গ্যালাক্সি আনপ্যাকড: স্যামসাংয়ের ঝুলি থেকে এবার যা বেরোল
ফোনের বেইস মডেলে ১২ জিবি র্যামের সঙ্গে ২৫৬ ও ৫১২ জিবি স্টোরেজ মিললেও ‘ফোল্ড ৮’ সিরিজের ফোনে পাওয়া যাবে ১৬ জিবি র্যাম ও ১ টেরাবাইট পর্যন্ত ইন্টারনাল স্টোরেজ।
শরতের প্রথাগত প্রযুক্তি মৌসুমকে পেছনে ফেলে বছরের মাঝামাঝি সময়েই নতুন গ্যাজেট উন্মোচনের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে স্যামসাং। এবারের গ্যালাক্সি আনপ্যাকড অনুষ্ঠানে একসঙ্গে তিনটি ফোল্ডএবল স্মার্টফোন ও দুটি প্রিমিয়াম স্মার্টওয়াচ উন্মোচন করেছে প্রযুক্তি জায়ান্টটি।
কোম্পানিটির উন্মোচিত ‘গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮ আল্ট্রা’, ‘গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮’ ও ‘গ্যালাক্সি জেড ফ্লিপ ৮’ এ তিন ফোনেই প্রসেসর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে কোয়ালকমের শক্তিশালী ‘স্ন্যাপড্রাগন ৮ এলিট জেন ৫ ফর গ্যালাক্সি’।
ফোনের বেইস মডেলগুলোতে ১২ জিবি র্যামের সঙ্গে ২৫৬ ও ৫১২ জিবি স্টোরেজ মিলবে। তবে ‘ফোল্ড ৮’ সিরিজের ফোনগুলোতে পাওয়া যাবে ১৬ জিবি র্যাম ও ১ টেরাবাইট পর্যন্ত ইন্টারনাল স্টোরেজ।
ডিভাইসগুলোর নির্মাণশৈলী ও ডিসপ্লের সুরক্ষায় এবার যোগ হয়েছে ‘ফ্লেক্স টাইটানিয়াম’ প্রযুক্তি। ফ্লেক্সিবল ওলেড প্যানেলের নিচে যোগ করা টাইটানিয়াম সংকর ধাতুর এ স্তরটি ফোনকে পাতলা ও টেকসই রাখবে।
এ সপ্রযুক্তি সম্পর্কে স্যামসাং বলেছে, “ফ্লেক্স টাইটানিয়াম ডিসপ্লের স্থায়িত্ব বাড়াতে, বাহ্যিক চাপ ও আঘাত সহ্য করতে এবং স্ক্রিনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভাঁজের দাগ কমাতে সাহায্য করবে।”
ভিডিও ও ছবির ক্ষেত্রে তিনটি ফোনেই ১০ মেগাপিক্সেলের ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল সেলফি ক্যামেরা রেখেছে স্যামসাং। তবে ‘ফ্লিপ ৮’ ও ‘ফোল্ড ৮’-এর কভার স্ক্রিনের ক্যামেরা দিয়ে সেকেন্ডে ৬০ ফ্রেমে ফোরকে ভিডিও ধারণ করা সম্ভব। ডিজাইন ও প্রসেসরে বড় পরিবর্তন এলেও গ্যালাক্সি এস২৫-এর মতো এসব ফোনেও বিল্ট-ইন ‘চি২’ ম্যাগনেটিক চার্জিং সাপোর্ট দেওয়া হয়নি। এর জন্য আলাদা ম্যাগনেটিক কেস ব্যবহার করতে হবে।
অন্যদিকে, পরিধানযোগ্য ক্যাটেগরিতে আসা ‘গ্যালাক্সি ওয়াচ ৯’ ও ‘ওয়াচ আল্ট্রা ২’ স্মার্টওয়াচে রয়েছে কোয়ালকমের ৩ ন্যানোমিটারের ‘স্ন্যাপড্রাগন ওয়্যার এলিট’ চিপসেট। ‘হেক্সাগন এনপিইউ’ যোগ থাকা এ চিপসেট ঘড়ির ভেতরেই সরাসরি ২০০ কোটি প্যারামিটারের এআই মডেল পরিচালনা করতে পারবে।
ঘোষণার পর বুধবার থেকেই বিশ্বজুড়ে এসব ফোন ও স্মার্টওয়াচের প্রি-অর্ডার দেওয়া যাচ্ছে। ৭ অগাস্ট থেকে এসব ডিভাইস বাজারে সরাসরি কেনার জন্য পাওয়া যাবে।
