Published : 04 Jul 2026, 03:45 PM
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবজাতির সেরা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলো হয়েছে সাধারণ এক কাজ, প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। আকাশে ওড়ার জন্য আমাদের প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল পাখিদের আকাশে ডানা মেলে ওড়া দেখে।
সামুদ্রিক জীবন ও সামগ্রিকভাবে সমুদ্রের প্রতি আমাদের আকর্ষণ শেষ পর্যন্ত আমাদের সাবমেরিন, নৌকা ও ইতিহাসের বড় বড় জাহাজ তৈরিতে সাহায্য করেছে, যা পরবর্তীতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যুদ্ধের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকৃতির নকশা থেকে শেখার এ পদ্ধতিটি ‘বায়োমিমিক্রি’ নামে পরিচিত ও প্রকৃতি থেকে ধারণা ধার করার এ প্রবণতা কখনও ফুরোবে না বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ পাওয়া যায় চীনের ‘বেইজিং ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’র একদল বিজ্ঞানীর কাছ থেকে। সাপের বিশেষ কিছু প্রজাতির চোখ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কৃত্রিম এক দৃষ্টি ব্যবস্থা তৈরি করেছেন তারা।
অনানুষ্ঠানিক ভাবে একে ‘স্নেক ভিশন’ বলা হচ্ছে ‘লাইট, সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশনস’-এ।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ‘পিট ভাইপার’ প্রজাতির এক সাপের তাপ-শনাক্তকরণ সক্ষমতাকে নকল করে প্রযুক্তিটি তৈরি করেছে তারা। এসব সাপ বিবর্তনের মাধ্যমে উষ্ণ শরীর থেকে নির্গত ইনফ্রারেড বিকিরণ বা অবলোহিত রশ্মি শনাক্ত করতে পারে, যা তাদের ঘুটঘুটে অন্ধকারেও শিকার খুঁজে পেতে ও ‘দেখতে’ সাহায্য করে।
নতুন প্রযুক্তিটির লক্ষ্য বর্তমানে প্রচলিত নাইট-ভিশন ক্যামেরা ও সাধারণ ক্যামেরার স্বচ্ছ ও উচ্চমানের ছবির মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে তা দূর করা। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি বিভিন্ন নাইটভিশন সিস্টেম প্রায়ই ঝাপসা ছবি তৈরি করে। কারণ সেগুলো নিজস্ব ইনফ্রারেড আলোর ওপর নির্ভর করে ও বস্তু থেকে নির্গত প্রাকৃতিক ইনফ্রারেড বিকিরণ শনাক্ত করতে পারে না।

তবে সাধারণ ক্যামেরা সেন্সরকে প্রাকৃতিকভাবে নির্গত এই ইনফ্রারেড রশ্মি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শনাক্তের ক্ষমতা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করেছে ‘স্নেক ভিশন’। সাধারণ ক্যামেরা সেন্সরকে ঘুটঘুটে অন্ধকারেও স্পষ্ট ও বিস্তারিত ছবি তোলার সুযোগ করে দেয় এ প্রযুক্তি, যা বর্তমানে প্রচলিত কম দামি বিভিন্ন নাইটভিশন ক্যামেরার পক্ষে সম্ভব নয়।
‘স্নেক ভিশন’ প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে?
‘স্নেক ভিশন’ প্রযুক্তি বোঝার জন্য মনে রাখা জরুরি যে, আমাদের আশপাশের প্রতিটি বস্তু থেকে ইনফ্রারেড রশ্মি বেরোয়। বস্তুগুলো প্রতিনিয়ত তাপ ছাড়ছে বা শুষে নিচ্ছে। এ প্রক্রিয়াটি ঘুটঘুটে অন্ধকারেও সারাক্ষণ চলতে থাকে, যা আমাদের চোখ বা সাধারণ ক্যামেরা সেন্সর শনাক্ত করতে পারে না। ফলে এমন পুরোপুরি অদৃশ্য থেকে যায়। প্রচলিত বিভিন্ন থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা এই রশ্মি দেখতে পেলেও সেগুলোর জন্য বিশেষ ধরনের ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল টুল বা শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।
প্রযুক্তিটি মূলত ‘সিএমওএস’ সেন্সরের বিভিন্ন স্তরের মাঝে এক বিশেষ ‘কোয়ান্টাম-ডট’ স্তর বসিয়ে এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে সহজ করে তোলে। এ স্তরটিই সেন্সরকে ইনফ্রারেড বিকিরণ শনাক্ত করতে ও সেটিকে দৃশ্যমান আলোতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। স্তরটিকে অনেকটা একজন ‘অনুবাদক’-এর মতো কল্পনা করা যেতে পারে, যা বাইরে থেকে আসা অদৃশ্য রশ্মিকে শুষে নেয় ও সেই শক্তিকে দৃশ্যমান আলোর ফোটনে রূপান্তরিত করে, যা ‘সিএমওএস’ ক্যামেরা সেন্সর সহজেই শনাক্ত করতে পারে।
একবার এ রূপান্তর ঘটলে সেন্সরটি ইনফ্রারেড বিকিরণকে এমনভাবে ‘দেখতে’ পায় যেন এটি কোনো সাধারণ ছবি। আধুনিক বিভিন্ন ‘সিএমওএস’ সেন্সর ছবির যে তীক্ষ্ণতা ও সূক্ষ্ম ডিটেইল দিতে পারে, এ সেন্সরটি সেই মান বজায় রেখেই ইনফ্রারেড রশ্মি ধারণ করে। ফলে ঝকঝকে ও বিস্তারিত তাপীয় ছবি মিলবে, যা প্রচলিত বিভিন্ন থার্মাল ক্যামেরার তুলনায় অনেক বেশি উন্নত।
‘স্নেক-ভিশন’ প্রযুক্তি অদৃশ্য তাপের এক সম্পূর্ণ নতুন জগতকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে, যা আধুনিক ডিজিটাল ফটোগ্রাফির মতোই সহজ ও স্বচ্ছভাবে কাজ করে বলে দাবি আরে নির্মাতাদের।