Published : 23 Dec 2025, 03:05 PM
প্রতিদিনের জীবনে পণ্য কেনা, সেবা গ্রহণ বা অনলাইন শপিংয়ের মধ্য দিয়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হন। ওজনে কম দেওয়া, নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ বা অতিরিক্ত মূল্য আদায়— এসব সমস্যায় পড়লে কী করবেন?
বাংলাদেশের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পাওয়া যায়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে অভিযোগ করা যাবে এবং কীভাবে করবেন— এ বিষয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. যোনাইদ উল্লাহ শোয়েবের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বিস্তারিত।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর হল সরকারি একটি সংস্থা, যা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯-এর অধীনে কাজ করে। এই আইনের লক্ষ্য হল ভোক্তাদের প্রতারণা, অসাধু ব্যবসায়িক চর্চা এবং অধিকার লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করা।
যোনাইদ উল্লাহ শোয়েব জানান, যে কোনো পণ্য বা সেবা কেনার ক্ষেত্রে প্রতারিত হলে সরাসরি এই অধিদপ্তরে অভিযোগ করা যায়। তবে অভিযোগকারীকে অবশ্যই সংক্ষুব্ধ ভোক্তা হতে হবে; অন্য কেউ তার হয়ে অভিযোগ করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
যেসব ক্ষেত্রে অভিযোগ করা যায়
ভোক্তা হিসেবে অধিকার লঙ্ঘিত হলে অধিদপ্তরে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। যোনাইদ উল্লাহ শোয়েবের মতে, নিম্নলিখিত কারণগুলোতে অভিযোগ করা যায়-
ওজন, পরিমাপ বা পরিমাণে কম দেওয়া: দোকানে কেনা পণ্যের ওজন বা পরিমাণ কম হলে, যেমন- এক কেজি চালের পরিবর্তে ৯শ’ গ্রাম দেওয়া হলে।
পণ্যের মোড়কে ভুল তথ্য: পণ্যের প্যাকেটে মূল্য, মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ না থাকা বা ভুল তথ্য দেওয়া। যেমন-, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রি করা।
নিম্নমানের বা ত্রুটিপূর্ণ পণ্য সরবরাহ: কেনা পণ্যের মান খারাপ হলে বা ত্রুটি থাকলে, যেমন- অর্ডার করা মোবাইল ফোন কাজ না করলে।
প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন: মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারিত করা, যেমন- একটি প্রোডাক্টকে ‘১০০% ন্যাচারাল’ বলে বিক্রি করা, যদি তা না হয়।
সেবার ক্ষেত্রে অসন্তোষ: সেবা মানসম্মত না হলে, অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে বা মূল্য পরিশোধের পরও সেবা না দেওয়া। উদাহরণ- ডাক্তার বা হাসপাতালের সেবায় অসন্তুষ্টি।
বাধ্যতামূলক কেনাকাটা: একটি পণ্য কেনার সময় অন্য পণ্য কিনতে বাধ্য করা।
অতিরিক্ত মূল্য আদায়: পণ্যের উল্লেখিত মূল্যের চেয়ে বেশি নেওয়া, যেমন- রেস্তোরাঁয় মেনুতে উল্লেখিত দামের বাইরে অতিরিক্ত বিল।
অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা: অনলাইনে কেনা পণ্য নির্ধারিত সময়ে না পাওয়া, অগ্রিম টাকা ফেরত না দেওয়া বা ভুল পণ্য হাতে পাওয়া।
ভোক্তার পছন্দের অধিকার লঙ্ঘন: কোনো কারণে ভোক্তার পছন্দকে উপেক্ষা করা।
এছাড়া, শপিংমলে বা রেস্তোরাঁয় গিয়ে প্রতারিত হলে, যেমন- খাবারের মান খারাপ বা অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হলে, অভিযোগ করা যায়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ভোক্তা অধিকারের যে কোনো লঙ্ঘনই অভিযোগের কারণ হতে পারে।
শোয়েব জানান, এই আইনের ৭৬(১) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, যে কোনো ব্যক্তি যিনি ভোক্তা হতে পারেন, ভোক্তা অধিকার-বিরোধী কাজ সম্পর্কে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।
অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি
অভিযোগ জানাতে হলে তা অবশ্যই লিখিত হতে হবে।