দেখে নেওয়া যাক, গ্যালাক্সি আনপ্যাকড ইভেন্টে স্যামসাং যা যা ঘোষণা করেছে–
গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮ আল্ট্রা
সিরিজের সর্বোচ্চ সংস্করণের এ ফোনটির সবচেয়ে সাশ্রয়ী মডেলের দাম ধরা হয়েছে ২ হাজার ১০০ ডলার, যা গত বছরের ফোল্ড ৭-এর চেয়ে ১০০ ডলার বেশি। এতে রয়েছে ৬ দশমিক ৫ ইঞ্চির ‘এফএইচডি প্লাস’ বাইরের ডিসপ্লে এবং ভাঁজ খুললেই চোখে পড়বে ৮ ইঞ্চির ‘কিউএক্সজিএ প্লাস’ ডাইনামিক অ্যামোলেড ২এক্স মূল স্ক্রিন। দুটি পর্দাতেই ১২০ হার্টজের অ্যাডাপ্টিভ রিফ্রেশ রেট পাওয়া যাবে।
এ ফোনে রয়েছে ২০০ মেগাপিক্সেলের মূল ক্যামেরা, ৫০ মেগাপিক্সেলের আল্ট্রাওয়াইড ও ১০ মেগাপিক্সেলের টেলিফটো লেন্স (৩এক্স অপটিক্যাল ও ৩০এক্স স্পেস জুম)।
এ ফোনের মাধ্যমে ৩০ এফপিএস-এ ‘এইটকে’ ভিডিও রেকর্ড করা যাবে। ফোনে রয়েছে পাঁচ হাজার এমএএইচ ব্যাটারি ও ৪৫ ওয়াটের ফাস্ট চার্জিং সুবিধা। খোলা অবস্থায় কেবল ৪.১ মিলিমিটার পাতলা ও ২১৫ গ্রাম ওজনের এ ফোনে তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে ‘এক্সপ্যান্ডেড গ্রাফাইট কুলিং স্ট্রাকচার’।
গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮
১ হাজার ৯০০ ডলার থেকে শুরু হওয়া এ মডেলটি ওজনে আল্ট্রা সংস্করণের চেয়ে ১৪ গ্রাম হালকা। তবে নকশার দিক থেকে ফোনটি বেশ চমকপ্রদ। এতদিন লম্বালম্বি নকশায় অভ্যস্ত থাকলেও এবার আড়াআড়ি বা অনুভূমিক ভাঁজ ব্যবস্থার দিকে হেঁটেছে স্যামসাং। ফলে ফোনটি আগের চেয়ে চওড়া, যা ভাঁজ করা অবস্থায় আল্ট্রা মডেলের চেয়ে প্রায় ৯ মিলিমিটার বেশি চওড়া দেখাবে।
ফোনের ভেতরে রয়েছে ৭ দশমিক ৬ ইঞ্চির মূল পর্দা ও বাইরে ৫ দশমিক ৫ ইঞ্চির এফএইচডি প্লাস ডিসপ্লে, যা তিন হাজার নিটস পর্যন্ত উজ্জ্বলতা দেবে। গেল বছরের ৪ হাজার ৪০০ এমএএইচ ব্যাটারির বদলে এবার ৪ হাজার ৮০০ এমএএইচ ব্যাটারি দিয়েছে স্যামসাং।
এ মডেলে কোনো পৃথক টেলিফটো লেন্স রাখা হয়নি। ৫০ মেগাপিক্সেলের মূল ক্যামেরার সঙ্গে রয়েছে ৫০ মেগাপিক্সেলের আল্ট্রাওয়াইড লেন্স, যা ১০এক্স ডিজিটাল জুম ও এইটকে ভিডিও ধারণ সমর্থন করবে। উভয় ফোনেই কেবল বা ওয়্যারলেস সংযোগে ‘সুপার ফাস্ট চার্জিং’ সুবিধা রাখা হয়েছে।
গ্যালাক্সি জেড ফ্লিপ ৮
নতুন ফোল্ড ৮ সিরিজের পাশাপাশি ক্ল্যামশেল ডিজাইনের নতুন ভাঁজ করা ফোন গ্যালাক্সি জেড ফ্লিপ ৮ উন্মোচন করেছে স্যামসাং। এ ফোনটির বাইরের অংশে রয়েছে ৬০/১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট সংবলিত ৪ দশমিক ১ ইঞ্চির এইচডি প্লাস সুপার অ্যামোলেড ডিসপ্লে।
ফোনটি খুললেই দেখা মিলবে ১২০ হার্টজের অ্যাডাপ্টিভ রিফ্রেশ রেটওয়ালা ৬ দশমিক ৯ ইঞ্চির এফএইচডি প্লাস ডাইনামিক অ্যামোলেড ২এক্স পর্দার। ডিভাইসটির ক্যামেরা সেটআপে রয়েছে ১০এক্স ডিজিটাল জুম ও ফোরকে ভিডিও সমর্থিত ৫০ মেগাপিক্সেলের মূল লেন্স এবং একটি ১২ মেগাপিক্সেলের আল্ট্রাওয়াইড ক্যামেরা।
