Published : 21 Jul 2026, 05:26 PM
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মানবতাবিরোধী অপরাধের যে মামলায় কারাগারে আছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে আলোচিত মোজাফফর হোসেনকে সেই মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মঙ্গলবার এ আদেশ দেয়।
মোজাফফর হোসেন বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন জানিয়ে প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম এদিন সাংবাদিকদের বলেন, "তাকে আর্মির তত্ত্বাবধান থেকে প্রোডাকশন ওয়ারেন্টে আমাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য আজকে আমি একটা অ্যাপ্লিকেশন দিয়েছি। আগামী ২৩ তারিখ ১০টার মধ্যে তাকে হাজির করার জন্য আর্মির অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল বরাবরে একটি প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে।”
সাবেক সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে চলতি বছরের ২৩ মার্চ গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রথমে তাকে অর্থ আত্মসাৎ ও মানব পাচারের মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হলেও পরে মে মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ফেনীতে হত্যার ঘটনায় এ মামলা ট্রাইব্যুনালে আসে। আর সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।
এদিকে গত ১৫ জুলাই রাতে বনানী ডিওএইচএসের এক বাড়ি থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়; পরে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিলেন তখনকার মেজর মোজাফফর হোসেন। সে সময় তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় পুলিশ যে মামলা করেছিল, তাতে ছয় নম্বর আসামি ছিলেন মেজর মোজাফফর। এজাহারে বলা হয়েছিল, হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রপতির কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালে সিআইডি মামলার রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থতা স্বীকার করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
এত বছর পর কীভাবে মোজাফফরের খোঁজ মিলল এবং তার সঙ্গে ফেনীর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সম্পর্ক কী জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জানতে পারে, তার একজন পিএ ছিল।
“সেই পিএ এর কল রেকর্ডের সূত্র ধরে জানা গেল যে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং তার পিএ-এর মধ্যকার কথোপকথনের মধ্যে 'জন্ডু' নামীয় এক ব্যক্তি আছেন, যা একটি ফেইক (ছদ্ম) নাম।"
সন্দেহ থেকে তদন্তের পর ওই ব্যক্তির আসল পরিচয় বেরিয়ে আসে জানিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, "আমাদের তদন্ত সংস্থা দেখল যে এই জন্ডু আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন মেজর মোজাফফর হোসেন; যিনি আমাদের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অন্যতম হত্যাকারী।"
গত ১৬ বছর ধরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও মোজাফফরের মধ্যে যোগাযোগ ছিল দাবি করে আমিনুল ইসলাম বলেন, "এই মোজাফফর হোসেন আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে একাধিকবার গমনাগমন করেছেন, আবার বাংলাদেশে এসেছেন এবং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সাথে তার একটা সুসম্পর্ক ছিল।"
তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ‘সুসম্পর্ক’ ছিল এবং সে সময় একাধিক নির্বাচনে “নানা সমীকরণে তার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার” তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অনেক তথ্য ইতোমধ্যে আমাদের তদন্ত সংস্থা পেয়েছে। সারা বাংলাদেশে যখন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছিল, তখনও এই আসামি (মোজাফফর) এবং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মধ্যে একটা সংশ্লিষ্টতা আমাদের তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে পেয়েছে।"
মোজাফফরকে ট্রাইব্যুনালে আনার পর গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হবে এবং পরে অন্যান্য আইনগত কার্যক্রম নেওয়া হবে বলে জানান আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, "তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হবে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও আবারো জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে। এমনও হতে পারে যে এই দুইজনকে একত্রে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদেরও প্রয়োজন থাকতে পারে।"
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সোমবার বলেছেন, জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার মোজাফফর হোসেনের বিচার সেনা আইনে হবে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, সেনা আইনে বিচার ও ট্রাইব্যুনালের বিচারের মধ্যে কোনো আইনি দ্বন্দ্ব নেই।
“দুইটা অপরাধ আলাদা আলাদা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সাথে তার যে সম্পৃক্ততা, সেটি সেনা আইনে বিচার হবে এবং সেখানে তার আলাদা রায় হবে।"
মোজাফফর হোসেনের বিষয়ে তদন্ত করার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন করলে আমিনুল ইসলাম বলেন, "আমাদের বিষয়টা হচ্ছে যে, এই ১৬ বছরে তৎকালীন সরকারের সাথে তার সম্পৃক্ততা কী, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সাথে তার কী সম্পৃক্ততা ছিল এবং তিনি একজন পলাতক ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়া-আসা, বাংলাদেশে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মত একটা বিতর্কিত ব্যক্তির সাথে তার সংশ্লিষ্টতা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সময় তার যে বিভিন্ন রকমের কর্মকাণ্ড—এই সবকিছু মিলিয়ে আমাদের একটি ইনভেস্টিগেশনের প্রয়োজন।"