Published : 16 Apr 2026, 07:37 PM
কোনো দেশের সরকারের সঙ্গে বনিবনা না হলেই সে দেশকে পাথরযুগে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া মার্কিন প্রশাসনের অনেক দিনের অভ্যাস। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই হুমকি দিয়েছেন ইরানের বিরুদ্ধে। এরকম একটি হুমকিই একটা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবু যে তারা পার পায় তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই—কারণ ক্ষমতার বৈশ্বিক অসমতা।
লক্ষণীয় যে, সবধরনের পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ইরানকে বলা হয় ‘রেজিম,’ সাধারণত কখনও একে দেশ বা সরকার বলা হয় না। অন্যদিকে হামলাকারী আমেরিকা, ইসরায়েলসহ অন্যরা দেশ! এটি কি শুধুই একটি প্রচলিত শব্দ, না এর মধ্যে গভীর পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে? রেজিম একটি বিশেষ সরকারব্যবস্থা–যা দিয়ে সাধারণত স্বল্পমেয়াদী, কর্তৃত্বপরায়ণ ও গণবিচ্ছিন্ন কোনো ক্ষুদে গোষ্ঠির শাসনপদ্ধতিকে বোঝানো হয়। আর দেশ বা রাষ্ট্র ও তার সরকার বলতে বোঝায় বৃহত্তর সত্তা যার সঙ্গে জনগণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্পষ্টতই ইরান এবং ইরানে হামলাকারীদের বোঝাতে শব্দের ব্যবহারে এই তারতম্যের মধ্যে ইঙ্গিতবহ তাৎপর্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আধিপত্যের কামনা, দখলদারিত্বের লিপ্সা, বিমানবিকীকরণের প্রকল্প ও পরিণতিতে অবৈধ হামলাকে বৈধতার মোড়কে ঢাকার কূটচাল।
ইরানের শাসকরা সরকার নয়, রেজিম, কেননা এ সরকার মোল্লাতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সরকার আরও বেশি গোঁড়া ও রাজতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হলেও তারা কেউ রেজিম নয়। অথচ লক্ষণীয়, ইরানি মোল্লাদের চেয়ে তারা চিন্তাচেতনায় অনেক পশ্চাৎপদ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও দমন-নিপীড়ণে অভ্যস্ত। কিন্তু যেহেতু তারা যুক্তরাষ্ট্রের বশংবদ, পশ্চিমা আধিপত্যবাদের সহায়ক ও স্বদেশে নিগ্রহকারী তারা রেজিম নয়, গণতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবান বন্ধু। এই বন্ধুদের সম্মান যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কাছে কতটা উচ্চ তা দেখা যায় ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে। সৌদির যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানকে তিনি এক সভায় দেখিয়ে বলেন, “সে কার্যত ‘কিসিং মাই অ্যাস।’” আর যুবরাজ দাঁত কেলিয়ে হাসেন! কিন্তু ইরানের এই মোল্লাদের কারো সঙ্গে কথা বলতে ট্রাম্প প্রশাসনের বেশিরভাগের কাপড়ে দাগ পড়ে যায়।
যুদ্ধকালে মোল্লাতন্ত্রের কাছে স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশিত হচ্ছে বেশি বেশি করে ধর্মবিশ্বাসের ছাতার নিচে আশ্রয় গ্রহণ, খোদার ওপর ভরসা রেখে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা, যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জনগণকে ধর্মীয় উন্মাদনায় মাতিয়ে তোলা। এর কোনো কিছুই দেখা যাচ্ছে না ইরানে। অন্যদিকে এর সবই দেখা যাচ্ছে ট্রাম্প পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রে ও নেতানিয়াহুর ইসরায়েলে। এই যুদ্ধে খ্রিস্টান আমেরিকা ও ইহুদি ইসরায়েল ক্রমে একেকটি ধর্মীয় রাষ্ট্রের চেহারা নিচ্ছে। মার্কিন সৈন্যদেরকে বোঝানো হচ্ছে এটি একটি ধর্মযুদ্ধ। সম্প্রতি একটি ছবিতে ট্রাম্প নিজেকে যীশু হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। একজন ব্যক্তি ও তাকে ঘিরে থাকা চাটুকারেরা কত বড় প্রতারক, ভণ্ড ও ধর্মব্যবসায়ী হলে এমন প্রচারণা চালাতে পারে! ইরানে হামলা শুরুর জন্য যে ২৮ ফেব্রুয়ারিকে বেছে নেওয়া হয়েছে তাও ধর্মীয় কারণে। এটি ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব পুরিম উদযাপনের আগমুহূর্ত, যা পালিত হয় অতীতের পারস্য রাজ্যে (বর্তমানে ইরান) ইহুদিদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার একটি গল্প স্মরণ করে। দেখা যাচ্ছে একটি অবৈধ হামলাকে ধর্মীয় মোড়ক দেওয়ায় টাম্প-নেতানিয়াহু জুটি মোল্লাদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সরেস।
ইরান একটি রেজিম—কোনো দেশ নয়! আমেরিকা-ইসরায়েল জুটির এ প্রচারণার উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য ইরানের ওপর হামলাকে ‘ন্যায্য’ করার চেষ্টা। হামলার পরিবর্তে ‘যুদ্ধ’ শব্দের ব্যবহারও একই উদ্দেশ্যে। গাজায় ক্ষুধার্ত নিরস্ত্র মানুষের ওপর লাগাতার হামলাও নাকি যুদ্ধ! সন্ত্রাসী শব্দটির অপব্যবহারও একই উদ্দেশ্যে। একজন মানুষকে বিচারের আওতায় না এনে সোজাসুজি হত্যা করা (ওবামা যেমন করেছেন) ও একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে মধ্যরাতে অপহরণ করে নিয়ে আসা, ১০ মিনিটে ১০০ হামলা চালিয়ে একটি দেশের ৩০০ সাধারণ নাগরিককে হত্যা করা—এরকম অসংখ্য অপকর্ম যদি সন্ত্রাসের সংজ্ঞায় না পড়ে, তবে সংজ্ঞা শব্দটিরও নতুন সংজ্ঞা দরকার। উদ্দেশ্য কী?
