এবার সরকারি প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ‘বম পার্টি’র সঙ্গে বৈঠক

বৈঠকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছিলেন বলে জানিয়েছেন মুখপাত্র।

বান্দরবান প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 Nov 2023, 03:12 PM
Updated : 5 Nov 2023, 03:12 PM

প্রথমবারের মত পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-কেএনএফের সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সরাসরি বৈঠক হয়েছে। 

পাহাড়ে ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিত কেএনএফ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সংঘাতের জেরে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি’র উদ্যোগে রোববার তিন ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে ‘বেশ কিছু বিষয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতা’ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এর আগে জুলাই ও অগাস্টে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি ও কেএনএফের মধ্যে দুইবার ভার্চুয়ালি আলোচনা হলেও তাতে সরকারের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। দ্বিতীয় দফা বৈঠকের সময়ই কেএনএফকে সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির পক্ষ থেকে।    

তিন মাসের অধিক সময় পর রুমা উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে মুনলাই পাড়া কমিউনিটি সেন্টারে সরাসরি এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানান ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি’ মুখপাত্র ও বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যা।

বৈঠক শেষে বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি’র আহ্বায়ক ক্য শৈ হ্লা মারমা সাংবাদিকদের বলেন, “দুপক্ষই অত্যন্ত সুন্দর ও আন্তরিকভাবে আলোচনা করতে পেরেছি। বাদবাকি বিষয় ডিসেম্বররে মাঝামাঝিতে সরাসরি দ্বিতীয়বার বৈঠকে আলোচনা করা হবে।”

বৈঠকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছিলেন জানিয়ে মুখপাত্র কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যা বিকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সকাল ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত বৈঠক চলে। বৈঠকে কেএনএফ উত্থাপিত প্রস্তাবনাগুলো আমরা শুনেছি। আমাদের কিছু অনুরোধ উনারা রেখেছেন। উভয় পক্ষের সম্মতিতে চলমান শান্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

“কেএনফের মূল যে ছয় দফা সেটা নিয়ে আমাদের আলোচনার সুযোগ নেই। তবে এর বাইরে তাদের পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব এসেছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

মুখপাত্র দাবি করেন, আগামী ডিসেম্বরে আবার একটি সরাসরি বৈঠকের বিষয়ে দুপক্ষ একমত হয়েছে। সেই সময় পর্যন্ত কেউ সংঘর্ষে জড়াবে না এবং উভয়পক্ষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবেন। 

বৈঠকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির আহ্বায়ক ক্য শৈ হ্লা মারমার নেতৃত্বে অংশ নেওয়া অন্য সদস্যরা হলেন- মুখপাত্র কাঞ্চনজয় তঞ্চঙ্গ্যা, বম স্যোসাল কাউন্সিলের সভাপতি লালজারলম বম, সাধারণ সম্পাদক লালথাং জেল বম, কৃপা ত্রিপুরা, খুমি স্যোসাল কাউন্সিলের উপদেষ্টা লেলুং খুমী, অ্যাডভোকেট বাসিংথুয়াই মারমা এবং সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মনু।

অপরদিকে কেএনএফ প্রধান নাথান বমের প্রধান উপদেষ্টা লাল ঙেন লিয়ান বমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্য অংশ নেন।

২০২২ সালের শুরুর দিকে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় কেএনএফ নামে একটি সশস্ত্র সংগঠনের কথা স্যোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায়। বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, খুমি ও ম্রোদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও সেখানে বম জনোগষ্ঠীর কিছু সংখ্যক লোকজন রয়েছে। যার কারণে সংগঠনটি পাহাড়ে ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিতি পায়।

কেএনএফের ফেইসবুক পেইজে তারা জানায়, রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাইছড়ি বিলাইছড়ি ও বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদমসহ নয়টি উপজেলা নিয়ে ‘কুকি-চিন রাজ্য’ হিসেবে গঠন করা হবে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আতঙ্কে সেই সময় ভারতের মিজোরামে পালিয়ে আশ্রয় নেয় পাঁচ শতাধিক বম নারী-পুরুষ।

স্বাভাবিক পরিস্থিতি ও স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ৩০ মে বান্দরবান জেলার বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধি নিয়ে তৈরি করা হয় শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি। পরে জুন মাসে শেষ সপ্তাহে জেলা পরিষদের সভা কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয় কমিটির গঠন ও উদ্দেশ্য।

১৮ সদস্যের এই শান্তি প্রতিষ্ঠার কমিটি আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ক্য শৈ হ্লা মারমা এবং সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন বম স্যোসাল কাউন্সিলের সভাপতি লালজারলম বম। জেলা পরিষদের সদস্য কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যাকে কমিটির মুখপাত্র হিসাবে রাখা হয়েছে।

বান্দরবান জেলায় ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিত এই সশস্ত্র সংগঠনটি অর্থের বিনিময়ে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে গত বছর অক্টোবর মাসে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে জানায় র‌্যাব।

এরপর গত বছর ১৭ অক্টোবর থেকে জঙ্গি ও কেএনএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলার অভিযান চালায় র‌্যাব ও সেনা সদস্যের যৌথ বাহিনী। পরবর্তীতে এ অভিযান চালানো হয় থানচি উপজেলাতেও। এর মধ্যে অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হয়েছে সেনাবাহিনীর বেশ কিছু সদস্যও। সংঘাতে প্রাণ গেছে কেএএনএফ সদস্যেরও।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে কয়েক দফা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়ে রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশী-বিদেশী পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে পর্যায়ক্রমে তিন উপজেলা থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা নেওয়া হলেও রোয়াংছড়ি উপজেলায় দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণে এখনও নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।

আরও পড়ুন:

Also Read: এবার ‘বম পার্টি’র সঙ্গে সরাসরি সংলাপের প্রস্তাব

Also Read: ‘সংলাপ চলাকালে সংঘাত চায় না বম পার্টি, পর্যটন নিয়ে আপত্তি’

Also Read: ‘সব পক্ষের ইতিবাচক সাড়া’ পেয়েছে বান্দরবানে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি

Also Read: বান্দরবানে ‘শান্তি ও স্থিতিশীল’ পরিবেশ ফেরানোর উদ্যোগ

Also Read: শান্তিপূর্ণ সমাধান হলে সহিংসতায় যাবে না সেনাবাহিনী, বান্দরবানে সেনাপ্রধান

Also Read: নতুন জঙ্গি দলের ‘পাহাড়ি যোগ’ পেয়েছে র‌্যাব

Also Read: জঙ্গি আর পাহাড়ি দলের মিলে যাওয়ার বিপদ যেখানে

Also Read: পাহাড়ে সশস্ত্র দল; এই ‘বম পার্টি’ কারা?

Also Read: বান্দরবানে পানি-স্যালাইন বিতরণে গিয়ে বিস্ফোরণে সেনাসদস্য নিহত

Also Read: কেএনএফ ক্যাম্পে অভিযানের সময় বিস্ফোরণে সেনাসদস্য নিহত

Also Read: বান্দরবানে সেনা টহলে ফের বম পার্টির হামলা, দুই সৈনিক নিহত

Also Read: দুর্গম পাহাড়ে ‘বম পার্টি’র গুলিতে সেনাসদস্য নিহত