Published : 08 Jun 2026, 01:53 AM
চার বছর ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপকে সঙ্গী করে নতুন অর্থবছর শুরু করতে যাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার।
এ যাত্রায় মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে সামলানো হবে, সেই পরিকল্পনা এখনো নীতি নির্ধারকদের পক্ষ থেকে খোলাসা করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণের ওপর থেকে এই বোঝা কমানোই সবচেয়ে বড় মাথাব্যাথা হবে সরকারের।
করণীয় নিয়ে পরামর্শও বাতলে দিয়েছেন তারা। বলছেন, শুধু এক ওষুধে কাজ হবে না। সরকার যে পদক্ষেপই নিক, ‘সমন্বিত নীতি’ ছাড়া মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা সম্ভব নয়।
তাদের এ বক্তব্যের যুক্তি হল, সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা থেকে শুরু করে বাজারে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করার মত নানা পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমেনি। কোনো মাসে একটু কমলেও পরের মাসেই ফের চড়ে যাচ্ছে। যার উদাহরণ সবশেষ চার মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র।
মূল্যস্ফীতি তখন ঘটে, যখন সময়ের সঙ্গে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। অর্থাৎ, টাকার মান কমে যায়।
এই মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাংলাদেশে সরকার সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করে চলেছে। পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে; কোনো কোনো পণ্যের আমদানি শুল্ক শূন্যও করা হয়েছে।
দেড় বছরের বেশি সময় ধরে নীতি সুদহার (পলিসি রেট বা রেপো রেট) ১০ শতাংশ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতেই রেপো রেট বার বার বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দুই মাসে তিন দফায় ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাগে আসছে না।
এমন প্রেক্ষাপটে ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
সেই বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেশের মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার নানা প্রতিশ্রুতি আসছে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে ১৬ মাসের সর্বোচ্চ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। গত এপ্রিলে এ হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এ নিয়ে টানা দুই ঊর্ধ্বমুখী হল মূল্যস্ফীতি।
এর আগে টানা চার মাস বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠেছিল। মার্চ মাসে তা কমে ৯ শতাংশের নিচে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নামে। এপ্রিলে ফের তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
পয়েন্ট টু পয়েন্টে ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ দিয়ে বোঝায়, গত বছর মে মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছরে মে মাসে পেতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪২ পয়সা।
দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির যে পারদ, তা বাড়তে থাকে মূলত কোভিড মহামারীর ধাক্কায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে মহামারীর পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধকেও সামনে আনে।
কিন্তু কোনো কোনো বিশ্লেষক এবং সরকারবিরোধী অনেক রাজনীতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের হাত থাকার কথাও বলেন।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রায় দেড় বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকার।
এ সময়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও গভর্নর আহসান এইচ মনসুর একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছিলেন মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ হিসেবে অবশ্য সরকারের সঙ্গে ‘সমন্বয়হীনতার’ কথা বলেন তৎকালীন গভর্নর। গেল ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তিনি বলেন, “মুদ্রানীতির শুধু মূল্যস্ফীতি ছাড়া বাকিগুলো কিন্তু অর্জন হয়েছে।
আমলাতান্ত্রিকতার কারণে অনেক কিছু ‘ধীরে হয়’ মন্তব্য করে গভর্নর বলেন, “এখানে মার্কেট পলিসির সঙ্গে রাজস্ব নীতির একটা সমন্বয় হতে হয়। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না সেভাবে।’’


দেশে কেন মূল্যস্ফীতি কমছে না, সেই প্রশ্নে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাধারণ মানুষ গত চার বছর ধরে টানা মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছে। উচ্চ সুদের হার চালু রেখে কিছুটা মূল্যস্ফীতি কমানোর ইঙ্গিত মিলেছিল, তা আবারে বেড়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি করছে।”
“বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ পর্যন্ত সরকারের নেওয়া কোনো পদক্ষেপই যে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারেনি, তা আবার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।”
বাজার পরিস্থিতি উন্নত না হওয়ার পেছনে কিছু বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করেছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
“সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়াসহ বিশ্ব-রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা আছে।”
শঙ্কার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, “সরকার ১১ জুন নতুন বাজেট দেবে। এই বাজেটের বড় মাথাব্যথার কারণ হতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি সমন্বয়।”
আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লা, গ্যাস ও জীবাশ্ম জ্বালানির দাম ‘অস্বাভাবিক’ বেড়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ইতোমধ্যে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় বিদ্যুৎমূল্য ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে।”
বিদ্যুতের আগেই অবশ্য দেড় মাসের মধ্যে দুই দফায় চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার।
সরকারের দাবি, জ্বালানিপণ্যের দাম বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতিতে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না।
গত ১৯ এপ্রিল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “তেলের দাম একা তো মূল্যস্ফীতি বাড়ায় না। এটা একটা মূল কথা। খালি তেলের দামের জন্য কি মূল্যস্ফীতি বাড়বে?”
তবে জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সবার ঘাড়ে একটা বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এখন যেটা করা হচ্ছে, সেটা ১ টাকা ২৫ পয়সা প্রতি কিলোওয়াট আওয়ারে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি আমার অনুমান, এখন যা আছে তার থেকে শুধু এই কারণে ১ শতাংশের কাছাকাছি বাড়তে পারে আগামী এক বছরের মধ্যে। এইটা তো একটা অতিরিক্ত চাপ সবার উপরেই তৈরি করছে।”

