Published : 07 Jun 2026, 08:16 AM
‘হায়রে ব্রুটাস, তুমিও!’—এই আক্ষেপটি এসেছে ১৫৯৯ সালে প্রকাশিত শেক্সপিয়রের ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটক থেকে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, বিশ্বাসঘাতকতা শত্রুরা করে না, সবচেয়ে কাছের এবং প্রিয় মানুষগুলোর মাধ্যমেই তা ঘটে।
ব্রুটাসের এই দৃশ্য যেন রমরমা সংবাদপ্রবাহের যুগে ভারতের রাজনীতির প্রতিদিনের বাস্তবতা। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়, দল ভাঙে, নেতৃত্ব পরিবর্তন হয় কিংবা নির্বাচনে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে বিরোধী দলকে হারানো হয়। অমিত শাহের চাণক্য কৌশলে ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমন বিষাক্ত বীজের চাষাবাদ চলছে। তাই বর্তমান সময়টি ভারতের ‘শাহনীতি’র যুগ।
২০২২ সালে আমরা দেখেছি শিবসেনার ভাঙন কীভাবে ঘটেছে। অবশ্যই ভারতে রাজনৈতিক দল ভাঙার ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ১৯৬৯ সালে কংগ্রেসেও বিভাজন ঘটেছিল; তবে সে বিভাজন দলের ভেতরের দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল। অন্যদিকে, শিবসেনার ভাঙন ছিল বাইরে থেকে উসকানো এক অশুভ চক্রান্ত, যা পরে আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে বিজেপির একটি মডেলে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
শেক্সপিয়রের নাটকে সিজারের বুকে সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি ধারালো ছুরি করেনি; গভীর আঘাত করেছে আততায়ীদের মধ্যে তার প্রিয় শিষ্য ও বিশ্বস্ত বন্ধু মার্কাস ব্রুটাসের উপস্থিতি। ব্রুটাসের ছুরিকাঘাতে হতবাক জুলিয়াস সিজার এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি হন। তিনি প্রতিরোধ থামিয়ে দেন, আঘাত মেনে নেন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। এই দৃশ্য ইতিহাস ও সাহিত্যে এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে—যা মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আসে সেই মানুষটির কাছ থেকে, যাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে কল্পনাও করা যায় না।

অবিভক্ত শিবসেনার একজন সদস্য হিসেবে আমি দেখেছি, কীভাবে ঘটনাপ্রবাহের স্রোতে দলের মশহুর রাজনীতিবিদরা পক্ষ বদলাতেন। কাউকে চাপ দেওয়া হতো, কাউকে প্রলোভন দেখানো হতো, কারও বিরুদ্ধে মামলা চলছিল, কেউ আবার ক্ষমতার স্বাদ পেতে চাইছিলেন। যাদের ওপর ভরসা ছিল, যাদের মনে হতো তারা আমাদের সঙ্গেই থাকবেন, তারাও মুহূর্তের মধ্যে অন্য শিবিরে চলে গেলেন।
দল ভাঙনের পর শিবসেনা ভবনে দলের শীর্ষ নেতাদের এক বৈঠক হয়েছিল। সেখানে পরবর্তী করণীয় জানানো হয়। ওই বৈঠকে মহাবিকাশ আঘাড়ি সরকারের একজন মন্ত্রী সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন; অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনিও অবস্থান পাল্টে ফেললেন। আমরা শুধু এসব দৃশ্য দেখতাম, আর তাদের দুঃসাহস দেখে অবাক হতাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলত্যাগের ঘটনা এক ধরনের তিক্ত হাস্যরসে পরিণত হয়।
