Published : 06 Sep 2025, 11:48 AM
বর্ষার শেষ ও শরতের শুরুতে নানাবাড়ির পেছনের বিলটা মায়াবী হয়ে ওঠে। দিগন্তবিস্তৃত বিল ভরে যায় সাদা শাপলায়। পিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে সমবয়সী ছোট মামা আর আমি তালের ডোঙ্গা অথবা ছোট নৌকা নিয়ে বিলে হারিয়ে যাই। শাপলা তোলার চেয়ে আমাদের বরং বিলের অল্প জলের ভেতরে নৌকা বেয়ে চলা আর শাপলার জালে আটকে গেলে নৌকা ঠেলে নিয়ে যাওয়াতেই আনন্দ।
এই আনন্দ আমরা উদযাপন করেছি শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যজুড়ে। এমনকি সংসারী হওয়ার পরও আমাদের এই উচ্ছ্বাস আর বিলের ভেতরে দাপাদাপির উন্মাদনায় কোনো ভাটা পড়েনি। কিন্তু হঠাৎ করেই আমাদের কাছে বিলগুলো অচেনা। সেখানে এখন ‘প্রবেশ নিষেধ’।
দিন কয়েক আগে ছোট মামার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথোপকথন এমন:
— মামু, বিলে শাপলা হইছে?
— শাপলা পাইবি কই?
— কেন, বিলে পানি ওঠে নাই?
— বিল আছেনি?
—বিল নাই মানে কী?
—বিলে তো প্রজেক্ট!
—কীসের প্রজেক্ট?
—মাছের ঘের।
আমাদের তিন ভাইবোনোর শৈশব-কৈশোরের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলো মিশে আছে নানাবাড়ির পেছনের এই বিলে। বরষায় তার এক রূপ, হেমন্তে আরেক, আবার শীতকালে এই বিল মেলে ধরে তার অন্যরকম ভালোবাসার জমিন। কিন্তু সেই বিলে বরষা ও শরতেও শাপলা নেই মানে হলো শীতে সবজিও হবে না। অন্য ঋতুতে ধান বা পাটও নয়। শুধু মাছ। রুই, কাতলা, মৃগেল। মানুষ শুধু মাছ খেয়ে থাকবে?
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ যে একটি প্রজেক্ট বা প্রকল্পশাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হলো, ফসলের মাঠগুলোয় কল-কারখানা আর মাছের ঘের তার বিরাট উদাহরণ। খালগুলো হয়ে গেছে রাস্তা, না হয় কালভার্ট। যৌথ মালিকানার বিলগুলোয় যখন কারখানা বা মাছের ঘের হয়ে যায়, তখন সেগুলো আর এজমালি থাকে না। হয়ে যায় ব্যক্তিগত। সেখানে চাইলেই অন্য বাড়ির বা অন্য গ্রামের কিংবা অন্য এলাকার মানুষের প্রবেশ সহজ নয়। সেখানে একটি অলিখিত নিষেধাজ্ঞা দেয়া থাকে। কেননা বিলের ভেতরে মাটির উঁচু বাঁধ দিয়ে যে বিরাট পুকুর বা দিঘি বানানো হয়েছে, তার ভেতরে আছে টাকা। সাদা সোনা।

বিরাট গলদা চিংড়ি কিংবা বিশ কেজি ওজনের একটা রুই মাছ বিক্রি করে যে দাম পাওয়া যাবে, এক নৌকা শাপলাও তার কাছে নস্যি। তাছাড়া বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাতের কাঁচামাল ধান আবাদের ঝামেলা আর খরচ চিন্তা করলে ওই তুলনায় মাছ চাষ বেশি লাভজনক। উপরন্তু ধান আবাদের জন্য যে দক্ষতা ও পরিশ্রম লাগে, যে পরিমাণ সময় দিতে হয়, কৃষকের সন্তানের সেদিকে আকর্ষণ নেই। এটাকে সে ‘প্রেস্টিজিয়াসও’ মনে করে না। অর্থাৎ ‘কৃষিকাজ করি’ বলার চেয়ে ‘মাছের ব্যবসা করি’ বলাটা সামাজিকভাবে মর্যাদার। কেননা জমিতে যে ধান-পাট বা অন্য কোনো ফসল আবাদ করে, লোকে তাকে বলে ‘চাষা’ অথবা ‘চাষার ছেলে’। কিন্তু ওই জমিতে যারা এখন মাছের ঘের বানিয়েছে, তারা এখন ব্যবসায়ী। বিয়ের পাত্রী খুঁজতে গিয়ে বলে, “ছেলের তো বিরাট মাছের ঘের। পড়ালেখা শেষ করে আর চাকরি-বাকরির দিকে যায় নাই। সে এখন মাছের ঘের দিয়েই মাসে লাখ টাকা আয় করে।” কিন্তু স্বল্প আয়তনের দেশে ২০ কোটি মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে আছে যে কৃষকের পরিশ্রমে, ওই কৃষকের মাস শেষে লাখ টাকা আয় তো দূরে থাক, বরং বীজ-সার ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে গেলে দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে যায়। তাছাড়া ফসলের বীজে তার যে নিজের অধিকার ছিল, সেটিও চলে গেছে দেশি-বিদেশি নানা কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে কৃষক এখন নিতান্তই কৃষিশ্রমিক। সুতরাং শ্রমিক পরিচয়ে কে বাঁচতে চায়। ফলে ওই ফসলের জমি সে হয় মাছের ঘের করার জন্য ইজারা দিয়ে দেয়, না হয় নিজেই মাছের ঘের বানায়। কোথাও কোথাও আবার ফসলের জমিতে খামারের গরুর জন্য ঘাস চাষ করা হচ্ছে।
পরিতাপের বিষয় হলো, কৃষিভিত্তিক দেশে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কমছে কৃষকের সংখ্যা। উপরন্তু ওই জমি আর ধন-ধান্য-পুষ্পে ভরে ওঠে না। শরতে সেখানে শাপলা হয় না। প্রতিদিন এখানে আর ধানের গুচ্ছের মতো ‘সবুজ সহজ ভোর’ হয় না। হেমন্তে ভোরের রোদ ‘ধানের ওপরে মাথায় পেতে’ শোয় না। শীতে ওই মাঠে খড়ের আগুন জ্বালিয়ে খেজুরের রস খাওয়ার আয়োজন দূর অতীতের স্মৃতি বলে মনে হয়। এখন ওই বিলগুলো প্রাচীরঘেরা বিরাট জলাশয়, তার ভেতরে মাছের দাপাদাপি। চারপাশে কিছু সবজির বাগান।
নানাবাড়ির যে বিলের প্রসঙ্গে এত কথা, সেটির অবস্থান শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ‘অপূর্ব সুন্দরী’ মহিষার গ্রামে। শরীয়তপুরের স্থানীয় সংবাদপত্র রুদ্রবার্তার একটি সংবাদ শিরোনাম: ‘ভেদরগঞ্জ কৃষি জমি নষ্ট করে প্রভাবশালীদের মাছের ঘের।’ খবরে বলা হয়, ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানা এলাকায় আরশীনগর ইউনিয়নে বিলের ফসলি জমি কাটার হিড়িক পড়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই একটি অসাধু চক্র প্রকাশ্যে অবৈধভাবে এস্কেভেটর (ভেকু) দিয়ে খামার খনন করছে। উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারসহ বেশ কয়েকজন কৃষক। (রুদ্রবার্তা, ২০ জুন ২০২৩)।
সবুজ শ্যামল শরীয়তপুরে ফসলি জমিতে মাছের খামার বানানোর এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০১৩ সালে দেশের অন্যতম প্রধান একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়, শরীয়তপুরে কৃষিজমি নষ্ট করে মাছের খামার তৈরির হিড়িক পড়েছে। অনাবৃষ্টি, পানিসংকট ও বর্ষার পর জলাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদিত না হওয়ায় এবং ফসল উৎপাদনের চেয়ে মাছের খামারের জন্য জমি ভাড়া দেওয়া বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরা এদিকে ঝুঁকছেন। এভাবে ফসলি জমি কমলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ।
ওই খবরেই বলা হয়, এক বছরে জেলায় প্রায় ২৬ হাজার একর ফসলি জমিতে মোট ২২০টি মাছের খামার তৈরি করা হয়েছে। খামার ব্যবসায়ীরা কৃষকের কাছ থেকে একরপ্রতি স্থানভেদে বছরে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ভাড়ায় ৮ থেকে ১২ বছর মেয়াদে এসব জমি ভাড়া নিয়ে পুকুর কেটেছেন। বেলায়েত হোসেন নামে একজন কৃষক জানান, উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে খরচ ওঠে না। বাধ্য হয়ে তিনি মাছের খামার করার জন্য জমি বর্গা দিয়েছেন। আর মৎস্য ব্যবসায়ী শওকত হোসেন বলেন, মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এলাকার মানুষ এ ব্যবসার দিকে ঝুঁকেছেন। (২১ মে ২০১৩)।
তবে এই দৃশ্য শুধু শরীয়তপুর জেলা নয়, সারা দেশেই কমবেশি দেখা যায়। গত মে মাসে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর পাড়েও বিশাল একটি ফসলের মাঠে দেখেছি এস্কেভেটর দিয়ে বড় বড় গর্ত বানানো হচ্ছে। তার মানে ওখানেও আর ধান হবে না। খোলা মাঠে গিয়ে আর পাড়ার ছেলেরা ফুটবল খেলবে না। বিকালে ওই মাঠে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কারও আর অবাধ যাতায়াতের অধিকার থাকবে না। ফসলের মাঠ কিংবা নদী পাড়ের খোলা প্রান্তর চলে যাবে ব্যক্তি মালিকানায়। মাছের ঘেরের নিরাপত্তাবেষ্টনীর কারণে হয়তো ওখান দিয়ে আর নদীর পাড়েও যাওয়া যাবে না।

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ফসলের জমি ধ্বংস করে মাছের ঘের বানানোর এই কথিত উন্নয়নের থাবা পড়েছে ফসলের ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত উত্তরেও। মাছের ঘেরের পাশাপাশি সেখানে আরেকটি সংকটের নাম ‘আমের বাগান’। ধান ও অন্যান্য ফসলের চেয়ে আমের বাগান লাভজনক বেশি হওয়ায় কৃষকরা তাদের জমিকে আমবাগানে রূপান্তর করেছেন। যেদিকে চোখ যায় শুধু আমের বাগান। তাতে দেশের মানুষ কম দামে আম খেতে পারছে বটে, বিপরীতে সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও ফসলের বিন্যাসে যে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে চাল, আলুসহ অন্য অনেক খাদ্যই যে আমদানি-নির্ভর হয়ে পড়বে—ওই বিপদের কথা হয়তো অনেকের ভাবনায় নেই। কারণ মানুষ শুধু মাছ ও আম খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। তাছাড়া আম পাওয়া যায় শুধু বছরের একটি সময়ে। বাকি সময় ওই জমি আর কোনো কাজে আসে না।
ফসলের জমিতে মাছ ও আম চাষের গুরুত্বও কম নয়। কিন্তু কৃষিনির্ভর ও বদ্বীপ রাষ্ট্রের চরিত্র নষ্ট করে দিয়ে অর্থনীতির এই যে নতুন জানালা খুলে দেয়া হলো, তার মধ্য দিয়ে খাল-বিল-জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা মাছ চলে যাচ্ছে জাদুঘরে। মানুষের পাতে হয়তো সাশ্রয়ী দামে রুই-কাতলা-পাঙাস উঠছে, কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা শিঙ, কই, মাগুর, পুঁটি এখন বাটিচালান দিয়ে খুঁজতে হয়। বিশেষ করে যেসব এলাকার বিলগুলো মাছের ঘেরে রূপান্তরিত হয়েছে।
অর্থনীতির এই রূপান্তর কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতিরও রূপান্তর ঘটিয়েছে, তার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হতে পারে মারাত্মক। যেমন অতিবৃষ্টি বা বন্যার মৌসুমে নদী ও খালগুলো যখন অতিরিক্ত পানি ধরতে রাখতে পারবে না, তখন ওই পানি ঢুকে যাবে মানুষের বাড়িঘরে। গ্রাম এলাকায়ও তৈরি হবে জলাবদ্ধতা। দীর্ঘদিন পানি আটকে থাকায় তৈরি হবে ‘ভবদহ পরিস্থিতি’। ওই দিন হয়তো বেশি দূরে নয়। কেননা, ভারি বৃষ্টি ও বন্যার পানি ধরে রাখবে যে বিলগুলো, সেখানে উঁচু বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের বানানোয় মানুষের মতো নদী ও খালের পানিও প্রবেশ নিষেধ।
প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন? কৃষক যদি ফসলের ন্যায্য দাম পেত আর তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা যেত, তাহলে সে ফসলের জমিগুলো মাছের ঘের কিংবা আম বাগানে রূপান্তর করত? ২০ কোটি মানুষের দেশে কৃষক কেন ফসলের ন্যায্য দাম পাবে না? রাজধানীর বাজারে এক কেজি করলা যদি একশ টাকা দিয়ে কিনতে হয়, শরীয়তপুরের কৃষক কেন কেজিতে অন্তত ৫০ টাকাও পাবে না? মাঠ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে ফল ও ফসলের দাম যেভাবে বেড়ে যায়, ওই চেইনের মধ্যে যে মধ্যস্বত্বভোগীরা থাকে, তাদের দৌরাত্ম্য কমানো গেলে এবং পণ্যের পরিবহন খরচ ও রাস্তায় পুলিশ ও মাস্তানদের চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে কৃষকের এই হাহাকার থামানো সম্ভব। তখন তাকে আর ফসলের জমি অন্যের কাছে বর্গা দিতে হবে না। ধনধান্য পুষ্পভরা বিলগুলো তখন কেবল মাছ ও আমের দখলে চলে যাবে না। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের ছয় ঋতুতে বিলগুলো অন্তত ছয়বার তার রূপ বদলাবে। বর্ষার শেষ আর শরতের শুরুতে তালের ডোঙ্গা কিংবা ছোট নৌকা নিয়ে শাপলার বিলে ঘুরতে ঘুরতে কেটে যাবে একটি দুপুর।