২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। দীর্ঘদিন মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দুই মাসে তিন দফায় ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়।
ওই বছরের নভেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পরের মাস থেকে কমতে কমতে গত বছরের অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নামে। সেখান থেকে আবার বেড়ে নভেম্বরে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে আরও বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে ওঠে।
৩০ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হবে। এই আর্থিক বছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি। তাতে নীতি সুদহার বা রেপো হার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়।
রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো এক দিনের জন্য টাকা ধার নেয়। একে বলা হয় ব্যাংকিং খাতের নীতি উপাদান (পলিসি টুলস)। এর সুদ হারকে বলা হয় নীতি সুদহার বা রেপো রেট। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে।
রেপোর সুদ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর তহবিল পাওয়ার খরচ আরও বাড়ে। তাতে ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুদহার বেড়ে যায়।
এই হার অপারিবর্তিত রাখার মানে হল, বাজারে মুদ্রাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সুদহারের লাগাম শিথিল করছে না।
দেড় বছর রেপো সুদহার ১০ শতাংশ থাকায় ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। দেশে বিনিয়োগে যে খরা চলছে, এই উচ্চ সুদহার তার একটি কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

করোনা মহামাররীর প্রথম ধাক্কার পর ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই মূল্যস্ফীতির হার সারা বিশ্বে বাড়তে শুরু করে। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হয়। ইউরোপ ও আমেরিকায় মূল্যস্ফীতির হার ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়।
তখন থেকে বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। কিন্তু উপমহাদেশের অন্যান্য দেশ বা ইউরোপ–আমেরিকা মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনো কমছে না।
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া প্রতিবেদন বলছে, গত মে মাসে দেশটিতে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। আগের মাস এপ্রিলে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি উঠেছিল প্রায় ৭০ শতাংশে। ওই সময় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ।
২০২৪ সালের শেষের চার মাস শ্রীলঙ্কায় কোনও মূল্যস্ফীতি হয়নি; বরং মূল্য সংকোচন হয়। অর্থাৎ নেগেটিভ (-) মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ওই চার মাসে।
পাশের দেশ ভারতের মূল্যস্ফীতিও কম। সবশেষ গত এপ্রিলে ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে দেশটিতে।
তবে বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি এখন বেশি। এপ্রিলে ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে দেশটিতে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ২০২৩ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশে উঠেছিল।


ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছিল। ওই বাজেটের এক মাস যেতেই পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; বাজেট বাস্তবায়ন করে অন্তবর্তী সরকার। ১০ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছর।
পাঁচ বছর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য দুই শতাংশে ওঠে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষ হয় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ নিয়ে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে রাখার লক্ষ্য ধরে অন্তবর্তী সরকার। এপ্রিল পর্যন্ত (২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালে এপ্রিল) হিসাবে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতির তথ্য দিয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরো।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে নতুন বাজেটে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তারেক রহমানের সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৩টি কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিও রয়েছে।
এ খাতে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে নতুন বাজেটে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি।
এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যাও বাড়ানো হতে পারে।


এ প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির চাপের মধ্যে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন সামাজিক ভাতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে এর প্রাপ্তি ও বণ্টন নিয়ে সংশয় আছে।
বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্য শতাধিক সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প সচল আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এসব প্রকল্পের পারফরম্যান্স একেবারেই সন্তোষজনক নয় এবং ১ টাকা দিতে গিয়ে দেড় টাকা খরচ হওয়ার মতো সমস্যা রয়েছে।
“তেমনটা যেন না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে, তাহলেই কেবল এর সুফল পাওয়া যাবে।”
অন্য অনেক দেশ পারলেও বাংলাদেশ কেন মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছে না, সেই প্রশ্নে জাহিদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে যাওয়া থেকে হয়ত ঠেকিয়ে রেখেছে। তবে এটিই মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ বর্তমান সংকটটি মূলত সরবরাহভিত্তিক।
“প্রশ্নটা হলো, যেখানে আপনার সরবরাহ সংকট, সেখানে সেইটাকে যদি আমরা এড্রেস করতে না পারি, এখন ধরেন গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে না, যার কারণে সরবরাহ যেটা দেয়া সম্ভব, সেটা আমরা দিতে পারছি না। ওইটা যদি আমরা সমাধান করতে পারতাম, তাহলে সেটা মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হতো।”
মূল্যস্ফীতি কমাতে চাইলে চাঁদাবাজি কমানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “যে দামে উৎপাদকরা বিক্রি করছেন, আর যে দামে ভোক্তারা কিনছেন, চাঁদাবাজির কারণে তার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য তৈরি হয়। তো সেখানে যদি আমরা আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতিকে উন্নত করতে পারতাম, যার ফলে চাঁদাবাজিটা বন্ধ হতো, তাহলে ওই অতিরিক্ত মূল্যটা ভোক্তাদের দিতে হতো না। সেটাও মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হতো।
“এদিক বিবেচনায় সরবরাহের সংকট সমাধান না করে ওই শুধু সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে রেখে মূল্যস্ফীতি কমবে, এটা আশা করা যায় না।”

প্রায় একই কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের জন্য এটা খুবই দুঃখজনক যে, আমরা মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমাতে আমরা সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করতে পারছি না।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতিকে শুধু মুদ্রানীতির বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশ সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি খরচ, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত।
“তাই সমন্বিত নীতি দরকার। খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করতে হবে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। মজুতদারি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি দরকার। আমদানি সিদ্ধান্তও সময়মতো নিতে হবে, যেন বাজারে ঘাটতি তৈরি না হয়। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পাইকারি বাজার ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়াতে হবে।”
নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, স্থির আয়ের মানুষ এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীরা মূল্যস্ফীতির প্রধান ভুক্তভোগী। তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে।
“খাদ্যসহায়তা, স্বল্প মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নগদ সহায়তা এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক সহায়তার মতো কর্মসূচি বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে সম্প্রসারণ করা দরকার।”