Published : 07 Jun 2026, 11:47 AM
আমাদের শিক্ষাচর্চা ভ্রান্ত নীতির অনুসারী; শিক্ষাব্যবস্থা দিকভ্রান্ত। অবশ্য চিকিৎসা, নিরাপত্তা ইত্যাদির অবস্থাও তথৈবচ। আমরা প্রতিদিন স্কুলে ছেলেমেয়ে পাঠানোর সময় তাদের টিফিন বক্সে কী ধরনের খাবার দিচ্ছি, তা নিয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মতামত বিভাগেই কিছুদিন আগে এ বিষয়ে একটা ভালো লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ যে খাদ্যে বিষক্রিয়াজনিত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, তারই এক নিরীহ ভিকটিম স্কুলের শিশুরা, যারা বাড়ি থেকে টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে যায়। সংখ্যাটা অবশ্য দেশের সমগ্র শিক্ষার্থীর তুলনায় বেশি হওয়ার কথা নয়; কেননা শহরের স্কুলগুলোতেই শিশুরা এই খাবার নিয়ে যায়। যারা নেয়, তাদের অনেকেই আবার আর্থিক টানাপড়েনের জন্য নামকাওয়াস্তে কিছু নেয় স্কুলের নিয়ম বজায় রাখার স্বার্থে।
অন্যদিকে দেশের অনেক স্কুলে হাজার হাজার শিশু দুপুরে না খেয়েই ক্লাস করে। কেবল তাই নয়, দেশে এমন অনেক অঞ্চল ও এলাকা আছে যেখানে সকালে খাইয়ে সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্যও অনেক পরিবারের নেই। ফলে তাদের না খেয়ে স্কুলে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এই খবরগুলো আমরা কমই জানি, কারণ অভুক্ত ও ক্ষুধার্ত শিশুটি এ কথা প্রকাশ করতে লজ্জা পায়; তাই সত্য গোপন করেই ক্লাস করে বাড়ি ফেরে। অভুক্ত ও ক্ষুধার্তেরই লজ্জা বেশি, পেটুক লুটেরাদের লজ্জাশরমের বালাই থাকলে চলে না। স্কুলের শিক্ষক, সহপাঠী, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন (বড়লোক আত্মীয়-স্বজন হলে তো কথাই নেই) ও প্রতিবেশী সবাই তখন আইনস্টাইনের চাইতেও বড় আবিষ্কার করে ফেলেন যে— শিশুটির মাথায় ঘিলু বলে কিচ্ছু নেই, খালি গোবর ভরা। সবার এই নীরব ও সরব রায় শুনতে শুনতে একসময় শিশুটিও তা বিশ্বাস করতে শুরু করে। অথচ এই মেধাবী আবিষ্কর্তারা সামান্য একটা কথাই জানেন না যে, শিশুটির মাথায় ঘিলু নেই তা না, আসলে তার পেটে খাবার নেই। ঘিলু যা আছে তা যথেষ্ট চলনসই, কিন্তু ঘিলুকে ক্রিয়াশীল করতে পেটে যে খাবার রাখতে হয়, তা নেই।
যা বলছিলাম, স্কুলে টিফিন বক্সে মা-বাবার দেওয়া খাবার ভেজালমুক্ত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি একটি সর্বব্যাপী সামগ্রিক সমস্যাও, যার আশু সমাধান জরুরি। তবে স্কুলের ব্যাপারে আরও জরুরি হচ্ছে প্রত্যেক শিশুকে পেট ভরা অবস্থায় পড়ালেখা করানো। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় কর্তারা কি এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল? মেধা যাচাইয়ে বাংলাদেশের শিক্ষকেরা বিশ্বে চ্যাম্পিয়ন হবেনই। তাদের হাতে পড়লে ইউরোপ-আমেরিকার বহু অধ্যাপক, গবেষক, বিজ্ঞানীও নির্ঘাত ফেল মারতেন। পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ভরে আছে খালি মেধা যাচাই আর পরীক্ষায়।