শোয়েব জানান, অভিযোগের সঙ্গে পণ্য বা সেবা কেনার রশিদ সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক। অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটের লিংক, ‘টেক্সট মেসেজ’য়ের স্ক্রিনশট, মূল্য পরিশোধের প্রমাণ বা অন্যান্য ‘ডকুমেন্ট’ বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যুক্ত করলে ভালো হয়।
অভিযোগকারীর পূর্ণ নাম, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, ফ্যাক্স, ই-মেইল (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করতে হবে।
অভিযোগ জানানোর উপায়গুলো
সরাসরি জমা দেওয়া: জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে 'অভিযোগ ফর্ম' ডাউনলোড করুন।
ফর্ম পূরণ করে প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ রাজধানীর কারওয়ান বাজারের টিসিবি ভবনের আট তলায় জমা দিন। একইভাবে, বিভাগীয় কার্যালয় বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও জমা দেওয়া যায়।
ইলেকট্রনিক মাধ্যম: ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েবসাইট বা অন্যান্য ডিজিটাল উপায়ে অভিযোগ পাঠানো যায়।
ই-মেইলে ফর্ম পূরণ করে প্রমাণসহ [email protected] বা [email protected]এ পাঠান।
অধিদপ্তর এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট জেলায় ‘ফরওয়ার্ড’ করে।
অনলাইনে অভিযোগের জন্য http://dncrp.com লিংকে যান।
হটলাইন: ভোক্তা বাতায়ন হটলাইন ১৬১২১-এ কল করে প্রাথমিক পরামর্শ নেওয়া যায়, তবে লিখিত অভিযোগ দিতে হবে।
অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা
কারওয়ান বাজার (টিসিবি ভবন-৮ম তলা), ঢাকা-১২১৫। ফোন: ৮৮-০২-৫৫০১৩২০৮, ০২-৫৫০১৩২১৮; মোবাইল: ০১৭৭৭-৭৫৩৬৬৮; ফ্যাক্স: ৮৮-০২-৫৫০১৩২০৭।
বিভাগীয় কার্যালয়গুলোর ঠিকানা
চট্টগ্রাম: টিসিবি ভবন, বন্দরটিলা; ফোন: +৮৮ ০২৩৩ ৩৩৪১২১২।
রাজশাহী: শ্রীরামপুর; ফোন: +৮৮ ০২৫৮ ৮৮০৭৭৪।
খুলনা: টিসিবি ভবন, শিববাড়ী মোড়; ফোন: +৮৮ ০২৪৭ ৭৭২২৩১১।
বরিশাল: মহিলা ক্লাব ভবন; ফোন: +৮৮ ০২৪৭ ৮৮৬২০৪২।
সিলেট: বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়; ফোন: +৮৮ ০২৯৯ ৬৬৪৩৪৫৬।
রংপুর: নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া; ফোন: +৮৮ ০৫২১-৫৫৬৯১।
প্রত্যেক জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও অভিযোগ জমা দেওয়া যায়।
অভিযোগের সময়সীমা
অভিযোগ করতে হলে সময়ের মধ্যে করা জরুরি। আইনের ৬০ ধারায় বলা হয়েছে, ঘটনা ঘটার বা পণ্য হাতে পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ করতে হবে।
৩০ দিন পর অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই সমস্যা দেখা মাত্রই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
অভিযোগের পর কী হয়
অভিযোগ পাওয়ার পর অধিদপ্তর তদন্ত করে। যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে জরিমানা, পণ্য প্রতিস্থাপন বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
যোনাইদ উল্লাহ শোয়েব মন্তব্য করেন, “এই প্রক্রিয়া সাধারণত দ্রুত হয় এবং ভোক্তাদের জন্য বিনামূল্যে। তবে জটিল কেসে আদালতের সাহায্য নেওয়া যায়।”
ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে অধিদপ্তর নিয়মিত ক্যাম্পেইন চালায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে জানাশোনা কম।
এই আইনজীবী বলেন, “ভোক্তারা যদি তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন, তাহলে প্রতারণা কমবে।”
এই অধিদপ্তরে অভিযোগ জানিয়ে অনেকেই প্রতিকার পেয়েছেন, যেমন- অনলাইন শপিংয়ে প্রতারিত এক ভোক্তা টাকা ফেরত পেয়েছেন।
সার্বিকভাবে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভোক্তাদের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রতারণার শিকার হলে চুপ করে না থেকে অভিযোগ করুন। এতে নিজের অধিকার রক্ষা হবে এবং সমাজে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমবে।
আরও পড়ুন
মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া
মেট্রোরেলে কী নেবেন, কী একদম-ই নেবেন না