‘সংলাপ চলাকালে সংঘাত চায় না বম পার্টি, পর্যটন নিয়ে আপত্তি’

বান্দরবানের একটি রিসোর্টে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির পক্ষ থেকে কেএনএফের কাছে শান্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বান্দরবান প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 19 July 2023, 12:47 PM
Updated : 19 July 2023, 12:47 PM

পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি-কেএনএফ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সংঘাতের জেরে সৃষ্ট সহিংসতা ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সংলাপ শুরু করেছে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি।

শহরের একটি রিসোর্টে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বুধবার বেলা ১১টা থেকে দুই ঘণ্টাব্যাপী এই সংলাপে উদ্যোক্তা সংগঠন শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির পক্ষ থেকে পাহাড়ে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কেএনএফের কাছে শান্তির প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

অপরদিকে কেএনএফের পক্ষ থেকে এই সংলাপ চলাকালে কোনো ধরনের সংঘাত-অপহরণের ঘটনা যাতে না ঘটে তার নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে বলে জানান শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির মুখপাত্র ও বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য কাঞ্চনজয় তঞ্চঙ্গ্যা।

সংলাপ শেষে মুখপাত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা শান্তির প্রস্তাব দিয়েছি। তারাও শান্তি চায় বলে জানিয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে কতকগুলো দাবি এসেছে। আমরা বলেছি, সেগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দেব।

“কেএনএফ সদস্যরা বলেছেন, সংলাপচলাকালীন কেউ যাতে সংঘাত ও অপহরণের মত ঘটনা না ঘটায়। তারা পর্যটনসহ বেশ কিছু বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে। তাদের আপত্তির বিষয়গুলো সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে। আলোচনা শুরু হয়েছে মাত্র। এই শান্তির সংলাপ চলমান থাকবে।’’

আলোচনা অত্যন্ত সৌহাদ্যপূর্ণ ও আন্তরিকতার সঙ্গে সুন্দরভাবে হয়েছে উল্লেখ করে মুখপাত্র আরও জানান, কেএনএফের সাধারণ সম্পাদক মুনয়ার এতে নেতৃত্বে দিয়েছেন। সঙ্গে আরও তিন-চারজন ছিলেন। অপরদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির ১২ জন সদস্য ছিলেন।

২০২২ সালের শুরুর দিকে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে একটি সশস্ত্র সংগঠনের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা যায়। পরে অক্টোবরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, কেএনএফ বা ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিত এই সশস্ত্র সংগঠন অর্থের বিনিময়ে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

এরপর জঙ্গি ও কেএনএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলার অভিযান চালায় র‌্যাব ও সেনা সদস্যের যৌথ বাহিনী। পরবর্তীতে এ অভিযান চালানো হয় থানচি উপজেলাতেও। অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হয়েছে সেনাবাহিনীর বেশ কিছু সদস্যও। সংঘাতে প্রাণ হারায় বম পার্টির সদস্যরাও।

এর জেরে আতঙ্কে ভারতের মিজোরামে পালিয়ে যায় বম জনগোষ্ঠীর পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ। বন্ধ হয়ে যায় বান্দরবানের পর্যটকদের ভ্রমণও। জুম চাষের ক্ষতির পাশাপাশি সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জনজীবন অস্থির ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ের ১১টি নৃগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্য পেশাজীবীরা জনজীবন স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কেএনএফের সঙ্গে সংলাপের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি গঠন করেন। মে মাসে মতবিনিময় করার পর জুনের শেষ সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটি গঠন ও এর উদ্দেশের কথা জানানো হয়। 

১৮ সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা মারমা এবং সদস্যসচিব বম সোস্যাল কাউন্সিলের সভাপতি লালজারলম বম। এ ছাড়া কমিটির সদস্য হিসেবে আছেন- বম সোস্যাল কাউন্সিলের উপদেষ্টা রেভারেন্ট পাকসিমবয়ত্লুং বম, জেলা পরিষদের সদস্য ও ম্রো সোস্যাল কাউন্সিলের উপদেষ্টা সিংইয়ং ম্রো, বাংলাদেশ খুমী কল্যাণ অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা লেলুং খুমী, প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনু ও সাংবাদিক বুদ্ধজ্যোতি চাকমা।

কমিটিতে সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা প্রশাসনের কেউ নেই; তবে এ ধরনের সংলাপকে স্বাগত জানিয়েছেন বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম। 

বিকালে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা এই ধরনের সংলাপকে সাধুবাদ জানাই। কেউ পাহাড়ে সংঘাত চায় না। পাহাড়ে সবাই শান্তি চায়। যে ঘটনাগুলো ঘটেছে দ্রুত তার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।”

জেলা পরিষদ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে বম সোস্যাল কাউন্সিল ও অন্যান্য সামাজিক সংগঠনদের নিয়ে শান্তির উদ্যোগ নিয়েছে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

কেএনএফের ফেইসবুক পেইজে তারা জানিয়েছেন, রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাইছড়ি বিলাইছড়ি ও বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদমসহ ছয়টি উপজেলা নিয়ে ‘কুকি চিন রাজ্য’ হিসেবে গঠন করা হবে।

এরপর গত বছর অক্টোবর মাস থেকে জঙ্গি ও কেএনএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলার অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব ও সেনা সদস্যের যৌথ বাহিনী। অভিযানের কারণে রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

তবে গত ১৪ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রোয়াংছড়ি ছাড়া সব উপজেলায় ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়েছে প্রশাসন।

আরও পড়ুন:

Also Read: ‘সব পক্ষের ইতিবাচক সাড়া’ পেয়েছে বান্দরবানে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি

Also Read: বান্দরবানে ‘শান্তি ও স্থিতিশীল’ পরিবেশ ফেরানোর উদ্যোগ

Also Read: শান্তিপূর্ণ সমাধান হলে সহিংসতায় যাবে না সেনাবাহিনী, বান্দরবানে সেনাপ্রধান

Also Read: বান্দরবানে পানি-স্যালাইন বিতরণে গিয়ে বিস্ফোরণে সেনাসদস্য নিহত

Also Read: কেএনএফ ক্যাম্পে অভিযানের সময় বিস্ফোরণে সেনাসদস্য নিহত

Also Read: বান্দরবানে সেনা টহলে ফের বম পার্টির হামলা, দুই সৈনিক নিহত

Also Read: দুর্গম পাহাড়ে ‘বম পার্টি’র গুলিতে সেনাসদস্য নিহত

Also Read: নতুন জঙ্গি দলের ‘পাহাড়ি যোগ’ পেয়েছে র‌্যাব

Also Read: জঙ্গি আর পাহাড়ি দলের মিলে যাওয়ার বিপদ যেখানে

Also Read: পাহাড়ে সশস্ত্র দল; এই ‘বম পার্টি’ কারা?