বান্দরবানে ‘শান্তি ও স্থিতিশীল’ পরিবেশ ফেরানোর উদ্যোগ

সোমবার জেলা পরিষদের উদ্যোগে শহরের অরুণ সারকি টাউন হলে এ সভার আয়োজন করা হয়েছে।

বান্দরবান প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 May 2023, 06:14 PM
Updated : 29 May 2023, 06:14 PM

কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-কেএনএফ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘাতে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে শান্তি ও স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বান্দরবানে একটি মতবিনিময় সভা হয়েছে।

সোমবার সকালে বান্দরবান জেলা পরিষদের উদ্যোগে শহরের অরুণ সারকি টাউন হলে আয়োজিত এ সভায় জেলার ১১টি নৃগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।

মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের ভাষ্য, গত বছরের অক্টোবর থেকে সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন সময় সংঘাতের কারণে স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। মাঝে মধ্যে উভয়পক্ষের হতাহতের ঘটনাও ঘটে। কয়েকটি বম পাড়া এখনও জনশূন্য হয়ে আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা না গেলে সাধারণ মানুষ আরও দুর্ভোগে পড়বে।

শুরুতে মতবিনিময সভা আয়োজনের উদ্দেশ্য তুলে ধরে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা বলেন, কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-কেএনএফ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে একটি শান্তিপূর্ণ জেলা অস্থিতিশীল হয়ে আছে। স্থানীয় লোকজন বিভিন্নভাবে দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এলাকার লোকজন বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। অনেকই ঠিকমত জুমচাষও করতে পারেনি বলে জানা গেছে।

“এ অবস্থায় কুকি-চিন সদস্যদের কীভাবে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায় সে ব্যাপারে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছে।

“দিনব্যাপী সভার শেষে তাদের সবার মতামতের ভিত্তিতে যাতে একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারি; যাতে করে এলাকার সবাই একটা স্বাভাবিক পরিবেশে বসবাস করতে পারে। তাছাড়া সশস্ত্র দল কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট সদস্যদের তাদের ভ্রান্ত পথ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায়।”

মত বিনিময় সভায় প্রথম পর্বে ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খিয়াং, খুমি এবং মারমাদের সামাজিক ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

গত অক্টোবর থেকে বিরুপ পরিস্থিতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী আতঙ্কে ভুগছেন বলে তারা বক্তব্যে বলেন।

বম ছাত্র সংগঠনের সভাপতি লাল ঙাক বম বলেন, দশ হাজারেও কিছু বেশি সদস্যের একটি জনগোষ্ঠীর কিছু যুবক কেন অস্ত্র হাতে তুলে নিল এটা খুঁজতে হবে। যারা বিপথে রয়েছে তাদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আগেও ছিল; এখনও চলমান রয়েছে। তবে অনেকেই বম জনগোষ্ঠীর সবাইকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করা করছে।

“কিন্তু কুকি-চিন সদস্যরা বম জনগোষ্ঠীর হলেও এতে সবাই জড়িত নয়। তাছাড়া এ বিষয়ে কথা বলতে সবাই অনিরাপদবোধ মনে করে। তবে শুধু কুকি-চিন নয়, খোদ বান্দরবান শহরেই আরও বিভিন্ন সশস্ত্র দল রয়েছে। এগুলোর ব্যাপারেও সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।”

মতবিনিময় সভার দ্বিতীয় পর্বে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে থানচি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থোয়াইহ্লামং মারমা বলেন, বাকলাই পাড়া, প্রাতা পাড়া, শেরকর পাড়া এবং সিংঅ্লংপি বমপাড়াগুলো জনশূন্য হয়ে আছে। তারা কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না। বাকলাই পাড়া ৩৮টি বম পাড়ার মধ্যে এখন ১১টি পরিবার রয়েছে। ওই পরিবারগুলোও আতঙ্কে শুক্রবার থানচি সদরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদেরকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা দেখভাল করছেন।

থোয়াইহ্লামং মারমা বলেন, “কয়কে দিন আগে বাকলাই পাড়া পরিদর্শন করে দেখেছি, জনশূন্য পাড়াগুলোর লোকজন কোথায় চলে গেছে কেউ তা স্পষ্ট করে বলতে পারেনি। তারা বলছে, প্রত্যেক দিন ভোর হওয়ার সাথে একটি করে পরিবার নাই হয়ে যাচ্ছে। তারা কোথায় চলে যায়, কীভাবে চলে যায় কেউ বলতে পারেনি। এ কারণে ভয়ে অবশিষ্ট ১১ পরিবারও থানচি সদরে এসে আশ্রয় নিয়েছে।”

