Published : 08 Jun 2026, 09:21 AM
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও দেশের শাসনভার তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য জেনারেল ইয়াহিয়া খান সেখানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা করলেও ‘মুক্তিবাহিনী’ নামক সংগঠনটি সেখানে দাঙ্গা ছড়াতে ব্যস্ত থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ঢাকায় বৈঠকে মিলিত হন। কিন্তু আলোচনা কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে লক্ষ লক্ষ বাঙালি ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করে।
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান পৃথক হওয়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানে বাণিজ্য ও সরকারি চাকরিতে বিপুল সংখ্যক হিন্দুর প্রাধান্য ছিল এবং তারা গোপন উদ্দেশ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব উসকে দিচ্ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা খাত সম্পূর্ণভাবে হিন্দুদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা বাঙালিদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করেছিল এবং তাদের মধ্যে বিদ্বেষমূলক অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছিল।
নবম শ্রেণির ‘পাকিস্তান স্টাডিস’ পাঠ্যপুস্তকের ৫৩ নম্বর পাতায় ঠিক এভাবে পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের ‘বাংলাদেশ’ নামক দেশটির জন্মের ইতিহাস শেখাচ্ছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসই যারা জানাচ্ছে না, মুক্তিযোদ্ধাদের যারা ‘দাঙ্গাবাজ’' উল্লেখ করে পাঠ্যপুস্তক রচনা করছে, সেই দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আমাদের ছেলে-মেয়েদের দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে। ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ উদ্যোগের আওতায় অর্ধসহস্রাধিক শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ নিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর বের হয়েছে।

১১ মে ঢাকায় ‘পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপো-২০২৬’ অনুষ্ঠানে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, “আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি ৫৫ বছর, আর পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে ৭০ বছর। স্টলগুলো ঘুরে আমার মনে হলো সমগ্র পাকিস্তান ঘুরে এসেছি। তাদের শিক্ষায় যে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে তাতে আমি সত্যি অভিভূত। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অত্যন্ত চমৎকার।” শিক্ষামন্ত্রী যদি ১৯৪৭ সালকে পাকিস্তানের স্বাধীনতার বছর বিবেচনা করে থাকেন, তাহলে বছর দশেক কমিয়ে দিয়েছেন দেশটির বয়স।
শিক্ষামন্ত্রীর এই প্রশংসা যাই হোক, বাস্তবে তারা শিক্ষার হার ও মানের দিক থেকে আমাদের তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে আছে, শিক্ষামন্ত্রী জেনেশুনে এড়িয়ে গেছেন এই তথ্যটা। যে দেশের উচ্চশিক্ষার অবস্থা আমাদের চেয়েও খারাপ, সেই দেশের শিক্ষা নিয়ে আমরা আসলে কতটা মেধা ও মননের উন্মেষ ঘটাত পারব?
এখানে হয়তো অনেকেই প্রশ্ন তুলবেন, শিক্ষা ও গবেষণার কোনো সীমান্ত নেই। হ্যাঁ, জ্ঞানচর্চা অবশ্যই বৈশ্বিক। কিন্তু জ্ঞানচর্চা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সত্য, মানবিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার ওপর দাঁড়ায়। মাতৃভূমির ইতিহাস বিকৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কখনো মুক্তচিন্তার পরিবেশ তৈরি করতে পারে না। তারপরও যদি কেবল শিক্ষাগত মানদণ্ডে বিচার করি, তাহলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—আমাদের শিক্ষার্থীরা কেন পাকিস্তানে যাবে?
এইসব বোঝবার জন্য, পাঠক চলুন দেখে আসি, বৈশ্বিক সংস্থাগুলো পাকিস্তানের শিক্ষা ও গবেষণাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করছে। পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যি আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে?