উদ্দেশ্য নেতানিয়াহুর কথায় ও ট্রাম্পের বক্তৃতায় বারবার প্রকাশিত হয়েছে। ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর ১ এপ্রিল ট্রাম্প হুমকি দেন, “আমরা তাদেরকে পাথরযুগে পাঠিয়ে দিচ্ছি যেখানে তাদের আসল ঠিকানা।” যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও তার এক্স পোস্টে একই হুমকির প্রতিধ্বনি করেন। অথচ পারস্য সভ্যতার অবদান ছাড়া পুরো পশ্চিমা সভ্যতা এখনও মধ্যযুগের অন্ধকারেই ডুবে থাকত। কতটা মূর্খ হলে দুদিনের লায়েক আজ তিন হাজার বছরের সভ্যতার উত্তরাধিকারী ইরানকে বলতে পারে, পাথরযুগেই তাদের ঠিকানা!
তবে ট্রাম্প একা নন, এ ধরনের হুমকি দেওয়া বহুকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের শাসকদের একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সারাহ শামিম তার আল জাজিরায় প্রকাশিত একটি লেখায় (‘Bomb back to the Stone Age’: US history of threats and carpet bombing, ২ এপ্রিল ২০২৬) এর একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরেছেন: ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা কার্টিস লেমে উত্তর ভিয়েতনামকে পাথরযুগে পাঠিয়ে দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারিক আজিজকে হুমকি দেন, তার দেশকে পাথরযুগে ফেরত পাঠানো হবে। ২০০১ সালে নাইন-ইলাভেন হামলার পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তা হুমকি দেন যে, পাকিস্তান আফগানিস্তান আক্রমণে সহায়তা না করলে তার দেশকেও পাথরযুগে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। দেখা যাচ্ছে যাকে ইচ্ছা তাকে যখন ইচ্ছা তখনই পাথরযুগে পাঠিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সব যুদ্ধবাজেরই একটা নৈমিত্তিক হুমকি। কোনো দেশকে উন্নত করার কোনো মুরোদ দেশটির কারো নেই। সুতরাং ট্রাম্প তার পূর্বসূরীদের পথেই হাঁটছেন।
ইরানকে পাথরযুগে পাঠিয়ে দেওয়ার খায়েশ আমেরিকা-ইসরায়েলের বহু পুরনো। কেননা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নে ইরান আপসহীন। ইরানকে মোল্লাতন্ত্রের হাতে ঠেলে দেওয়ায় ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সবিশেষ। ইরানের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ১৯৫৩ সালে তারা উৎখাত করে নিজেদের বশংবদ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসায়। ১৯৭৯ সালে এই একনায়কতান্ত্রিক রাজপরিবারকে উৎখাত করে খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয়, আর তখন থেকেই ইরানের সরকার পরিণত হয়েছে ‘রেজিমে’। মার্কিন প্রশাসন ও ইরানি নেতাদের মাঝে শত্রুতা তখন থেকেই চলমান। এই রেজিমের বিপ্লবী ছাত্রদের হাতে ৫২ জন মার্কিন কুটনীতিক ৪৪৪ দিন (৪ নভেম্বর ১৯৭৯ থেকে ২০ জানুয়ারি ১৯৮১) যাবৎ আটক ছিলেন। আর এবার দেড় মাসের বেশি হরমুজ প্রণালি সফলভাবে বন্ধ করে রেখেছে ইরান।
ইরানে লাগাতার হামলার উদ্দেশ্যই হচ্ছে দেশটির সকল অগ্রগতিকে ধ্বংস করে তাকে অন্তত পাথর যুগের কাছাকাছি পাঠানো। হামলা করা হচ্ছে দেশটির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে—অর্থাৎ তার মস্তিষ্কে ও মেরুদণ্ডে। সেইন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আন্তজার্তিক সম্পর্ক বিষয়ের শিক্ষক ও ‘Revolution and Its Discontents: Political Thought and Reform in Iran’ গ্রন্থের লেখক ইস্কান্দার সাদেগি-বুরোজের্দি জ্যাকোবিনে (১২ এপ্রিল) ‘Israel and the US Have Been Waging War on Iran’s Development’ (ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উন্নয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে) শীর্ষক লেখায় এই চিত্রই তুলে ধরেছেন। মার্কিন ইসরায়েলি এই হামলার টার্গেট প্রকৃতপক্ষে কেবল মোল্লাদের অধীন ‘রেজিম’ নয়— ইরানের ভবিষ্যৎ ও খোদ ইরানি জনগণ।