Published : 07 Jun 2026, 04:53 PM
সিনেমা দেখানো হবে, তাও আবার যাকে বলে ফ্যামিলি ড্রামা, কিছুটা হাস্যরস আছে, কিছুটা আবেগ। এরকম নির্বিষ ও অবলা সিনেমাতেও ঘোরতর আপত্তি তুলে একদল লোক ওই সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিল গত ৩০ মে। ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন সরকার ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিতে তিনশ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ভাবছে। সৃজনশীল অর্থনীতি বলতে বোঝানো হচ্ছে নাচ, গান, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন, স্থাপত্য, শিল্পকলা, কারুশিল্প, সফটওয়্যার, ভিডিও গেমস ইত্যাদিকে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখলাম পূর্বাচলে একশ একর জায়গার ওপর একটি সৃজনশীল কেন্দ্র বা ক্রিয়েটিভ হাব নির্মাণ করতে চাইছে সরকার। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমি চত্বরেও সৃজনশীল কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা আছে তাদের। এছাড়া সাংস্কৃতিক পর্যটনের উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে, করা হবে জাতীয় উৎসব ক্যালেন্ডার।
মূলত দেশের তরুণদের মাদক, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ থেকে দূরে রাখতেই এমন উদ্যোগ। তবে এর পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাতকে অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত ও দেশের ব্র্যান্ডিং করাও উদ্দেশ্য বটে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেই সৃজনশীল অর্থনীতি সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনার কথা ছিল। সেখানে তারা অঙ্গীকার করেছে জিডিপিতে সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের অবদান হবে কমপক্ষে ১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান হবে ৫ লাখ মানুষের। তবে বাংলাদেশে এই মুহূর্তে জিডিপির কত অংশ সৃজনশীল অর্থনীতিতে বরাদ্দ রয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, তা যে দেড় শতাংশের কম, সেটি হলফ করে বলা যায়। নয়তো ইশতেহারে দেড় শতাংশ করার প্রতিশ্রুতি আসত না। এমনিতে আমরা দেখি মোট দেশজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারত বরাদ্দ দিয়ে রেখেছে ২.৫ শতাংশ অর্থ, আর যুক্তরাষ্ট্র ৪.২ শতাংশ অর্থ। ফিলিপাইনের মতো দেশে এইখাতে বরাদ্দ রেখেছে ৭.৩ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশে এক শতাংশও হবে কি না সন্দেহ।
তো যে দেশে মন ও মনন গঠনের ক্ষেত্রে এত অবহেলা, শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চায় উল্লেখযোগ্য কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নেই, সেখানে চিন্তার অনগ্রসরতা ও কূপমণ্ডূকতা তো তৈরি হবেই। বিষয়টি যে দেরিতে হলেও আমলে নিয়েছে সরকার সেজন্য তাদের ধন্যবাদ। তবে সংকট হলো এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। আমরা যদি ধরেও নিই এসব বাস্তবায়নে কোনো লুটপাট হবে না, তারপরও একটি সংকট থেকে যায়, তা হলো মৌলবাদী গোষ্ঠীর বাধা। যারা এক অদ্ভুত কারণে শিল্প-সংস্কৃতিকে অচ্ছুত মনে করে। চলচ্চিত্রকে তো বড় শত্রু মনে করে! কিন্তু অবাক করার মতো বিষয়, এই একবিংশ শতাব্দীতে, ইন্টারনেট যেখানে বিনামূল্যে পাওয়া যায়, নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের হাতেও যখন স্মার্টফোন খেলা করে, তখন চলচ্চিত্রের বিস্তার কি ঠেকানো সম্ভব কারও পক্ষে? দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশের এক অতিপরিচিত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে একটি সিনেমা হলও নেই। কেন নেই, তার আলামত অবশ্য বহু বছর আগে থেকেই আমাদের সামনে হাজির হচ্ছিল, কিন্তু আমরা তা আমলে নেইনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে অনেকদিন ধরেই ‘বিবাড়িয়া’ বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আছে মহল বিশেষের। এটা অনেকটা রাধাচূড়া ফুলকে ফাতিমাচূড়ায় পরিণত করার মতোই ব্যাপার!

ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে কথা বলার পেছনের কারণটা হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে গত ৩০ মে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা ছবিটি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালায়। তখন ভেন্যু কর্তৃপক্ষ পূর্বানুমতি প্রত্যাহার করে নেয়, ছবিটির প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়। একই দিন কসবা উপজেলার তালতলা গ্রামে স্থানীয় তরুণরা চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় প্রশাসন সেখানেও সিনেমা দেখাতে দেয়নি।
কেন সিনেমার প্রতি এত আতঙ্ক? সিনেমা কি কোনো ভয়ঙ্কর প্রাণী? নাকি সিনেমা মগজের কুঠুরিতে জমে থাকা অন্ধকারকে অপসারিত করে? মানুষকে আলোকিত করার পাশাপাশি নতুন নতুন দিগন্ত ও প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয়? ধরুন মাদ্রাসাসহ বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’, সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’, তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ইত্যাদি ছবি দেখানো হয় নিয়ম করে, পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে, তাহলে কী হবে? তাহলে কোমলমতি ছেলেমেয়েগুলোর ভেতরে যে ইতিহাসবোধ জাগ্রত হবে, অন্ধবিশ্বাস প্রশ্নবিদ্ধ হবে, সর্বোপরি মানবিক সম্পর্কের প্রতি যে সংবেদনশীলতা তৈরি হবে তা আখেরে একটি উন্নত জাতি গঠনে সহায়ক হবে। আর এখন তো উন্নত দেশগুলোতে শ্রেণিকক্ষে চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে শিখনপদ্ধতির অন্যতম উপাদান হিসেবে। বাংলাদেশে কেন এটি করা যাবে না?