শিশুকেও শহরের নামী-দামি স্কুলে ভর্তি হতে হলে পরীক্ষা দিয়ে মেধাশক্তি প্রমাণ করে তবেই ভর্তির সুযোগ পেতে হবে। ভর্তি পরীক্ষা কি শিশুর মেধা যাচাই করে? ধূর্ত পণ্ডিতেরা এই সামান্য বিষয়টা বোঝে না যে, ভর্তি পরীক্ষায় শিশু তার পারিবারিক সচ্ছলতা ও আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। যারা প্রাথমিক স্তরেও শিশুকে ভর্তি হওয়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষার ফতোয়া দেন, তারা হয় কোচিং ব্যবসায়ী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কিংবা কোচিংয়ে পাঠাতে সক্ষম ধনী অভিভাবক। কিন্তু সেই ছাঁকনির ফুটো দিয়ে দু-চার জন অসচ্ছল ও আর্থিক অসক্ষম পরিবারের সন্তানও পেরিয়ে যায়, তা সত্য বটে।
একই বেঞ্চে পাশাপাশি বসা দুটো ছেলে বা মেয়ের মধ্যে যার পেটে খাবার আছে, সে যার পেটে খাবার নেই তার চেয়ে মেধার দৌড়ে এগিয়ে থাকবে—সাধারণ এই সত্যটা যে বোঝে না, তাকে বা তাদেরকে শিক্ষিত না ভণ্ড বলব, তা ঠাহর করা দায়। মাঠের রেসে যেমন হবে, তেমনই হবে ক্লাসরুমে পড়ালেখার রেসে। আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তো আজও জ্ঞানচর্চায় পরিণত হতে পারল না, রেসই থেকে গেল। আমরা সব সোনার কি রুপার বা পিতলের মেডেল এই স্কুল-কলেজে পরীক্ষার রেসই জিতে নিই। বিশ্বদরবারে আর কোনো প্রতিযোগিতায় আমাদের কোনো মেডেল জোটে না। যদি কেউ জেতেও, তার পরিণতি ভালো হয় না।
আমাদের বিদ্যালয়ে বিদ্যমান এই সমস্যার সমাধান আশু জরুরি। এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে অন্তত শিশু স্কুলে থাকা অবস্থায় একবেলা খাবার পায়। এ ব্যাপারে যত কথা বলা হয়েছে, তা দিয়ে কয়েকশো বুড়িগঙ্গা হতে পারত; অথচ সমস্যা সমাধানের কোনো উল্লেখযোগ্য চেষ্টা নেই। অনেক উন্নত ও ধনী দেশে স্কুলে শিশুদের জন্য খাবার সরবরাহ করা হয়। আমাদের ক্ষেত্রে এটা সর্বজনীন করা এখনও সম্ভব হয়নি, তার কারণ হিসেবে যদি আমাদের দেশের আর্থিক অনুন্নতির কথা বলা হয়, এর চেয়ে খোঁড়া যুক্তি আর একটাও নেই। তবে অনেকদিন আগে শুনেছিলাম বাংলাদেশ নাকি এখন আর অনুন্নত দেশের কাতারে নেই, উন্নতির ঘোড়ায় চড়ে দৌড়াচ্ছে। এক মুখে দুই কথা আর কত শুনব? আর বাংলাদেশ যদি দরিদ্র কিংবা মধ্যবিত্ত বা অধনী হয়, তাহলেই এবং কেবল এই কারণেই আমাদের স্কুলে প্রত্যেক শিশুর খাবার নিশ্চিত করা উচিত। শহরের ধনী এলাকার ব্যয়বহুল স্কুলগুলোকে শুরুতে বাদ রাখলে তা সহজে সম্ভব। যে দেশে মানুষ দরিদ্র, যে দেশে মা-বাবা সন্তানকে খাইয়ে স্কুলে পাঠাতে পারে না, শিশু অভুক্ত বা অর্ধভুক্ত থাকার কারণে মেধার পরিচয় দিতে পারে না, সে দেশেই কি স্কুলে দুপুরের খাবার সবার আগে প্রয়োজন নয়? আপসহীনভাবে, অন্য অনেক ব্যয়বহুল অপ্রয়োজনীয় কর্মসূচি গুটিয়ে কিংবা বন্ধ করে হলেও। কেউ যদি বলেন, সন্তান তার বাবা-মায়ের, রাষ্ট্র কেন দায়িত্ব নেবে? আহাম্মক! সন্তান রাষ্ট্রের। বাবা-মা মালিক নন, সঠিক লালন-পালনের দায়িত্বে রত। শিশু মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে ব্যর্থ হলে মা-বাবা সাময়িক ক্ষতিগ্রস্ত হন, কেননা তারা পরলোকগত হবেন; কিন্তু থেকে যাবে রাষ্ট্র। শেষ পর্যন্ত শিশুর মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে না ওঠার ক্ষতি রাষ্ট্রকেই পোহাতে হবে; আর শিশু মানুষ হিসেবে গড়ে উঠলে আখেরে বড় লাভও রাষ্ট্রের। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজে সামাজিক আখেরের কথা কে ভাবে? নিজ নিজ আখিরাতের কথা ভাবতেই তো কাহিল!