ফোনে ব্যবহৃত হয়েছে ৪ হাজার ৩০০ এমএএইচ সক্ষমতার ব্যাটারি, যা গত বছরের সংস্করণের মতোই অপরিবর্তিত রেখেছে স্যামসাং। কেবল ১৮০ গ্রাম ওজনের এ ফ্লিপ ৮ ফোনটি গ্যালাক্সি সিরিজের অন্যান্য ফোল্ডএবলের চেয়ে পকেটে বেশ হালকা লাগবে।
১ হাজার ২০০ ডলার প্রারম্ভিক মূল্যের এ ফোনটি পকেটের সাশ্রয়ও কিছুটা বাড়াবে, যা ফোল্ড ৮ সিরিজের চেয়ে তুলনামূলক কম। তবে জেড ফ্লিপ ৭ ও ৬-এর শুরুর দামের চেয়ে এ ফোনের দাম ১০০ ডলার বেশি। ব্যাটারির আকার বা স্ক্রিনের অনুপাতের মতো এ দামের সংখ্যাটিও বছর বছর ওপরের দিকেই উঠছে।
গ্যালাক্সি ওয়াচ ৯ ও গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা ২
গ্যালাক্সি ওয়াচ ৯ একবার চার্জে আগের মডেলের চেয়ে বেশি সময় চলবে। এতে রয়েছে ৩৯০ এমএএইচ সক্ষমতার ব্যাটারি, যা গ্যালাক্সি ওয়াচ ৮-এর চেয়ে ২০ শতাংশ বড়। এর ডিসপ্লেতে তিন হাজার নিটস পর্যন্ত সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতা ধরে রাখা হলেও বড় ব্যাটারির কারণে চার্জ শেষ হওয়ার আগে ঘড়িটি বেশি সময় পরিষেবা দেবে।
অন্যদিকে ‘গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা ২’ মডেলেও দেখা গেছে চোখে পড়ার মতো কিছু বড় পরিবর্তন। এর ডিসপ্লে এবার সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার নিটস পর্যন্ত উজ্জ্বলতা দেবে, আগের মডেলে যা ছিল তিন হাজার নিটস।
এ ঘড়িতে রয়েছে ৮০০ এমএএইচ সক্ষমতার ব্যাটারি, যা আগের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বড়। এতসব প্রযুক্তি যোগ হওয়ার পরও এর শক-রেজিস্ট্যান্ট টাইটানিয়াম কেসিংটি আগের ওয়াচ আল্ট্রার চেয়ে ১২ শতাংশ পাতলা করেছে স্যামসাং, যার পুরুত্ব কেবল ১০.৭ মিলিমিটার।
স্যামসাং উভয় স্মার্টওয়াচের জন্য আগের চেয়ে ছোট, হালকা ও নরম বেল্ট বা ব্যান্ড তৈরি করেছে। ফলে নতুন মডেলগুলো ব্যবহারকারীদের হাতে পরতে আরও বেশি আরামদায়ক হবে।
অ্যালুমিনিয়াম কেসিংয়ের গ্যালাক্সি ওয়াচ ৯-এর ৪০ মিলিমিটার ভ্যারিয়েন্টটি গ্রাফাইট ও ক্রিম রঙে এবং ৪৪ মিলিমিটার ভ্যারিয়েন্টটি গ্রাফাইট ও সিলভার রঙে পাওয়া যাবে।
ব্লুটুথ সংস্করণের জন্য এর সবচেয়ে সাশ্রয়ী মডেলের দাম ধরা হয়েছে ৩৮০ ডলার এবং এলটিই সংস্করণের দাম ৪৩০ ডলার। অন্যদিকে ৪৭ মিলিমিটারের ওয়াচ আল্ট্রা ২-এর দাম ৭০০ ডলার, যা টাইটানিয়াম গ্রে ও টাইটানিয়াম সিলভার রঙে মিলবে।
আগের বিভিন্ন মডেলের তুলনায় এবারও দাম কিছুটা বেড়েছে, যেখানে ওয়াচ ৮-এর ব্লুটুথ সংস্করণ ৩৫০ ডলার, এলটিই সংস্করণ ৪০০ ডলার ও ওয়াচ আল্ট্রা ৬৫০ ডলারে বাজারে এসেছিল।
আরও পড়ুন…
