Published : 10 Jun 2026, 04:57 PM
নারীর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অসচেতনতা দেখা যায় আমাদের সমাজে। বেশিরভাগ নারী বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে মেনোপোজ পর্যন্ত নানান শারীরিক ও মানসিক সমস্যার পাশাপাশি পুষ্টির ঘাটতি নিয়ে বেড়ে ওঠে।
ফলে কর্মজীবনে গিয়ে কাজ ও পরিবারের মধ্যে সুস্থ থাকাটা ‘চ্যালেঞ্জিং’ হয়। কারণ খাদ্যতালিকায় সুষম খাবার না থাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে এবং অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
যে কারণে সঠিক পুষ্টির দরকার
খাবার শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। খাদ্যের প্রতিটি উপাদান শরীরে বিভিন্নভাবে পুষ্টির যোগান দেয়। নারীর জীবনে গর্ভাবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা প্রসব পরবর্তী অবস্থা, স্তন্যপান করানো, শিশুর লালণ পালনে যথেষ্ট পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা জরুরি।
আবার আধুনিক জীবনধারায় চাপ মোকাবিলাতেও নারীর জীবনে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা একটি গুরুত্বপূর্ণ।
নারীদের স্বাস্থ্যে কিছু সমস্যা বছরের বছর ধরে বেশি দেখা যায়, যেমন- ঋতুস্রাবজনিত সমস্যা, গর্ভাবস্থায় ওজন কম বা বেশি, পিসিওস, পিসিওডি, রক্তস্বল্পতা, হাড় ক্ষয়জনিত সমস্যা, প্রসাবে সংক্রমণ, যৌনমিলনের মাধ্যমে সংক্রমণ, হরমোনজনিত সমস্যা, স্তন ও জরায়ু ক্যান্সারসহ নানান সমস্যা।
অথচ বেশিরভাগ নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা একটি সুষম ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যতালিকা দিয়ে সমাধান করা যেতে পারে।
রক্তাল্পতায় সমস্যা
এটা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। নারীদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রতি মাসে পিরিয়ড বা মাসিক হয়। এ সময় তাদের শরীরে রক্তের ক্ষয় হয়। ঋতুস্রাবের কারণে নারীদের পুরুষের তুলনায় বেশি আয়রন বা লোহার প্রয়োজন পড়ে। যেখানে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের প্রতিদিন প্রায় ৮ মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন, সেখানে নারীদের প্রয়োজন ১৮ মিলিগ্রাম।
নারীরা গর্ভবতী হলে এই চাহিদা বেড়ে প্রায় ২৭ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হয়। তবে স্তন্যদানকালে (মাসিক বন্ধ থাকার কারণে) এই চাহিদা কমে দৈনিক ৯ মিলিগ্রাম হয়ে যায়।
গর্ভাবস্থায় যেমন বেশি আয়রনের প্রয়োজন, তেমনি মেনোপোজ বা মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পরও আয়রনের চাহিদা কমে যায়।
এজন্য নিয়মিত একজন নারীকে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি আয়রন শোষণ বৃদ্ধির জন্য বিশেষ করে ‘নন-হিম আয়রনে’র বা উদ্ভিজ্জ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে।
এছাড়া নারীদের মাঝে মাঝে রক্ত পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পাশাপাশি একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ কম খেয়েও রক্তাল্পতা দূর করা যায়।
অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা
সাধারণত আন্তর্জাতিক নিয়মে বিএমআই ২৫-এর বেশি হলে অতিরিক্ত ওজন এবং ৩০-এর বেশি হলে স্থূলতা গ্রেড-১ নির্দেশ করা হয়। তবে দক্ষিণ এশীয় ও বাংলাদেশের মানুষের শারীরিক গঠন অনুযায়ী, বিএমআই ২৩-এর বেশি হলে অতিরিক্ত ওজন এবং ২৫-এর বেশি হলে স্থূলতা বা ওবেসিটি বলা হয়ে থাকে।
আমাদের দেশে সাধারণত গ্রামীণ নারীদের তুলনায় শহরের নারীদের মধ্যে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। বর্তমানে প্যাকেটজাত খাবার বা ‘রেডি-টু-ইট’ খাবার সহজে হাতের কাছে পাওয়ায় অনেক নারীই খাবার তৈরি বা রান্না করার ঝামেলা এড়াতে চাচ্ছেন।