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শিক্ষিত হওয়ার হার (২০২১ সাল) হচ্ছে ৫৮ শতাংশ; যেখানে পুরুষ ৬৯ শতাংশ আর নারী ৪৮ শতাংশ। একই ওয়েবসাইট বলছে, বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষিত হওয়ার (২০২২ সাল) হার ৭৯ শতাংশ, যার মধ্যে পুরুষ ৮১ শতাংশ আর নারী ৭৬ শতাংশ।
ইউনেস্কোর সর্বশেষ (২০২৬) ‘বিশ্ব শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন’ মতে, দেশটির ১৯৯০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ছিল ৩৪ শতাংশ, সেখান থেকে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশ। মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পর ৭৪ শতাংশ জনগোষ্ঠী সফলভাবে শিক্ষা গ্রহণ শেষ করে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানে প্রাথমিক শিক্ষায় ৫৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সফলভাবে পড়াশোনা শেষ করতে পারে। তবে উভয় দেশে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ৩৮ শতাংশ বলে জানিয়েছে ইউনেস্কো। অর্থাৎ, মৌলিক শিক্ষায়ও বাংলাদেশ পাকিস্তানের তুলনায় বহুদূর এগিয়ে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম (ইউএস নিউজ) ও শিক্ষা বিষয়ক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংস্থার ডেটা নিয়ে তৈরি করা বৈশ্বিক শিক্ষা র্যাঙ্কিংয়ে ১০০ স্কোর নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্ক, আর ১.৫ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১২২তম। অন্যদিকে পাকিস্তান কোনো স্কোর তৈরি করতে পারেনি এবং আমাদের চেয়ে চৌদ্দ ধাপ পিছিয়ে দেশটির অবস্থান ১৩৬তম।
বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার' প্রতি বছর বিশ্বের সব দেশের গবেষণা ও প্রকাশনার ওপর ভিত্তি করে একটি তালিকা তৈরি করে, যাকে 'নেচার ইনডেক্স' বলা হয়। ইনডেক্সে জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে চীন, এরপর রয়েছে জাপান আর তৃতীয় অবস্থানে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ত্রয়োদশ।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের এই এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে ঠাঁই হয়নি। তবে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে একটি তালিকা করা হয়েছে, যার শীর্ষে রয়েছে ইসরায়েল, দ্বিতীয় অবস্থানে সৌদি আরব, তৃতীয় অবস্থানে তুরস্ক। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। যেখানে দেশটির মোট গবেষণার কোলাবোরেশন হিসেবে চীনের সঙ্গে ৪১ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৭ শতাংশ, সৌদি আরবের সঙ্গে ৮ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ৭ শতাংশ রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ গবেষণার সহযোগী দেশ হিসেবে শীর্ষে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যাদের সঙ্গে আমরা ৫৩ শতাংশ শেয়ার করি। এরপরই রয়েছে যুক্তরাজ্য (১৩ শতাংশ), অস্ট্রেলিয়া (৭ শতাংশ), ভারত ও চীন (৪ শতাংশ)।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের গবেষণা সহযোগিতার শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ; অন্যদিকে পাকিস্তানের গবেষণা সহযোগিতা প্রধানত চীননির্ভর। অর্থাৎ, বৈশ্বিক জ্ঞানব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ এখন অনেক বেশি বহুমাত্রিক ও শক্তিশালী। শিক্ষা, গবেষণা ও কাঠামোয় পাকিস্তান যেখানে আমাদের থেকে পিছিয়ে রয়েছে, সেখানে আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য কি সত্যিই পাকিস্তান সবচেয়ে প্রয়োজনীয় গন্তব্য হতে পারে?
নেপাল কিংবা ভুটান থেকে অনেক শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়াশোনার জন্য আসে। বিশেষ করে আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। মানুষ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যায় মূলত নিজ দেশের চেয়ে ভালো মানের দেশে। এখন কেউ যদি নিজেদের চেয়েও কম মানের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যেতে চায়, সেটি ঠিক কোন মানদণ্ডের বিচারে হতে পারে, তা অবশ্যই পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
ধরুন, কেউ পাকিস্তানের কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করল; পরবর্তীতে তিনি যদি ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র বা পূর্ব এশিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক বা শিক্ষকতার জন্য আবেদন করেন, সেই ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা কতটা হবে? বাস্তবতা হচ্ছে, এখনও পাকিস্তানের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দৃশ্যমান নয়। যে দেশের নাগরিকদের পিএইচডির মান অন্য দেশে এখনো কাজে দেয় না, সেই দেশের পিএইচডি করে নামের আগে ডক্টর লাগিয়ে আমরা কোন ফায়দা লাভ করব?
অবশ্য আমাদের দেশেরই পিএইচডির মান বৈশ্বিক নয়, যে কারণে আমাদের ছেলে-মেয়েরা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চীন কিংবা ইউরোপের বহু দেশে পাড়ি জমাচ্ছে।
আমাদের উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সংকট রয়েছে, বিশেষ করে গবেষণায় বাজেট কম, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং হতাশাজনক। কিন্তু এসব সংকটের সমাধানের জন্য সরকার কী উদ্যোগ গ্রহণ করছে, সেটিই বড় বিষয় হতে পারে। নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করার পথ তৈরি করতে হবে। যেসব দেশে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও গবেষণার বাস্তব পরিবেশ রয়েছে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয় করতে হবে। যেন সেই দেশগুলোতে আমাদের শিক্ষার্থীরা কেবল ডিগ্রি নয়, বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়।
রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে, বাণিজ্যও হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসবোধহীন সম্পর্ক কখনো টেকসই সম্মান তৈরি করতে পারে না। জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপরাধ স্বীকার করেছে বলেই আজ বিশ্বে সম্মানিত। পাকিস্তান ১৯৭১ সালের জেনোসাইডের জন্য ক্ষমা চায়নি, বরং তারা আজও পাঠ্যবইয়ে মিথ্যা ইতিহাস ছড়াচ্ছে।
এই বাস্তবতায় পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের পাঠানো নিছক সম্প্রীতি নয়; এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও প্রতারণা। লোভনীয় বৃত্তির বৃত্তে আমরা যেন নিজ মাতৃভূমিকে ভুলে না যাই, সেই বিষয়ে আমাদের তরুণদের সতর্ক থাকতে হবে।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: [email protected]