কেন আমাদের ছেলেমেয়েরা, যারা অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পরিবার থেকে মাদ্রাসায় আসে, তারা চলচ্চিত্রের মতো আধুনিক শিল্পের কাছ থেকে দূরে থাকবে? তাদেরকে যদি চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়া যায় তাহলে আর কথায় কথায় প্রদর্শনী বন্ধের ডাক আসবে না। তারা বুঝতে পারবে চলচ্চিত্র এক জানালার মতো। যে জানালা দিয়ে নতুন চিন্তার আলো-হাওয়া ঘরে প্রবেশ করে এবং তাতে মন সতেজ ও প্রগতিশীল হয়ে ওঠে। প্রয়োজনে তাদের বিনা টিকিটে চলচ্চিত্র দেখার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বিভিন্ন জেলায় শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এটি হতে পারে। দেখানো যেতে পারে সৌদি আরব ও ইরানের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে কত সুন্দর সুন্দর চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে আজকাল।
একটি সিনেমা যখন সরকারের তরফ থেকে প্রদর্শনের জন্য অনাপত্তিপত্র পায় তখন সেটিকে বন্ধ করে দেওয়ার এখতিয়ার কারও থাকতে পারে না। মতাদর্শিক ভিন্নতা থাকতে পারে, দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হতে পারে, কিন্তু চলচ্চিত্র প্রদর্শনে বাধা দেওয়া যেতে পারে না। একটি মানুষের সাথে আরেকটি মানুষের মতভিন্নতা থাকলে যেমন কেউ কাউকে খুন করে ফেলতে পারে না, ঠিক তেমনি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীও বন্ধ করা যায় না। গায়ের জোরে ছবির প্রদর্শনী বন্ধ করা মানে ওই সিনেমাকে খুন করা। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে এভাবে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা আদতে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। কিন্তু বাস্তবতা হলো এসব বাধা ও বিপত্তি সমাজ থেকে আসছে। রাষ্ট্রের চেয়ে সমাজ বড় সত্যি, কিন্তু সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে তাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়।
রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলচ্চিত্রকে এমন স্তরে নিয়ে যেতে হবে, যাতে সমাজের লোকজন ভাবতে বাধ্য হয় চলচ্চিত্র এক উৎকৃষ্ট বিনোদন মাধ্যমই শুধু নয়, চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পারে শিক্ষার উপকরণ, চিন্তার খোরাক, চিন্তাচর্চার উর্বর জমিন ইতি ও আদি। তাছাড়া চলচ্চিত্রকে যদি ঠিকঠাক ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে চলচ্চিত্রের সাথে অনেক মানুষের সরাসরি রুটি-রুজির সম্পর্ক তৈরি হবে। এতে করে চলচ্চিত্রকে নতুন করে বোঝাপড়ারও সুযোগ তৈরি হবে। তখন মানুষ বুঝবে চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাদের পূর্বে ভুল ধারণা ছিল। আরেকটি বিষয়, যা আসলে আমি বহু বছর ধরেই বলে আসছি, তা হলো সিনেমাকে বড় বড় রাষ্ট্র সফট পাওয়ার হিসেবে গণ্য করে। তারা মনে করে সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে চলচ্চিত্র এক অত্যন্ত কার্যকরী হাতিয়ার। তারা তাই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্মাণ করে, দেশের ভাবমূর্তিকে করে উজ্জ্বল। তো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলচ্চিত্র যখন দেশের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকবে এবং দেশের নাম উচ্চে তুলে ধরবে, তখন সমাজের মানুষের কাছে চলচ্চিত্রের মানমর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং তারা মাধ্যমটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবে।
সমাজের মানুষের সম্মিলিত যে মনোস্তত্ত্ব, সেটিকে পরিবর্তন ও ইতিবাচক দিকে ধাবিত করার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত কার্যকর পন্থা। এই পন্থা কিছুটা দীর্ঘমেয়াদী বটে, কিন্তু একে যদি ঠিকঠাকভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় তাহলে এর সুফল ভোগ করবে গোটা দেশ। আমরা আশাবাদী হতে চাই, যেহেতু সরকার এরই ভেতর নিজেদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ শুরু করবে বলে জানিয়েছে। তবে আমরা পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে এটাও জানি, রাষ্ট্রের শুধু একদিকে উন্নয়ন করলে চলে না। কারণ যেটিকে সৃজনশীল অর্থনীতি বলছি, সেটি তখনই সুফল বয়ে আনবে, যখন দেশের মূল অর্থনীতি স্থিরতা পাবে। মানুষের আয় উপার্জনের গতি হবে এবং দ্রব্যমূল্য মানুষের হাতের নাগালে আসবে। রাষ্ট্রে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরে আসাটাও জরুরি। কাজেই এটি একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যাপার। কিছুটা কঠিনও। তবে অসম্ভব নয়।
বিধান রিবেরু চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখক ও শিক্ষক। ই-মেইল: [email protected]