Published : 19 Mar 2026, 01:13 AM
এবারের ঈদযাত্রায় এতদিন ভোগান্তি তেমন ছিল না বললেই চলে। তবে গাজীপুর অঞ্চলের অর্ধেকের বেশি কারখানা একযোগে ছুটি দিলে বদলে যায় সড়কের পরিস্থিতি।
বুধবার কারখানাগুলো ছুটির পর কর্মীরা বাড়ি যাওয়ার জন্য সড়কে নেমে এলে আগের ব্যবস্থাপনা আর কুলোয়নি। এতে মহাসড়কে প্রায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে যানজট তৈরি হয়।
এর মধ্যে শেষ বিকেলের বৃষ্টি বাসের জন্য অপেক্ষমান ও ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। যানজটও আরও প্রবল হয়।
এদিন চাপ ছিল ট্রেনেও। বরাবরের মত ভেতরেতো বটেই, ছাদেও বোঝাই যাত্রী নিয়ে ট্রেনগুলো একের পর এক রাজধানী ছেড়ে গেছে। সন্ধ্যার পর বৃষ্টিতে নাকাল হতে হয়েছে যাত্রীদের, বিশেষ করে ছাদে গাদাগাদি করে ছিলেন যারা।
ঈদযাত্রা শুরুর পর সপ্তাহজুড়েই ট্রেন মোটামুটি সময়মতো চললেও এদিন দুপুরে সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার পর উত্তরের কয়েকটি ট্রেনের সময়মতো চলা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নৌপথেও ছিল ঘরমুখো মানুষের স্রোত। এর মধ্যে সদরঘাটে দুই লঞ্চের মাঝে পড়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার এক যাত্রী নিহত, একজন গুরুতর আহত ও অন্তত দুজন নিখোঁজ হওয়ার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।

চন্দ্রায় উত্তরের যাত্রীদের ভোগান্তি
ঈদযাত্রায় উত্তরমুখী মানুষের দুর্ভোগ কমাতে এবারও গাজীপুরে কারখানাগুলো ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১৬ মার্চ ৬২টি, ১৭ মার্চ ৪৪৪টি, ১৮ মার্চ এক হাজার ৪১৪টি কারখানা ছুটি দেওয়া হয়েছে। ১৯ মার্চ ৮৩৩টি কারখানা ছুটি হবে।
সবচেয়ে বেশি কারখানা ছুটি হয়েছে বুধবার। মোটামুটি সকাল থেকেই ঢাকার সাভার, বাইপাইল, ইপিজেড, গাজীপুরের চন্দ্রা, কোনাবাড়ি এলাকার সড়কের পাশে ছিল বাসের জন্য অপেক্ষমান মানুষের উপচেপড়া ভিড়।
এত লোককে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বাস ছিল না। তবে যাত্রী তোলার জন্য বাসগুলো রাস্তার ওপর দাঁড়ানোর কারণে দুপুরের আগে থেকেই চন্দ্রা মোড় থেকে শুরু হয় প্রচণ্ড যানজট। ইফতারের আগে এই যানজটের লেজ ২০ কিলোমিটার ছড়ায়। এর মধ্যে বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়ায় ঘরমুখী মানুষকে আরও নাকাল হতে হয়।
শোভন আহমেদ নামে গাইবান্ধাগামী একজন যাত্রী জানাচ্ছেন ১২টা ৪০ মিনিটে তিনি কল্যাণপুর থেকে বাসে উঠেছেন। চন্দ্রার যানজট ঠেলে সাড়ে ৭ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জের হাটিকুমড়ুল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছেন।
কিবরিয়া তালুকদার নামের আরেকজন বলছেন, দুপুর ২টায় মহাখালী থেকে রওনা দিয়েছেন। রাত ১০টায় তিনি চন্দ্রার যানজটে আটকে থাকার কথা জানিয়েছেন।

কোনাবাড়ী নাওজোর হাইওয়ে থানার ওসি সওগাতুল আলম বলছেন, “যাত্রীর তুলনায় গাড়ি কম থাকায় চাপ অনেক বেড়েছে। এর ওপর বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় যানবাহন ধীরগতিতে চলছে।”
তারা (পুলিশ) সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, বলেন এই কর্মকর্তা।
সাভারের ঢাকা-আরিচা ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে দেখা গেছে, উত্তর ও দক্ষিণমুখী শত শত যাত্রী মালবাহী ট্রাকে চড়ে গন্তব্যে রওনা হয়েছেন।
বড় বড় ট্রাকে ত্রিপল বিছিয়ে তার ওপর নারী, পুরুষ ও শিশুদের তোলা হচ্ছে। আবার মালবাহী ট্রাকে অনেককে মই দিয়ে উঠতে দেখা গেছে।
ট্রাকের যাত্রী হয়ে বসা পোশাক শ্রমিক রোকসানা আক্তার বলছেন, “বাসে টিকিট পাই নাই, আর পাইলেও দাম ডাবল। পরিবার নিয়ে বাড়ি তো যাইতে হবে, তাই বাধ্য হয়ে ট্রাকে উঠছি।”

