Published : 24 Dec 2025, 06:02 PM
সৃজনশীলতার জগতে প্রবেশ করেছেন অনেকেই। কবিতা লিখছেন, গান রচনা করছেন বা গল্প তৈরি করছেন। তবে এই সৃষ্টিগুলোকে চুরি বা অনুমতিহীন ব্যবহার থেকে রক্ষা করার উপায় কী?
অনেকের কাছে কপিরাইট একটি অজানা ধারণা। তবে এটি আপনার মেধাসম্পদের আইনি ঢাল।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. যোনাইদ উল্লাহ শোয়েবের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কপিরাইট নিবন্ধন না করলেও সৃষ্টির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় অধিকার জন্মায়। তবে নিবন্ধন করলে আদালতে প্রমাণ করা সহজ হয়।
কপিরাইট আসলে কী?
আইনজীবী শোয়েব ব্যাখ্যা করেন, এটি সৃষ্টিশীল কাজের ওপর নির্মাতার আইনগত অধিকার। যেমন- কবিতা, গান, গল্প, বই, নাটক, চিত্রকলা বা সফটওয়্যার। এর মাধ্যমে যে কাজটি তৈরি করেছে তিনি সেটার ব্যবহার, প্রকাশ, বিক্রি বা অন্যকে অনুমতি দেওয়ার একচেটিয়া অধিকার পান।
বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০২৩ অনুসারে- এটি মৌলিক সাহিত্য, সংগীত, নাটক, শিল্পকর্ম, সিনেমা বা সফটওয়্যারের সুরক্ষা প্রদান করে।
অনুমতি ছাড়া নকল, বিক্রি বা প্রকাশ করলে লঙ্ঘন হয়। মেয়াদ সাধারণত থাকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুর পর ৬০ বছর পর্যন্ত।
যেভাবে করতে হয়
নিজের লেখা, গান বা কবিতা কপিরাইট করতে চান? প্রক্রিয়াটি সহজ, কিন্তু অনেকগুলো ধাপ রয়েছে।
প্রথমে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের ওয়েবসাইট bcoecopyright.gov.bd যান। 'অনলাইন আবেদন' অপশনে ক্লিক করে রেজিস্ট্রেশন করুন।
ই-মেইল বা মোবাইল নম্বর এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। ফরম-১ পূরণ করুন। প্রথম অংশে হার্ড কপির তথ্য দিন এবং কোনো পক্ষ জড়িত কি না উল্লেখ করুন।
দ্বিতীয় অংশে স্বার্থের ধরন বর্ণনা করুন। ব্যক্তি কাজ হিসেবে পাসপোর্ট আকারের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের সফট কপি আপলোড করুন।
প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেমোরেন্ডাম, ট্রেড লাইসেন্স বা টিআইএন সার্টিফিকেট যোগ করুন।
স্বত্ব হস্তান্তর হলে ৩শ’ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নোটারি সত্যায়িত দলিল এবং অনাপত্তিপত্র দিন।
কর্মের সফট কপি আপলোড করুন— কবিতা বা গানের ক্ষেত্রে ডকুমেন্ট বা অডিও ফাইল।
শিল্পকর্মের জন্য লোগো, সাহিত্যের জন্য প্রচ্ছদসহ বই, ওয়েবসাইটের জন্য ল্যান্ডিং পেইজের স্ক্রিনশট। নিউজ পোর্টাল হলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মতিপত্র দরকার।
ফি হিসেবে ১ হাজার টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকে অর্থনৈতিক কোড ১-৩৪৩৭-০০০০-১৮৪১-এ জমা দিন। চালানের কপি আপলোড করুন।
আবেদন বাংলা বা ইংরেজিতে পূরণ করুন।
চুক্তিপত্র রেজিস্ট্রেশনের জন্য দুই কপি দিন, একটি নোটারি সত্যায়িত।
আবেদন দাখিলের পর ট্র্যাকিং নম্বর পাবেন। ১৫ দিনের মধ্যে হার্ড কপি অর্থাৎ আবেদনপত্রের দুই কপি, চালান, কর্মের কপি এবং মৌলিকতার অঙ্গীকারনামা— কুরিয়ার বা সরাসরি অফিসে জমা দিন।
অঙ্গীকারনামা ও অন্যান্য ফরম্যাট ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করুন। যাচাইয়ের পর নিবন্ধন সনদ পাবেন।
কপিরাইট লঙ্ঘন হলে কী হয়?
আইনের ৮৪ থেকে ১০৭ ধারায় অপরাধের সংজ্ঞা আছে। সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। তবে সীমাবদ্ধতা আছে।
আইনের প্রয়োগ দুর্বল, অনেকের ধারণা অস্পষ্ট। গবেষণা, শিক্ষা, সমালোচনা বা সংবাদের জন্য সীমিত ব্যবহার 'ফেয়ার ইউজ' হিসেবে গণ্য হয়। মেয়াদ শেষ হলে অবাধে ব্যবহারযোগ্য।
কপিরাইট অন্যান্য মেধাস্বত্ব থেকে আলাদা। পেটেন্ট হল নতুন আবিষ্কারের, ট্রেডমার্ক ব্র্যান্ডের লোগো বা স্লোগানের।
বাংলাদেশে এগুলোর জন্য পৃথক আইন আছে। আন্তর্জাতিকভাবে, বাংলাদেশ ‘বার্ন কনভেনশন’য়ের সদস্য হওয়াতে এখানকার সৃষ্টি বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সুরক্ষিত।
কপিরাইট অফিস ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন। এটি রেজিস্ট্রেশন, আপিল সহায়তা, পাইরেসি প্রতিরোধ এবং ডব্লিউআইপি এবং এর ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে।
সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, সফটওয়্যার ইত্যাদি নিবন্ধন করে। নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়, তবে মালিকানা জটিলতায় প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
অফিসের ঠিকানা
বাংলাদেশ কপিরাইট ভবন, প্লট নম্বর-এফ ২০/বি, পশ্চিম আগারগাঁও, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭।
অফিস সময়: রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার, সকাল ৯:৩০ থেকে বিকেল ৪:৩০।
যোগাযোগ: ফোন +৮৮০২২২৩৩১৪৮১৫, ফ্যাক্স +৮৮০২২২৩৩১৪৮১৫, হেল্পলাইন +৮৮০১৫১১৪৪০০৪৪, ই-মেইল [email protected]।
সৃজনশীল ব্যক্তিদের জন্য কপিরাইট একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
আইনজীবী শোয়েবের কথায়, “আপনার মেধা রক্ষা করুন, যাতে সৃষ্টি অমর হয়।”
নিবন্ধন করে আপনার অধিকার নিশ্চিত করুন।
আরও পড়ুন
ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘিত হলে যেভাবে অভিযোগ জানাতে হয়