Published : 24 Jun 2026, 07:19 PM
খেলার উত্তেজনা যখন চরমে, তখন মাঝরাতে ঘুমিয়ে পড়া কোনো ক্রীড়াপ্রেমীর পক্ষেই সম্ভব নয়।
প্রিয় দলের জয় উদযাপন বা টানটান উত্তেজনার ম্যাচ দেখতে গিয়ে প্রায়ই রাতের চার-পাঁচ ঘণ্টার ঘুম হাওয়া হয়ে যায়। তবে পরের দিন তো আর ছুটি নেই!
ঘুম কম হওয়ার কারণে পরদিন সকাল থেকেই শুরু হয় মাথা ঝিমঝিম করা, কাজে মনোযোগ না বসা এবং শরীরজুড়ে এক ধরনের অলসতা।
তবে এক রাতের কম ঘুমানোর ক্লান্তি, সাময়িকভাবে কিছু নিয়ম মেনে সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
ঘুম থেকে উঠেই সূর্যের আলো এবং পানি
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস)-এর স্বাস্থ্য নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, রাত জাগার পর সকালে ঘুম থেকে উঠেই অন্তত এক গ্লাস ঠান্ডা পানি পান করা উচিত। কারণ ঘুমের অভাব শরীরকে দ্রুত ‘ডিহাইড্রেইটেড’ বা পানিশূন্য করে ফেলে, যা ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।
পাশাপাশি, বিছানা ছেড়ে দ্রুত ঘরের জানালা খুলে দিতে হবে বা কিছুক্ষণের জন্য বারান্দায় গিয়ে গায়ে রোদের আলো লাগানো যেতে পারে।
সকালের উজ্জ্বল আলো মস্তিষ্কে 'মেলাটোনিন' নামক ঘুমের হরমোন তৈরি বন্ধ করে এবং 'কর্টিসল' হরমোন বাড়ায়, যা মুহূর্তের মধ্যে মস্তিষ্ককে বার্তা দেয় যে, ‘এখন জেগে ওঠার সময়’।
ক্যাফিনের ব্যবহারে চৌকস হওয়া
ক্লান্তি কাটাতে কাপের পর কাপ চা বা কফি পান, স্বাভাবিক ঘটনা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিক-এর চিকিৎসকদের মতে, ‘ঘুম কম হলে একবারে বেশি কফি গ্রহণ করা একদমই ভুল সিদ্ধান্ত। এতে উল্টো বুক ধড়ফড়ানি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হতে পারে।’
এর বদলে সকালের দিকে এক কাপ কড়া কফি বা রং চা পান করা উপকারী। এরপর সারাদিন অল্প অল্প করে পানি বা লেবুর শরবত পান করা ভালো।
দুপুরের পর আর ক্যাফিন ধরনের পানীয় একদমই ছোঁয়া যাবে না। নতুবা সেটি পরের রাতের স্বাভাবিক ঘুমেও বিঘ্ন ঘটাবে।

ভারী খাবার ও চিনি বর্জন
মেডিকেল নিউজ টুডে’তে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাত জাগার পরদিন শরীর দ্রুত শক্তি পাওয়ার জন্য মিষ্টি বা চর্বি ধর্মী ভারী খাবার (যেমন- বিরিয়ানি, পরোটা বা মিষ্টি) বেশি খোঁজে। যাকে বলা হয় 'ক্রেইভিং' বা খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়া।
তবে এই খাবারগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা চট করে বাড়িয়ে আবার দ্রুত কমিয়ে দেয়, যাকে বলে ‘সুগার ক্রাশ’। এর ফলে শরীর আরও বেশি ক্লান্ত ও ঘুমঘুম লাগে।
তাই রাত জাগার পরের দিনটিতে দুপুরের খাবারে হালকা ভাত, শাকসবজি, ডাল বা ডিমের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা উপকারী, যা দীর্ঘ সময় শরীরে শক্তি জোগাবে।
২০ মিনিটের 'পাওয়ার ন্যাপ'
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল-এর সাময়িকী 'হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং'য়ে প্রকাশিত ‘ক্যান এ কুইক স্নুজ হেল্প উইথ এনার্জি অ্যান্ড ফোকাস? দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড পাওয়ার ন্যাপস’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঘুমের ঘাটতি মেটাতে দুপুরের দিকে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের একটি ছোট্ট ঘুম বা 'পাওয়ার ন্যাপ' জাদুর মতো কাজ করে।’
অফিসে থাকলে দুপুরের খাবারের বিরতির পর ডেস্কে মাথা রেখে বা কোনো নিরিবিলি জায়গায় চোখ বন্ধ করে ২০ মিনিট বিশ্রাম নিতে হবে। তবে সাবধান, এই ঘুম যেন কোনোভাবেই ৩০ মিনিটের বেশি না হয়।
আধ ঘণ্টার বেশি ঘুমালে শরীর গভীর ঘুমে চলে যায়, ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর চনমনে হওয়ার বদলে আরও বেশি অবসাদগ্রস্ত লাগে।
ঠান্ডা পানির ঝাপটা ও হালকা হাঁটাচলা
যখনই ডেস্কে বসে কাজ করতে গিয়ে চোখ লেগে আসবে, তখনই উঠে গিয়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিতে হবে।
কানাডিয়ান অনলাইন হেলথ পোর্টাল ‘ওয়েলইন৫’-এর চিকিৎসকদের মতে, ঠান্ডা পানির স্পর্শ মুখের ত্বক ও চোখের চারপাশের 'ট্রিজেমিনাল নার্ভ' বা স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে। এটি তাৎক্ষণিকভাবে 'ভেগাস নার্ভ' অর্থাৎ, মস্তিষ্ক থেকে শুরু হয়ে শরীরের বিভিন্ন প্রধান অঙ্গের কার্যকলাপে সরাসরি সংযোগ রক্ষা করে যে স্নায়ু, সেটা সচল করার মাধ্যমে মস্তিষ্কে ‘নোরপাইনফ্রাইন’ ও ‘ডোপামিন’-এর মতো হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়।
এর ফলে ঝিমুনি কাটিয়ে মনকে সজাগ করে তোলে।
এছাড়া একটানা চেয়ারে বসে না রেখে প্রতি এক ঘণ্টা পর পর অন্তত ৫ মিনিটের জন্য একটু উঠে দাঁড়ানো, একটু হেঁটে এসে পানি পান করাও ঝিমুনি কাটাতে সাহায্য করে।

ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিন-এ প্রকাশিত মার্কিন গবেষক, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি ইরভিং মেডিকেল সেন্টার-এর 'বিহেভিওরাল মেডিসিন' বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কিথ ডিয়াজের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, কাজের ফাঁকে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ৫ মিনিটের এই 'মুভমেন্ট ব্রেক' বা হাঁটাচলা কর্মক্ষমতা না কমিয়েই শরীরের অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
এতে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং অলসতা নিমেষেই কেটে যায়।
পর দিন আর অবহেলা নয়
খেলা দেখার আনন্দ যেমন বাদ দেওয়া যাবে না, তেমনই শরীরের ওপর এর ধকলও সামলাতে হবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে।
তাই মনে রাখতে হবে, এই পন্থাগুলো কেবল সাময়িক সংকটের জন্য। এক রাত জাগার পরদিনের রাতে কোনোভাবেই আর দেরি করা চলবে না; বরং সেরাতে একটু দ্রুতই বিছানায় গিয়ে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টার একটি পরিপূর্ণ ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন