Published : 03 Jul 2026, 11:30 AM
প্রায় একশ টন ভরের বিভিন্ন স্পেস শাটল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে ট্যাক্সি পরিষেবা দরকার হয়েছিল নাসার। এজন্য সংস্থাটির এমন এক শক্তিশালী প্লেনের দরকার ছিল, যা এ কাজ করতে পারবে।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর দুটি বড় নির্মাতার প্লেন বেছে নিয়েছিল নাসা। একটি অনেক বড়সড় ‘লকহিড সি-৫ গ্যালাক্সি’ ও অন্যটি জনপ্রিয় ‘বোয়িং ৭৪৭’ প্লেন। তবে শেষ পর্যন্ত বোয়িং ৭৪৭-কেই বেছে নিয়েছে নাসা।
কিন্তু কেন? এর উত্তর মিলেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট স্ল্যাশগিয়ারের প্রতিবেদনে।
অন্যতম প্রধান কারণ ছিল প্লেনটির নকশা। ৭৪৭ প্লেনের ডানাগুলো এর মূল দেহের নিচে থাকে, যা স্পেস শাটল বহনের জন্য উপযোগী। অন্যদিকে ‘সি-৫’ প্লেনের ডানা উপরের দিকে থাকে। ফলে তার ওপর শাটল বসানো বেশ কঠিন।
নাসার এমন সিদ্ধান্তের আরেকটি বড় কারণ, বোয়িংয়ের সক্ষমতা। এদিক থেকে বোয়িং ৭৪৭ বেশ উপযোগী। প্লেনটি চার ইঞ্জিনের বিশাল এক জেট, যা ১৯৬৯ সালে বাণিজ্যিক পরিষেবায় যোগ হয়েছিল। প্রথম উড্ডয়নে ওই সময়ের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক প্লেন ছিল এটি। আজও বোয়িংয়ের অন্যতম সেরা নির্মাণ হিসেবে পরিচিত ৭৪৭।
বাঁকানো ডানা ও বিশাল শক্তি নিয়ে এ ধরনের প্লেনকে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার জন্য তৈরি করেছিল বোয়িং। প্লেনে লাগানো চারটি ‘প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি’ ইঞ্জিনের প্রতিটিই দিতে পারত ৪৮ হাজার ৬০০ পাউন্ড থ্রাস্ট।
এ শক্তিই প্লেনটিকে সর্বোচ্চ ৭ লাখ ১৩ হাজার পাউন্ড ভর বহন করতে সাহায্য করেছিল। নাসার স্পেস শাটল বহনের জন্য ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ৭৪৭ প্লেনটিও হালকা ছিল না, খালি অবস্থাতেই এর ভর ছিল ৩ লাখ পাউন্ডেরও বেশি।
শেষ পর্যন্ত স্পেস শাটল বহনের জন্য দুটি বোয়িং ৭৪৭ পরিবর্তন করে ব্যবহার করেছিল নাসা। প্রথমটি ছিল বোয়িং ‘৭৪৭-১২৩’ মডেলের, যার নাম ‘নাসা ৯০৫’। প্লেনটি ১৯৭৪ সালে ১৫ কোটি ডলারে আমেরিকান এয়ারলাইনস থেকে কিনেছিল নাসা।
‘৭৪৭-১০০এসআর-৪৬’ নামের দ্বিতীয় প্লেনটি ১৯৮৯ সালে জাপান এয়ারলাইনসের কাছ থেকে কিনেছিল সংস্থাটি, যা পরবর্তীতে ‘নাসা ৯১১’ নামে পরিচিতি পায়। এ দুটি প্লেনেই বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা।
বোয়িংয়ের প্লেনের মূল দেহে তিনটি বিশাল স্ট্রাট যোগ করে নাসা, যার ওপর শাটলটি বসানো যেত। এজন্য প্লেনের ভেতরের কাঠামোও শক্তিশালী করার দরকার হয়েছে। তবে স্পেস শাটল উপরে বেঁধে দিলে প্লেনের বায়ুগতির মান খারাপ হয়ে যেত, যা সামলাতে প্লেনের লেজের দুই পাশে অতিরিক্ত দুটি খাড়া ‘স্ট্যাবিলাইজার’ লাগায় নাসা, যেন প্লেনটি দিক সোজা রাখতে পারে।
এক্ষেত্রে সামান্য বায়ুগতির পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ শাটলের গায়ে থাকা বিভিন্ন ‘থার্মাল প্রোটেকশন টাইল’ খুবই সংবেদনশীল। ফলে প্লেনের নকশায় বিশেষ যত্ন নিতে হত নাসাকে।
উড্ডয়নের সময় স্পেস শাটলের বিদ্যুচ্চালিত বিভিন্ন ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে কি না তা নজরে রাখতে প্লেনে আরও কিছু বিশেষ যন্ত্রপাতি যোগ করেছিলেন প্রকৌশলীরা। ১৯৭৭ সালের প্রথম পরীক্ষাগুলোর জন্য ‘নাসা ৯০৫’ প্লেনে জরুরি সময়ে ‘এস্কেপ’ ব্যবস্থা বসিয়েছিল। এর মাধ্যমে বিস্ফোরক ব্যবহার করে ক্রুকে দ্রুত বের করে দেওয়া যেত।
শাটলকে প্লেনের ওপরে তোলাটাই ছিল বড় কাজ। এজন্য দরকার হত ‘মেট-ডিমেট ডিভাইস’ বা এমডিডি নামের বিশাল এক কাঠামো, যেগুলো দিয়ে শাটলকে অনেক উঁচু পর্যন্ত তোলা হত। এরপর নিচ দিয়ে ৭৪৭ প্লেনটিকে নিয়ে তার ওপর শাটলটি বসিয়ে আটকে দিত নাসা।
মিশনের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে একটানা দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পুরো দায়িত্ব সামলেছে ‘নাসা ৯০৫’। পরে ১৯৯০ সালের শেষ দিকে এ দলে যোগ দেয় ‘নাসা ৯১১’। তারপর থেকে দুটি প্লেন মিলেই শাটল বহনের কাজ ভাগাভাগি করে চালিয়েছে।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যায় ‘নাসা ৯১১’। পরে ওই একই বছরে অবসর নেয় ‘নাসা ৯০৫’ও। বর্তমানে ‘স্পেস সেন্টার হিউস্টন’-এ বড়সড় প্রদর্শনী হিসেবে রাখা রয়েছে প্লেন দুটি।