Published : 04 Jul 2026, 10:07 AM
স্মার্টফোনের বাজারে চিরচেনা প্রশ্ন আইফোনের দাম এত বেশি কেন, আর কেনই বা অ্যান্ড্রয়েড ফোন সাশ্রয়ী দামে মেলে? একদিকে প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা ও আভিজাত্যের প্রতীক অ্যাপল, অন্যদিকে অ্যান্ড্রয়েড বাজার দখল করে আছে বৈচিত্র্য ও সাশ্রয়ী দাম নিয়ে।
তবে দামের পার্থক্যের পেছনে কি কেবল ব্র্যান্ডের নাম, নাকি রয়েছে অন্য কোনো ব্যবসায়িক রহস্য?
প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার লিখেছে, ২০১৭ সালে ৯৯৯ ডলারে আইফোন এক্স বাজারে আনে অ্যাপল। সেই সময় থেকেই নিজেদের ‘প্রো’ সিরিজের বিভিন্ন আইফোন প্রায় একই দামে বিক্রি করে আসছে কোম্পানিটি।
আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স-এর সবথেকে উন্নত সংস্করণটি গ্রাহকরা কিনতে চাইলে এর দাম পড়বে প্রায় ২ হাজার ডলার। সাধারণ বা বেস মডেলের দাম শুরু হয় ৭৯৯ ডলার থেকে, যা বর্তমানের লাইনআপে সেরা মডেল হিসেবে পরিচিত। এর চেয়ে কিছুটা কম দামে বর্তমান প্রজন্মের আইফোন কিনতে চাইলে অ্যাপলের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ফোন আইফোন ১৬ই, যার দাম ৫৯৯ ডলার।
অ্যান্ড্রয়েড ফোনের বেলায় দেখা যাবে এসব ফোনের দাম আইফোনের তুলনায় কম। যেমন ‘স্যামসাং গ্যালাক্সি এ১৭’-এর দাম ১৯৯ ডলার। এতে রয়েছে আইফোন ১৬ই-এর সমান স্টোরেজ ও আরও উন্নত ও দ্রুত রিফ্রেশ রেটের ‘৯০ হার্টজ অ্যামোলেড’ ডিসপ্লে। ক্যামেরা ও পারফরম্যান্সের দিক থেকে আইফোন অনেক এগিয়ে থাকলেও সাশ্রয়ী দামে দারুণ সব ফিচারের জন্য ‘গ্যালাক্সি এ১৭’ ফোনটি সেরা।
বাজেটবান্ধব অ্যান্ড্রয়েড ফোন বিক্রির ক্ষেত্রে স্যামসাং একাই নয়। মটোরোলা, গুগল, ওয়ানপ্লাস ও নাথিং-এর মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ডও রয়েছে। অ্যান্ড্রয়েড ফোন আইফোনের চেয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার পেছনে প্রথম ও বড় কারণ হচ্ছে, এখানে প্রতিটি দামের স্তরে প্রতিযোগিতা রয়েছে।
যেহেতু অ্যান্ড্রয়েড বাজারের পরিসর বড়, ফলে চাইলে ফোনে নতুন কোনো ডিজাইন যোগ করতে বা খরচ কমাতে কিছুটা কৌশলী হতে পারে নির্মাতারা। আর এসবই করা হয় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ও বিক্রিতে সেরা ফোন হওয়ার লক্ষ্যে। অন্যদিকে, অ্যাপলই আইওএস চালিত ডিভাইস তৈরি করে।
সব ধরনের মানুষের জন্য অ্যান্ড্রয়েড
আমেরিকায় আইফোন জনপ্রিয় হলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চিত্রটি একদম ভিন্ন। ‘স্ট্যাটকাউন্টার’-এর তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমের বাজারের ৭০ শতাংশেরও বেশি দখল করে আছে অ্যান্ড্রয়েড।
বাজেট সচেতন ক্রেতাদের কাছে শাওমি, ওয়ানপ্লাস ও রিয়েলমি’র মতো ব্র্যান্ড বেশ পরিচিত। কারণ, সাশ্রয়ী দামে প্রিমিয়াম মানের স্মার্টফোন সরবরাহ করে এরা। গত কয়েক বছরে ক্রেতাদের প্রত্যাশা এতটাই বেড়েছে যে, এখন একদম শুরুর দিকের বা সাশ্রয়ী অ্যান্ড্রয়েড ফোনেও ওএলইডি ডিসপ্লে, শক্তিশালী ব্যাটারি ও উন্নত প্রসেসর পাওয়া যায়।