দুর্ঘটনায় রেল, সময়সূচি নিয়ে শঙ্কা
নীলফামারীর চিলাহাটিগামী ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ এর নয়টি বগি বগুড়ার আদমদীঘিতে লাইনচ্যুত হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে সরাসরি উত্তরের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় বুধবার দুপুর ২টা থেকে।
ঈদযাত্রার চূড়ান্ত মুহূর্তে বুধবার দুপুরে এ দুর্ঘটনার পর উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা তাদের ভ্রমণ নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন। কারণ বগুড়ার সান্তাহার জংশনের যে জায়গায় ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে সেই পথ ধরেই উত্তরের ট্রেনগুলোকে চলাচল করতে হয়।
পরে রেলওয়ে মন্ত্রণালয় যাত্রীদের ঈদযাত্রার কথা ভেবে বিকল্প পদ্ধতিতে ঢাকা-উত্তরের পথে ট্রেন চালানোর ঘোষণা দেয়।
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা রেজাউল করিম সিদ্দিকী রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, “ঢাকা থেকে আজ সন্ধ্যায় ও রাত্রে ছাড়বে এরকম সব ট্রেন বের হয়ে এসেছে। শুধু পঞ্চগড় এক্সপ্রেস সেকশন ক্লিয়ার না হলে আসতে পারবে না।
“চিলাহাটি এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেস, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে সঠিক সময়ে ছাড়া সম্ভব হবে। এর মধ্যে উদ্ধার কার্যক্রম সমাপ্ত হলে এগুলোর কোনোটিই বাধাপ্রাপ্ত হবে না।
“যদি উদ্ধার কাজ শেষ নাও হয়, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস সান্তাহার থেকে বিকল্প পথে কুড়িগ্রাম পাঠানো যেতে পারে। উদ্ধারকাজ শেষ না হলে সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া দ্রুতযানও পথের মধ্যে আটকা পড়তে পারে।
“বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা থেকে নীলসাগর এক্সপ্রেস ও একতা এক্সপ্রেস ছাড়তে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে।”
পরে এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে রেজাউল বলেন, “রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা থেকে নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটগামী যাত্রীরা ট্রেন পরিবর্তনের মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছাবেন।
“এই প্রক্রিয়ায় পঞ্চগড় থেকে আসা এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের যাত্রীরা দুর্ঘটনাস্থলের দুই প্রান্তে নেমে একে অপরের ট্রেনে উঠে যাত্রা সম্পন্ন করবেন।”

পাটুরিয়ায় নৌযান বন্ধের এক ঘণ্টা পর চালু
গাজীপুর বা ঢাকার উত্তর অংশে বসবসাকারী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক মানুষ পাটুরিয়া ঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন।
বুধবারও দিনভর এই ঘাটে ফেরি ও লঞ্চে মানুষ ও যানবাহনের উপচেপড়া ভিড় ছিল। তবে শেষ বিকেলের ঝড়ো হাওয়ায় ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ গেলে ভোগান্তি বাড়ে ঘুরমুখো মানুষের।
ঝড়ো হাওয়ার কারণে সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে ওই পথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়। রাত পৌনে ৯টার দিকে নৌপথে ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয় বলে বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম মো. সালাম হোসেন জানান।
ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাটুরিয়া ঘাটে বাসের সারি দীর্ঘ হয়েছে। অনেকে এই অবস্থাকে পদ্মা সেতু হওয়ার আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ঘণ্টা খানেক পর আবহাওয়া শান্ত হয়ে এলে আবার নৌযান চলাচল শুরু হয়।

সদরঘাটে দুর্ঘটনায় মৃত্যু, নিখোঁজ
ঈদযাত্রার ভিড়ের মধ্যে এদিন বিকাল ৫টার দিকে সদরঘাটে দুটো লঞ্চের চাপায় পড়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার এক যাত্রীর প্রাণ গেছে, গুরুতর আহত হয়েছেন আরো একজন।
এ ঘটনায় আরো ‘২-৩ জন’ নিখোঁজ রয়েছেন বলে কোতোয়ালি থানার ওসি শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন।
সেখানে আসলে কী ঘটেছিল, তার একটি বিবরণ পাওয়া যায় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সম্রাট হাওলাদারের কথায়।
তিনি বলেন, বিকাল ৫টার দিকে একটি লঞ্চ সদরঘাট ছেড়ে যাওয়ার জন্য পেছাতে (ব্যাকগিয়ার) শুরু করলে দুই লঞ্চের চাপায় পড়ে যায় ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি।
“দুই লঞ্চের চাপায় একজন যাত্রীর পা টুকরো হয়ে কেটে যায়। আরেকজন যাত্রী পিষ্ট হয়ে পানিতে পড়ে যায়।”
সম্রাট বলেন, “এই ঘটনা সবাই দেখেছে। ট্রলার যখন লঞ্চের নিচে পড়ে, তখন সাত থেকে আটজন যাত্রী ছিল। যখন লঞ্চের নিচ থেকে ট্রলার বের হয়, তখন কোনো যাত্রী ছিল না। তারা কোথায় গেল জানা যায়নি।”
ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে লঞ্চে ওঠার চেষ্টা করছিলেন ওই যাত্রীরা।
ঈদযাত্রা: 'বাসে টিকেটের দাম দ্বিগুণ, বাধ্য হয়ে ট্রাকে উঠছি'
নীলসাগর এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা: ৭ ঘণ্টা পর উদ্ধার কাজ শুরু, 'সারারাত লাগবে'
নীলসাগর এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা: সান্তাহারে ট্রেন বদলে গন্তব্যে পৌঁছান