Published : 14 Jul 2025, 05:04 PM
বর্ষা প্রকৃতির কাছে এক স্বস্তির বার্তা বয়ে আনলেও শরীরের জন্য অনেক সময়ই হয়ে দাঁড়ায় বিপদের পূর্বাভাস।
জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত বাড়ে, পরিবেশ হয়ে ওঠে স্যাঁতস্যাঁতে ও আর্দ্র। এ সময়ে সাধারণত রাস্তা-ঘাটে পানি জমে যায়, নর্দমা উপচে পড়ে, খাবার ও পানির মধ্যে দূষণ ছড়িয়ে পড়ে।
আর সেই সঙ্গে বাড়ে একের পর এক সংক্রামক রোগের ঝুঁকি।
এই সময়ে যেসব রোগ বেশি দেখা যায় তা শুধু কষ্টকর নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও হতে পারে।
সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান কামরুল হাসান বলেন, “বর্ষাকালে বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ার ফলে ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে খাবার, পানিবাহিত এবং মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায় বেশি।”
“এই সময়ে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। এছাড়া শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া হচ্ছে অনেক। মাইগ্রেইন ও সাইনাসের সমস্যাও বর্ষার সময়ে বেড়ে যায়” মন্তব্য করেন এই চিকিৎসক।
ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং করোনাভাইরাস
এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ানো ডেঙ্গু, ভাইরাসজনিত রোগটি অনেক সময় হেমোরেজিক ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিল অবস্থায়ও পৌঁছায়।
ডেঙ্গুর প্রধান উপসর্গ হল হঠাৎ জ্বর, শরীরব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, ত্বকে র্যাশ এবং কখনও কখনও নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া থেকে রক্ষা পেতে মশার বংশবৃদ্ধি ঠেকানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জমে থাকা পানি, বিশেষ করে ফুলের টব, টায়ার, এসির নিচে রাখা ট্রে, কিংবা খোলা পাত্রে যাতে পানি জমে না থাকে সে দিকে নজর দিতে হবে।
রাতে দিনে মশারি ব্যবহার, পুরো হাত-পা ঢাকা জামাকাপড় পরা ও ঘরের জানালায় জাল লাগানো ভালো অভ্যাস হতে পারে।
এছাড়া করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে মাস্ক পড়া, হাত পরিষ্কার আর অনেক মানুষ জমায়েত থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে।
“এছাড়া বাইরের খোলা অপরিষ্কার পানি ও খাবার খাওয়া থেকেও বিরত থাকা উচিত। যেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে রোগ আপনার শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে”-পরামর্শ দেন ডা. কামরুল।
ডায়ারিয়া ও আমাশা
এই সময়ে ডায়রিয়া ও আমাশয়ের প্রাদুর্ভাবও লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে রাস্তার পাশে খোলা খাবার খাওয়া বা দূষিত পানি পান করার ফলে হঠাৎ করে পেট খারাপ, পাতলা পায়খানা ও শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কামরুল হাসান বলেন, “বর্ষাকালে পানি দূষণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই এই সময় শুধু ফুটানো বা বিশুদ্ধকরণ করা পানি পান করা উচিত। বাইরে খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে বাইরের জুস, শরবত না খাওয়াই ভালো।”
প্রতিকারে মুখে খাওয়া স্যালাইন পান, তরল খাবার গ্রহণ, বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন প্রয়োজন।
টাইফয়েড
আরও একটি রোগ এই সময়ে দেখা দেয়, সেটি হল টাইফয়েড। সালমোনেলা ব্যাক্টেরিয়ার কারণে হওয়া এই রোগ দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়।
টাইফয়েড হলে রোগী দুর্বলতা, মাথাব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর ও কখনও পেটব্যথায় ভোগে।
এর প্রতিকার হল পরিচ্ছন্ন খাদ্যাভ্যাস, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা।
জন্ডিস
জন্ডিস বা হেপাটাইটিস এ এবং ই বর্ষাকালে অনেক বেশি ছড়ায়। এই রোগগুলোর ক্ষেত্রেও দূষিত পানি ও অপরিষ্কার খাবারই প্রধান কারণ।
জন্ডিস হলে চোখ ও প্রস্রাব হলুদ হয়ে যায়, পেটের ডান পাশে ব্যথা হয়, খাওয়ার রুচি কমে যায় এবং শরীর দুর্বল লাগে।
প্রতিকারে বিশ্রাম, তরল ও কম চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং বিশুদ্ধ পানি পান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মৌসুমি ফল শরীরের জন্য বেশ উপকারী।
চর্মরোগ
এ ছাড়া ‘ফাঙ্গাল ইনফেকশন’- ঘামাচি, র্যাশসহ নানান ধরনের চর্মরোগ বর্ষায় বেড়ে যায় আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে।
চুলকানি, লালচে বা সাদা দাগ এবং দুর্গন্ধ হওয়া এর উপসর্গ।
বিশেষ করে যারা বর্ষায় ভিজে জামাকাপড় দীর্ঘক্ষণ পরে থাকেন, তাদের এই সমস্যাগুলো বেশি দেখা যায়।
“এই সময় শরীর শুকনো ও পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনে ‘অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম’ বা পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে”- বলেন ডা. কামরুল হাসান।
নিউমোনিয়া ও মৌসুমী জ্বর (সিজনাল ফ্লু)
ঠাণ্ডা-জ্বর, মৌসুমী জ্বর বা সিজনাল ফ্লু এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাও এ সময়ে দেখা যায়।
বৃষ্টিতে ভেজা, ভেজা জামা পরে থাকা, ঠাণ্ডা পানি পান করা বা রাতভর সরাসরি ফ্যানের নিচে শোয়া বা এসি ব্যবহারের কারণে অনেক সময় গলাব্যথা, কাশি, হাঁচি ও শরীরব্যথা দেখা দেয়।
এগুলোর প্রতিকারে হালকা গরম পানি পান, গার্গল করা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু ও বৃদ্ধদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকে। তাই বর্ষাকালে তাদের প্রতি বাড়তি নজর রাখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বৃষ্টির পানিতে খেলাধুলা, রাস্তার ধারে খাবার খাওয়া বা গায়ে ভেজা জামা নিয়ে ঘোরাফেরা করলে সমস্যা দ্রুত বাড়ে।
"বয়স্ক যাদের ডায়াবেটিস আছে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের ধুলা ময়লা এড়াতে হবে। ভারী কাপড় পরলে ঘেমে ঠাণ্ডা লাগবে আবার পাতলা কাপড় পরলেও নিউমোনিয়ার সমস্যা বাড়বে। অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, যাদের টিবি ও শ্বাসকষ্ট, ঠাণ্ডা-জনিত সমস্যা আছে তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে” বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
মাইগ্রেইন ও সাইনাস
বর্ষাকালে এই দুই সমস্যা খুব বেশি বেড়ে যায়। হঠাৎ বৃষ্টি আবার রোদ এই আবহাওয়া মস্তিষ্কে প্রদাহ তৈরি করে।
বৃষ্টির পানি মাথায় পড়লে বাড়ে মাথাব্যথা। তাই নিয়ম মেনে ঘুম, ঘরে তৈরি পরিষ্কার খাবার সময় মতো খাওয়া, অসময়ে গোসল না করার মতো বিষয়গুলো মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।
আরও পড়ুন