জনশূন্য বম পাড়াগুলো প্রশাসনিকভাবে রুমা উপজেলা পড়লেও যোগাযোগের সুবিধার কারণে থানচি সদরে এসে আশ্রয় নেন বলে জানান এই জনপ্রতিনিধি।

বম সোস্যাল কাউন্সিলের সভাপতি জারলম বম বলেন, তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবানই সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ জনপথ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময় এখানে অশান্তি বিরাজ করছে। যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন ফোরামে কথা বলার জন্য বমদের কোনো সামাজিক নেতা ছিল না। কিন্তু তারা শান্তিপ্রিয়। সেই বম জনগোষ্ঠী এখন বড় বিপদে। তারা এখন সারাদেশে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে শুধু বম নয়, অস্থিতিশীল পরিবেশে পড়ে অন্যান্য জনগোষ্ঠীও ক্ষতির শিকার হয়েছে।

অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতের মিজোরাম রাজ্যে এবং মিয়ানমারের চিন রাজ্যে দুই হাজারের মতো বম আশ্রয় নিয়েছে। বমদের ঐতিহ্যবাহী আরথাহ্ পাড়া, বাসঅ্লাং পাড়া, থিংদলতে পাড়া এখন জনশূন্য। জুমচাষের নির্ভরশীল বমপরিবারগুলো এ বছর জুমচাষ করতে না পারায় তারা খেয়ে না শেয়ে খাদ্যসংকটে রয়েছে।

বম সোস্যাল কাউন্সিল মূলত সামাজিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য সংগঠন হলেও গত ডিসেম্বর থেকে তারা কেএনএফকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় অন্যান্য জনগোষ্ঠীও যুক্ত হয়েছে। এটা খুব আশাবাদীর বিষয় বলে জানান বম সামাজিক সংগঠনের এই প্রতিনিধি।

এদিকে গত বছর অক্টোবর থেকে কোন পাড়া থেকে কতজন কোন জায়গায় পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে দ্রুত তালিকা করার পরামর্শ দেন অ্যাডভোকটে বাসিংথুয়াই মারমা।

অ্যাডভোকেট বাসিংথুয়াই মারমা বলেন, বম শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও অনেক ক্ষতি হয়েছে। সেগুলোও তালিকা করা দরকার। পালিয়ে থেকে যাদের জুমচাষের ক্ষতি হয়েছে তাদের তালিকা করে রেশনের ব্যবস্থাও করা দরকার।

এছাড়া সবাইকে নিয়ে শান্তি সম্মেলন ও সবাবেশ করার উদ্যোগ নেওয়ার আহবান জানান তিনি।

এছাড়া দুপুরের মধ্যাহ্নভোজের পর দ্বিতীয় পর্বে বান্দরবানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও বক্তব্য রাখেন। সামাজিক সংহতি ও শান্তি-স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দুজন করে প্রতিনিধি রেখে একটি কমিটি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মতবিনিময় সভায় অন্যান্যর মধ্যে থানচি উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান খামলাই ম্রো। জেলা পরিষদের সদস্য সিঅং খুমী, জেলা পরিষদের সদস্য সিংইয়ং ম্রো, জেলা পরিষদের সদস্য কাঞ্চনজয় তঞ্চঙ্গ্যা, লেলং খুমী, অ্যাডভোকেট কাজী মহতুল হোসেন যন্ত, প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনু ও ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সভাপতি খুশীরায় ত্রিপুরা বক্তব্য রাখেন।

কেএনএফের ফেইসবুক পেইজে তারা জানিয়েছেন, রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাইছড়ি বিলাইছড়ি ও বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদমসহ ছয়টি উপজেলা নিয়ে ‘কুকি চিন রাজ্য’ হিসেবে গঠন করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বান্দরবান জেলায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) যা ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিত এই সশস্ত্র সংগঠনটি অর্থের বিনিময়ে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে অক্টোর মাসে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে জানায় র‌্যাব।

এরপর গত বছর অক্টোবর মাস থেকে জঙ্গি ও কেএনএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলার অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব ও সেনা সদস্যের যৌথ বাহিনী। অভিযানের কারণে রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণের উপর এখনও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।