তবে এমনটি সম্ভব হত না যদি এসব ব্র্যান্ড তাদের লাভের পরিমাণ কমিয়ে না আনত। অ্যান্ড্রয়েড নির্মাতা কোম্পানিগুলো ফোনের বডি বা বিল্ড কোয়ালিটি, ক্যামেরার হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার আপডেটের ক্ষেত্রে খরচ কমাতে বেশ খোলামেলা মনোভাব রাখে।
একদম সাশ্রয়ী বা লো-এন্ডের অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলোতে প্লাস্টিকের বডি ও সাধারণ ডিজাইন দেখা যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। অনেক ফোন ‘ট্রিপল ক্যামেরা’ বা তিনটি ক্যামেরা থাকার বড়াই করলেও দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে একটি থাকে কম মানের ২ মেগাপিক্সেলের। এ সেন্সরটি খুব কমই কাজে আসে, তবে ফোনে থাকে যাতে বিভিন্ন কোম্পানি বলতে পারে যে, তাদের ফোনে ‘তিনটি ক্যামেরা’ আছে।
অ্যাপল তাদের ফোনের জন্য নিজস্ব প্রসেসর ও অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করে। অন্যদিকে, বেশিরভাগ অ্যান্ড্রয়েড নির্মাতা কোম্পানি প্রসেসরের জন্য কোয়ালকম বা মিডিয়াটেক-এর ওপর নির্ভরশীল।
অ্যান্ড্রয়েড ‘ওপেন-সোর্স’ প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় নির্মাতাদের একদম শুরু থেকে তৈরি করতে হয় না। তাদের নিজস্ব অ্যাপ স্টোর বা সার্ভিস নিয়েও খুব একটা ভাবতে হয় না।
তবে অ্যাপলের বিষয়টি আলাদা, তাদের আইক্লাউড ও এয়ারড্রপ-এর মতো নিজস্ব ইকোসিস্টেম রয়েছে, যেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও আপডেট প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া, গড়পড়তা অ্যান্ড্রয়েড ফোনের তুলনায় আইফোনগুলোতে অনেক দীর্ঘকাল ধরে সফটওয়্যার আপডেট দেওয়া হয়।
গ্রাহকদের থেকে বেশি দাম নিতে পারে অ্যাপল
অ্যাপল তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি দাম আদায় করার সক্ষমতা রাখে।
প্রযুক্তি সাইট নাইটুফাইভম্যাক-এর গবেষণা অনুসারে, একটি আইফোন ১৪ প্রো ম্যাক্স তৈরি করতে অ্যাপলের খরচ হয় প্রায় ৪৫৪ থেকে ৪৭৪ ডলার। অথচ সেই ফোনটিই বিক্রি হয় ১ হাজার ১০০ ডলারে। ফোন তৈরিতে কেবল যন্ত্রপাতির দাম ছাড়াও অন্যান্য খরচ থাকে। তবে এরপরও লাভের অংকটি বেশ বড়। এর বদলে অনেক অ্যান্ড্রয়েড নির্মাতাকে খুব সামান্য লাভে ফোন বিক্রি করতে হয়।
যন্ত্রপাতির দাম বা উপাদানের মান ছাড়াও আইফোনের এ চড়া দামের পেছনে আরেকটি কারণ বাজারে অ্যাপলের বড় প্রভাব। দীর্ঘ সময় ধরে আইমেসেজ-এর মতো ফিচারের মাধ্যমে গ্রাহকদের নিজের ইকোসিস্টেমে আটকে রাখার ফলে, পুরানো আইফোন ব্যবহারকারীরা নতুন আইফোনের জন্য বেশি অর্থ দিতে দ্বিধা করেন না। বাজারে একই ফিচারের সাশ্রয়ী অ্যান্ড্রয়েড ফোন থাকলেও নয়।
স্যামসাংকেও অনেক সময় প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড হিসেবে ধরা হয় এবং তাদের ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোর দাম আইফোনের কাছাকাছিই থাকে। তবে পার্থক্য হচ্ছে, স্যামসাং সব ধরনের দামেই ফোন বিক্রি করতে দ্বিধা করে না। এতে কোম্পানিটির প্রিমিয়াম ইমেজ কিছুটা ঝুঁকির মুখে পড়লেও পিছিয়ে যায় না তারা। কারণ অনেক ক্ষেত্রে একজন ক্রেতার স্যামসাং সম্পর্কে প্রথম ধারণা তৈরি হয় তাদের ২০০ ডলারের কোনো বাজেট ফোন ব্যবহারের মাধ্যমেই।