আবার অনেক নারী চাকরিজীবী হওয়ায় ব্যস্ত জীবনযাপনের কারণে রান্নার পর্যাপ্ত সময় পান না। ফলে তারা সহজেই এসব প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ করছেন।
এতে নারীদের পেট ভরলেও শরীরে পুষ্টির মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। কারণ প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, রাসায়নিক উপাদান, কৃত্রিম স্বাদ, রং এবং প্রিজারভেটিভ বা সংরক্ষক কেমিকেল থাকে, যা স্বাস্থ্যকে মুটিয়ে ফেলে এবং ওজন ও স্থূলতা বৃদ্ধি করে।
দীর্ঘদিন এভাবে পুষ্টির ঘাটতি এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির সমস্যা, ফ্যাটি লিভার, গ্যাস্ট্রিক, বদহজম, অন্ত্রের বা ‘গাট হেলথে’র সমস্যা এবং হৃদরোগসহ নানান জটিল রোগ হতে পারে।
তাই বাইরের প্যাকেটজাত খাবার সবসময় গ্রহণ না করে ঘরের তৈরি সুষম ও পুষ্টিকর খাবারে অভ্যস্ত হতে হবে।
অস্টিওপরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের রোগ
সাধারণত নারীদের মেনোপোজ বা মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অস্টিওপরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের রোগ বেশি দেখা যায়। এর প্রধান কারণ হিসেবে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়াকে দায়ী করা হয়।
এছাড়া বিভিন্ন রোগ শরীরে আগেই থাকলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি আরও বাড়ে। এজন্য নির্দিষ্ট বয়সের পর নারীদের হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করা উচিত। এই রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে।
ভিটামিন ডি-এর সবচেয়ে সহজ ও প্রধান উৎস হল, সূর্যের আলো। যারা বেশিরভাগ সময় বাড়ির ভেতরে বা অফিসে থাকেন, তাদের খাবারে ভিটামিন ডি-এর প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নিতে হবে।
প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খুব কম। এর মধ্যে রয়েছে তৈলাক্ত মাছ এবং ডিমের কুসুম।
এছাড়া বাজারে কিছু ফরটিফাইড বা কৃত্রিমভাবে পুষ্টিসমৃদ্ধ করা দুধ, সয়া মিল্ক, সিরিয়াল ও কমলার রস পাওয়া যায়, যা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি মেটায়।
অন্যদিকে, ক্যালসিয়ামের জন্য দুগ্ধজাত খাবার, যেমন- দুধ, দই, পনির ছাড়াও তিল, বাদাম, টোফু এবং সবুজ শাকসবজি নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে।
বিষণ্ণতা
নারীদের বয়ঃসন্ধি, গর্ভাবস্থা, প্রসব-পরবর্তী সময় এবং মেনোপজের দিনগুলোতে হরমোনের নানান পরিবর্তন ঘটে, যা বিষণ্ণতার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ। এর পেছনে কর্মজীবী নারীদের পেশাগত মানসিক চাপ, পারিবারিক ও সামাজিক জটিলতার পাশাপাশি শরীরে পুষ্টির ঘাটতিও বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং ভিটামিন সি-এর অভাব মন-মেজাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এই সমস্যা দূর করতে নারীদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সুষম ও পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে। বিশেষ করে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস, ভিটামিন ডি, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
পাশাপাশি অতিরিক্ত মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ক্যাফিন (চা-কফি) এড়িয়ে চলতে হবে। সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত ব্যায়াম করাও অত্যন্ত জরুরি।
মূত্রনালীর সংক্রমণ
নারীরা সাধারণত পর্যাপ্ত পানি বা তরল খাবার গ্রহণ না করার কারণে মূত্রনালীতে বারবার প্রস্রাবের ইনফেকশন দেখা দেয়। এছাড়া সময়মতো প্রস্রাব না করা বা প্রস্রাব চেপে রাখা, অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার, টয়লেট ব্যবহারের পর সঠিক নিয়মে (সামনে থেকে পিছনের দিকে) পরিষ্কার না করা এবং দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণেও মূত্রনালীতে সংক্রমণ দেখা দেয়।