যার যার মতো টিফিন বক্সে সন্তানের জন্য খাবার দেওয়ার আরেকটা বড় খারাপ দিক আছে, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকেই বিপথগামী ও ব্যর্থ করে দেয়। বিদ্যালয় শিশুদের সহযোগিতা, সহমর্মিতা, আবেগী বুদ্ধিমত্তা অর্জনের জায়গা কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর অর্জনের নয়। স্কুলে কি সব শিশু একই দামের ও পুষ্টির খাবার নিয়ে আসে? টিফিনের বাক্সের ভিতরে ও বাইরে দুদিক থেকেই বিরাট পার্থক্য থেকে যায়। আপনি যখন আপনার সন্তানের জন্য একদিন পেস্ট্রি, একদিন বার্গার বা হটডগ পাঠাচ্ছেন; হয়তো আপনার সন্তানের সহপাঠীটি প্রতিদিনই একটা রুটি আর আলু ভাজি কিংবা কয়েকটা বিস্কুট এনে তার টিফিন সারছে।
পেস্ট্রি, বার্গার, হটডগ এসব তখন যতই অর্গানিক হোক না কেন, রাসায়নিকভাবে যতই নিরাপদ হোক, স্কুলের পরিবেশে তা এক নীরব বিষক্রিয়া সম্পন্ন করে। দুটি শিশু একে অপরের খাবার দেখে আর ভিন্ন রকম বার্তা ও মানসিকতা নিয়ে বড় হয়। এমনও হতে পারে সহপাঠীটি অনেকদিন খাবারই আনতে পারেনি। পাশের শ্রেণিবন্ধুর দিকে একবারও ভ্রুক্ষেপ না করে কিংবা অবজ্ঞার দৃষ্টি বিতরণ করে অথবা কোনো বিদ্রূপাত্মক কথা বলে টিফিনওয়ালা শিশুটি গোগ্রাসে খাবার গিলতে পারে। সে ক্ষেত্রে সে বড় হয়ে কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আরও কী কী গোগ্রাসে গিলবে, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। এর একটা সহজ সমাধান হলো সন্তানের জন্য স্কুলে স্বাভাবিক খাবার পাঠানো, যা ওই স্কুলের অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীও আনতে পারে। এভাবে টিফিন বক্সের বৈষম্য দূর করাটা খুব সহজ নয় কি? সহজ হলেই যে কেউ তা মেনে চলবে তা ভাবছি না; কেননা যেখানে বৈষম্য বিস্তারই সমাজের রীতি, প্রত্যেকের লক্ষ্য, শিক্ষাব্যবস্থার কার্যত উদ্দেশ্য—সেখানে এ কথা বলা আর উলুবনে মুক্তো ছড়ানো একই কথা।
একই কারণে স্কুলের গেটে কারও ব্যক্তিগত গাড়িতে সন্তানকে নিয়ে উপস্থিত হওয়া উচিত নয়, কেননা আপনার সন্তানের সব সহপাঠীর বাবার ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। গাড়িটা স্কুল থেকে খানিকটা দূরে রেখে সন্তানকে পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস করালে মানুষ হওয়ার প্রকৃত শিক্ষা দেওয়া হবে—পরীক্ষার রেজাল্ট যাই হোক না কেন। কয়েক কদম হেঁটে স্কুলে আসা-যাওয়া শিখলে কোনো শিশুরই পা ক্ষয়ে যাবে না, নিশ্চিত। তবে তীব্র কঠিন ভর্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যার সন্তান অত্যুচ্চ মেধাশক্তির প্রমাণ রেখেছে, তার পদশক্তি প্রমাণের দরকারইবা কী! তারা তো জানেনই জীবনে পদই তার পিছে পিছে ঘুরবে। আমার মেধাশক্তির অভাবে সুধী মহলে এই গলাশক্তি ছড়িয়ে এ লেখা শেষ করছি। শুধু এই আকাঙ্ক্ষা—স্কুলে নিরীহ নাস্তার বাক্স সহমর্মিতার প্রতীক হয়ে উঠুক, বৈষম্যের নয়।
আলমগীর খান কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: [email protected]