শিবসেনার অভিজ্ঞতা থেকে তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতি আমি কিছুটা অনুমান করতে পারছি। একসময় দলের প্রতি অত্যন্ত অনুগত ছিলেন, এমন অনেকেই এখন দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝাড়ছেন। সব অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না; কিছু অভিযোগ হয়তো যথার্থও। সাধারণত ঘটনাপ্রবাহ এভাবেই শুরু হয়। তবে যখন কোনো আঞ্চলিক দলের ভাঙনের আগে একই ধরনের ঘটনা একটি নির্দিষ্ট ছকে ঘটতে থাকে, তখন অনেকেরই মনে হয় ‘শাহনীতি’ কাজ করছে, আর অমিত শাহ আড়ালে মুখ লুকিয়ে হাসছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মনোবল রয়েছে এবং তিনি অবশ্যই দলকে পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবেন। এ প্রসঙ্গে আমার দলের সভাপতি উদ্ধব ঠাকরের একটা কথা মনে পড়ে—নতুন পাতা গজানোর জন্য পুরোনো পাতার ঝরে পড়ার প্রয়োজন রয়েছে। এভাবেই আমরা টিকে থাকি, এভাবেই লড়াই চালিয়ে যাই।
বিজেপির রাজনীতির মোড় ঘোরানোর পদ্ধতি দেখে আজ আর মানুষ খুব একটা অবাক হয় না। এটি অনেকটা প্রদর্শনবাদী রাজনীতির মঞ্চ—শাহনীতির এক চরম ভেলকিবাজি। কে কোথায় যাচ্ছে বা কী করতে পারে—এ নিয়ে যেন এক ধরনের খেলা চলছে, আর বিভিন্ন সূত্রনির্ভর সংবাদমাধ্যমের অনুমান ও গুজব সে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
যেসব রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে আছেন বা রাজনীতি করতে করতে ক্লান্ত, তারা অনেক সময় তাৎক্ষণিক সুবিধা চান। কখনো দুর্নীতির মামলা থেকে নিষ্কৃতি, কখনো বিধানসভা বা সংসদের টিকিট, আবার কখনো মন্ত্রীর পদ বা গুরুত্বপূর্ণ কমিটির দায়িত্ব। ফলে দলবদল অনেকের কাছে ইউরোপিয়ান ফুটবল লিগের মতোই লাভজনক। কেউ কেউ একে রাজনীতিতে টিকে থাকার যুক্তি দেন; কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি নির্ভর করে সুযোগ-সুবিধার হিসাব-নিকাশের ওপর। কারণ এখন রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে আদর্শিক লড়াইয়ের বিপরীতে সুবিধা পাওয়া বা সুবিধা ধরে রাখার খেলায় পরিণত হয়েছে।
শাহনীতির আরেকটি পরিকল্পিত ‘দল বিভাজনের বিকল্প’ও রয়েছে। অনেক সময় নির্দিষ্ট কক্ষেও ভাঙন ধরানো হয়। যেমন, রাজ্যসভার ক্ষেত্রে আম আদমি পার্টির ভেতরে বিভাজনের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী, কোনো দলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য একসঙ্গে আলাদা হয়ে গেলে তারা নতুন বা পৃথক দল হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে। অনেক সময় তারা পুরোনো দলের নাম এবং প্রতীকও পেয়ে যায়। অর্থাৎ বিষয়টি মূলত সংখ্যার শক্তির ওপর নির্ভরশীল।
যদিও তৃণমূল ও শিবসেনার রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ভিন্ন, তবু মিল একটাই—শক্তিশালী এই দল দুটির মধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রলোভন দেখিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি করা। আর বিজেপি সে ভাঙনের পরিকল্পনা শেক্সপিয়রের ব্রুটাস চরিত্রের মতোই নির্মমভাবে প্রয়োগ করছে। মোদ্দা কথা, সব প্রদেশে অমিত শাহের ‘শাহনীতি’ একই—দুধ-কলার লোভ দেখিয়ে দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা, নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীদের উৎপাটন করা বা দুর্বল করা এবং এভাবে যুগ যুগ ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে রাখার খায়েশ পূরণ করা।
লেখাটি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ থেকে অনূদিত; এর লেখক প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের রাজনীতিবিদ এবং রাজ্যসভার সাবেক সদস্য। তিনি শিবসেনার (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) সঙ্গে আছেন।