Published : 05 May 2026, 05:02 PM
ফেইসবুকে ছবিটা পোস্ট করলেন। ক্যাপশন লেখা হয়েছে যত্ন করে। পোস্ট করার পর মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করলেন। তারপর আবার ফোন খুললেন— কত লাইক হল দেখতে। আট মিনিট পর আবার। পনেরো মিনিট পর আবার।
কেউ হয়তো ‘হার্ট’ দিয়েছেন, কেউ কমেন্টে লিখেছেন ‘দারুণ!’ মনটা হালকা হয়ে গেল।
তবে প্রত্যাশার চেয়ে কম লাইক হলে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি আসে, মন একটু ভারী হয়।
এই অভিজ্ঞতাটা কি চেনা? শুধু আপনার নয়, কোটি মানুষের। তবে এই অনুভূতিটা আসলে কোথা থেকে আসে?
মস্তিষ্ক ‘লাইক’কে পুরস্কার মনে করে
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা ব্যাখ্যা করেন, “পোস্টে লাইক বা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসলে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম সক্রিয় হয়। তখন ডোপামিন নামের রাসায়নিক নিঃসৃত হয় — যা আনন্দ, স্বীকৃতি আর তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে।”
“সহজ করে বললে— মস্তিষ্ক লাইক’কে একটা ছোট্ট পুরস্কার হিসেবে দেখে। যেমন, কেউ মুখে বললো- ‘বাহ, এটা তুমি দারুণ করেছ।’ সেই প্রশংসার অনুভূতিটাই ডিজিটাল রূপে পাচ্ছেন লাইক-এর মাধ্যমে”- বলেন এই মনোবিদ।
মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক প্রাণী। অন্যের গ্রহণযোগ্যতা, স্বীকৃতি— এগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদার একটা। লাইক-কমেন্ট সেই চাহিদাকেই ডিজিটাল জগতে পূরণ করে।
অনিশ্চয়তাই এই অভ্যাসকে আসক্তির মতো বানায়
বারবার ফোন পরখ করার অভ্যাসটা কেন এত জোরালো হয়— এর উত্তরে একটু গভীরে যেতে হবে।
এই বিষয়ে ‘দ্য লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স’য়ের ‘সাইকোলজিক্যাল অ্যান্ড বিহেইভিওরাল সায়েন্স’ বিভাগের ডা. ম্যাক্সি হেইটমায়ার ব্যাখ্যা করেন, “কখন কত লাইক আসবে, কে কমেন্ট করবে — এটা আগে থেকে জানার উপায় নেই। এই অনিশ্চয়তাটাই মস্তিষ্ককে আরও উত্তেজিত রাখে।”
মনোবিজ্ঞানে এটাকে বলা হয় 'ভ্যারিয়েবল রিওয়ার্ড' — অনিশ্চিত পুরস্কারের টান।
একটা স্লট মেশিনে কখন পুরস্কার আসবে জানা যায় না, তাই বারবার টানতে ইচ্ছে করে।
ফেইসবুক বা ইন্সটাগ্রামের নোটিফিকেইশনও ঠিক এইভাবেই কাজ করে। প্রতিবার ফোন খুললে হয়ত নতুন ‘লাইক’ পাওয়া যাবে — এই প্রত্যাশাটাই বারবার হাতে ফোন তুলে নিতে ইচ্ছে হয়।
‘লাইক’ কম হলে নিজেকে ছোট মনে হয় — এই ফাঁদে অনেকেই পড়েন
পোস্টে সাড়া ভালো হলে মন ভালো, কম হলে মন খারাপ — এই চক্রটা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন শুরু হয় আসল সমস্যা।
ডা. হেইটমায়ার পর্যবেক্ষণমূলক এক গবেষণায় দেখেছেন- প্রত্যাশা-মতো ‘লাইক’ না আসলে অনেকের মনে হয় — আমাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আমার পোস্টটা হয়ত ভালো ছিল না। মানুষ কি আমাকে পছন্দ করে না? এই ভাবনাগুলো আত্মমর্যাদার ক্ষতি করতে পারে।
আরও সমস্যা হয় যখন নিজের পোস্টের প্রতিক্রিয়া অন্যদের পোস্টের সঙ্গে তুলনা শুরু হয়। ‘ওর এত লাইক হল, আমার এত কম কেন?’ — এই সামাজিক তুলনাটা মানসিক চাপ বাড়ায়।
পোস্ট দেওয়ার পর উদ্বেগ, মেজাজের ওঠানামা — এগুলো ছোট লক্ষণ নয়
পোস্ট দেওয়ার পর কিছুক্ষণ অস্থির থাকা, ফোন বারবার পরখ করা, প্রতিক্রিয়া না এলে মন খারাপ হওয়া — এগুলো যদি নিয়মিত হয়, তাহলে একটু ভেবে দেখার বিষয়।
ডিজিটাল প্রতিক্রিয়ার ওপর মন ভালো-মন্দ নির্ভর করতে শুরু করলে আবেগ অস্থির হয়ে পড়ে।
“আজকে একশোটা লাইক পেলে দিনটা ভালো, কালকে দশটা পেলে সারাদিন মন খারাপ— এই ওঠানামাটা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্লান্তিকর” বলেন এই মনোবিজ্ঞানি।
মন খারাপ হলে পোস্ট করা, কমেন্টের প্রতিক্রিয়া পেতে আবার পোস্ট করা এইভাবে সামাজিক মাধ্যমকে আবেগ সামলানোর হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা একটা বিপজ্জনক অভ্যাস।
নিজের মূল্য লাইকে মাপবেন না — এই কথাটা শুনতে সহজ, মানতে কঠিন
"লাইক দিয়ে নিজেকে মাপবেন না" — এই কথাটা হয়তো অনেকবার শুনেছেন। তবে বাস্তবে এটা মানা কঠিন, কারণ মস্তিষ্ক ততক্ষণে অভ্যাস তৈরি করে ফেলেছে।
তাই কথাটা শুধু বললে কাজ হয় না। কিছু ছোট পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
পোস্ট করার পর ফোন কিছুক্ষণ দূরে রাখতে হবে, অন্তত আধা ঘণ্টা। এতে বারবার পরখ করার অভ্যাসটা ধীরে ধীরে কমে। ফোনে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেইশন বন্ধ রাখতে হবে। প্রতিটা নোটিফিকেইশনের শব্দ ফোন তোলার প্রলোভন তৈরি করে।
“বাস্তব জীবনের সম্পর্কে বেশি সময় দিতে হবে। কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বললে, হাসলে, একসঙ্গে সময় কাটালে যে ডোপামিন তৈরি হয় — সেটা ফেইসবুকের লাইক থেকে অনেক বেশি টেকসই”- বলেন ডা. দিনা।
ডিজিটাল স্বীকৃতি ভালো, তবে সেটাই সব নয়
লাইক পেলে ভালো লাগাটা স্বাভাবিক। আর এটা মস্তিষ্কের গড়নের কারণেই। এতে লজ্জার কিছু নেই।
তবে খেয়াল করতে হবে- লাইকের সংখ্যার সাথে যদি মেজাজ পরিবর্তিত হয়, পোস্ট না করলে যদি নিজেকে অদৃশ্য মনে হয়— তখন একটু থামতেই হবে।
আরও পড়ুন
ফেইসবুকে পরিবারের সদস্যদের সীমারেখা টানার পন্থা
৩০ দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার না করলে মস্তিষ্কে যা ঘটে