এই সমস্যা প্রতিরোধে প্রতিদিন অন্তত ২ থেকে ৩ লিটার পানি পান করা জরুরি। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন— পেঁপে ও পেয়ারা খাওয়া যেতে পারে।
তবে সংক্রমণ বা জ্বালাপোড়া থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত টক ফল (যেমন: লেবু বা কমলা) সরাসরি বেশি না খাওয়াই ভালো, কারণ সিট্রিক অ্যাসিড সাময়িকভাবে প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া বাড়িয়ে দিতে পারে।
এছাড়া মূত্রনালীর ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়াতে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার যেমন- দই, ঘোল বা ফারমেন্টেড (আঁশযুক্ত ও গাঁজানো) খাবার গ্রহণ করা উচিত।
পাশাপাশি প্রতিদিন কাঁচা রসুন খাওয়া যেতে পারে। রসুনে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান, যা এই সংক্রমণের জন্য দায়ী প্রধান ব্যাকটেরিয়া 'ই-কোলাই' ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
থাইরয়েড সমস্যা
বর্তমানে নারীদের মধ্যে থাইরয়েডের সমস্যা ডায়াবেটিসের মতোই ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, যা প্রজনন স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এটি নারীদের সন্তান ধারণের ক্ষেত্রেও বড় একটি বাধা।
থাইরয়েডের সমস্যা সাধারণত বংশগত বা অটোইমিউন (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটি) কারণে হয়ে থাকে। তবে গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের শরীরে যদি পর্যাপ্ত আয়োডিন, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক, ভিটামিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের ঘাটতি থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে তার সন্তানেরও থাইরয়েডের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এই ঝুঁকি এড়াতে এবং থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখতে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা জরুরি। সেলেনিয়ামের উৎস হিসেবে ডিম, সূর্যমুখীর বীজ, ব্রাজিল বাদাম বা সাধারণ বাদাম খাওয়া যেতে পারে।
জিঙ্কের ঘাটতি মেটাতে কুমড়ার বীজ ও মুরগির মাংস এবং ভিটামিন-বি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের জন্য রঙিন শাকসবজি, টমেটো ও বেরিজাতীয় ফল খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।
পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী থাইরয়েডের ধরন বুঝে সঠিক পরিমাণে আয়োডিনযুক্ত লবণ বা সামুদ্রিক মাছ খাওয়া দরকার।
রক্তচাপ কমে যাওয়া
নারীদের ঋতুস্রাব বা মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে শরীরে রক্ত ও তরলের আয়তন কমে যায়, যা সাময়িকভাবে রক্তচাপ কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান না করা এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যে ভিটামিন বি১২, ফোলেইট ও প্রোটিনের ঘাটতি থাকলে রক্তাল্পতা হয় এবং রক্তচাপ কমে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই পুষ্টির ঘাটতি মিটিয়ে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে ফোলেইট ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন- ডিম, দুধ, কলিজা, কচুশাক, পালংশাক, ডালিম, ড্রাগন ফল, কিশমিশ, খেজুর ও গুড় খাদ্যতালিকায় নিয়মিত রাখা উচিত।
পাশাপাশি শরীরের রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি বা তরল খাবার গ্রহণ করা জরুরি।
লেখক: দিনাজপুরের রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার পুষ্টিবিদ লিনা আকতার।
আরও পড়ুন
যাদের ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করা উচিত না