশেষ করে যেসব রোগে সমুদ্রপৃষ্ঠেও মানুষের দেহে ঠিকমতো অক্সিজেন পৌঁছায় না।
গবেষক গিইয়্যের্মো দে’লিয়া বলেছেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ হাজার ৭০০ মিটার উঁচুতে এসব ইঁদুর কীভাবে বেঁচে থাকে এর শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যার মজবুত একটি ভিত্তি এখন আমাদের হাতে এসেছে। এদের জিনগত অভিযোজনের বিষয়েও আমরা কিছুটা ধারণা পেয়েছি। তবে এখনও অনেক কিছু শেখা বাকি।”
এত উঁচুতে এসব ইঁদুর আসলে কী খেয়ে বেঁচে থাকে, এদের গড় আয়ু কত ও এরা পর্বতের বরফাবৃত চূড়াতেই বংশবৃদ্ধি করে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।
গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ মন্টানা’র বিবর্তন জীববিজ্ঞানী জাখারি শেভিরন বলেছেন, আপাতদৃষ্টিতে বরফে ঢাকা যে নির্জন পর্বত চূড়াগুলোকে একদম প্রাণহীন মনে হয় সেগুলো আসলে মোটেও ফাঁকা নয়, সেখানে এখনও এমন অনেক অনন্য জীবন লুকিয়ে আছে, যা আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায়।
এসব ইঁদুরকে ঘিরে এখনও যেসব অজানা প্রশ্ন রয়ে গেছে তার বাইরেও এ গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে প্রাণের বহুমুখী রূপ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জানা এখনও কতটা বাকি এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করা কতটা জরুরি।