Published : 18 Jun 2026, 02:57 PM
মানসিক ক্লান্তি, উদ্বেগ কিংবা বিষণ্নতার মতো সমস্যায় ওষুধ বা দীর্ঘ চিকিৎসার পাশাপাশি প্রকৃতির সান্নিধ্যও মানসিক সুস্থতা দিতে পারে।
সবুজ ঘেরা বনে সচেতনভাবে সময় কাটানোর অভ্যাসে আসতে পারে সমাধান। বিশেষজ্ঞরা জানান এটি ‘বন-চিকিৎসা’ নামে পরিচিত।
২০২১ সালে, আন্তর্জাতিক পরিবেশ গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য সাময়িকী-তে প্রকাশিত, কোরিয়ার চুংবুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, বনভিত্তিক কার্যক্রম উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ কমাতে ইতিবাচক ছিল।
সুস্থ ব্যক্তি এবং মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত, দুই ক্ষেত্রেই এর সুফল পাওয়া গেছে।
বন-চিকিৎসা আসলে কী?
অনেকেই মনে করেন, বনভূমিতে হাঁটাহাঁটি করলেই বন-চিকিৎসা হয়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু হাঁটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে মন দিয়ে অনুভব করাই এর মূল বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী স্টেফানি ফ্রেইটাগ রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “শুধু বনভূমিতে হাঁটলে প্রত্যাশিত উপকার পাওয়া যায় না। প্রকৃতির মধ্যে হাঁটার সময় চারপাশের গাছ, পাখির ডাক, বাতাসের স্পর্শ, মাটির গন্ধ কিংবা সূর্যের আলোকে মনোযোগ দিয়ে অনুভব করতে হবে। অর্থাৎ পুরো মনকে বর্তমান মুহূর্তে স্থির রাখাই বন-চিকিৎসার সবচেয়ে প্রধান অংশ।”
এই কারণে বন-চিকিৎসার মধ্যে ধ্যান, ধীরগতিতে হাঁটা, পরিবার বা বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিরিবিলি বসে প্রকৃতিকে অনুভব করাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
প্রকৃতি যেভাবে মনকে শান্ত করে
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জেসিকা মিয়ার্স একই প্রতিবেদনে বলেন, “সারাদিনের উদ্দীপনা মোবাইলের বার্তা, যানবাহনের শব্দ, কাজের চাপ এবং নানান দায়িত্ব মস্তিষ্ককে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেয় না। প্রকৃতির পরিবেশ সেই অতিরিক্ত চাপ থেকে স্নায়ুতন্ত্রকে কিছুটা মুক্তি দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “প্রকৃতির পরিবেশ মনোযোগকে নিজের দিকে টানে। কোনো তাড়াহুড়া নেই, প্রতিযোগিতা নেই কিংবা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপও নেই। ফলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসতে পারে।”
স্টেফানি ফ্রেইটাগ যুক্ত করেন, “প্রকৃতির সৌন্দর্য কৃতজ্ঞতার অনুভূতি তৈরি করে। আর কৃতজ্ঞতার অনুভূতি মানসিক সুস্থতার জন্য জরুরি।”
প্রাকৃতিক আলোও গুরুত্বপূর্ণ
শরীরে একটি স্বাভাবিক জৈবিক সময়চক্র রয়েছে, যা ঘুম, জাগরণ এবং শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।
জেসিকা মিয়ার্স বলেন, “প্রাকৃতিক আলো এই সময়চক্রকে সঠিক রাখতে সাহায্য করে। ফলে রাতে ভালো ঘুম হয়, শরীর ও মন দুটোই বিশ্রাম পায়।”
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ ও মানসিক ক্লান্তি বাড়তে পারে। তাই প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো পরোক্ষভাবেও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সময় নয়, নিয়মিত অভ্যাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ
অনেকেই মনে করেন, বন-চিকিৎসা করতে হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সবুজে থাকতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন অল্প সময় নিয়মিত প্রকৃতির মধ্যে থাকাই বেশি কার্যকর।
জেসিকা মিয়ার্স পরামর্শ দেন, “প্রতিদিন মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিনিটও যদি মনোযোগ দিয়ে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে। সপ্তাহে একদিন দীর্ঘ সময় কাটানোর চেয়ে প্রতিদিন অল্প সময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা বেশি উপকারী হতে পারে।”
মোবাইল থেকে দূরে
প্রকৃতির মধ্যে গেলেও বেশিরভাগ সময়, মোবাইল দিয়ে ছবি তোলা হয় নয়তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার চলে। এতে প্রকৃতির আসল অনুভূতি উপভোগ করা সম্ভব হয় না।
স্টেফানি ফ্রেইটাগের পরামর্শ, “বন-চিকিৎসার সময় মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা কিংবা যতটা সম্ভব ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ যন্ত্রের পর্দা মানুষের মনোযোগকে আবারও ব্যস্ত করে তোলে। অথচ বন-চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হল মনকে শান্ত করা এবং চারপাশকে অনুভব করা।”
জেসিকা মিয়ার্সও একই মত প্রকাশ করে বলেন, “প্রকৃতির কোমল শব্দ, বাতাস কিংবা আলো অনুভব করতে হলে যন্ত্র থেকে কিছুটা দূরে থাকা জরুরি।”
অনুভূতির কথা লিখে রাখা
প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর পর, অনেকের মন হালকা লাগে। আবার কেউ নতুনভাবে নিজের জীবন সম্পর্কে ভাবতে শুরু করেন।
এসব অনুভূতি লিখে রাখলে নিজের মানসিক পরিবর্তন বোঝা সহজ হয়।
স্টেফানি ফ্রেইটাগ বলেন, “একটি ছোট খাতা সঙ্গে রাখা যেতে পারে। সেখানে প্রকৃতির মধ্যে হাঁটার সময় কী দেখলেন, কী অনুভব করলেন কিংবা কোনো নতুন চিন্তা এলো কি না, তা লিখে রাখা উপকারী হতে পারে। এতে নিজের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ে।”
বন না থাকলেও প্রকৃতির কাছাকাছি
শহরের মানুষের জন্য বন সাদৃশ্য জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয়।
তবে এই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হল- কাছাকাছি কোনো উদ্যান, গাছপালায় ঘেরা পথ, লেকের পাড় কিংবা খোলা সবুজ পরিবেশেও একই ধরনের উপকার পাওয়া সম্ভব।
আসল বিষয় হল, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা। কয়েকটি গাছের নিচে বসে কিছুক্ষণ নীরব থাকা, পাখির ডাক শোনা কিংবা বাতাসের স্পর্শ অনুভব করাও মানসিক প্রশান্তি এনে দিতে পারে।
আরও পড়ুন
শান্ত থাকতে প্রকৃতির মাঝে মননশীল ঘোরাঘুরি
অজান্তেই হয়ত বাড়াচ্ছেন মানসিক চাপ: এই ছোট অভ্যাসগুলো চিনে নিন