ভাবছেন মজা করে দিন রাত মাংস খেতে হবে, কারণ কোরবানির পর ঘরে থাকবে প্রচুর মাংস।
তবে বেশি খেলে নানান স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
গরুর মাংসে রয়েছে উচ্চ মানের প্রোটিন যা তৃপ্তিবোধ করায়, ক্ষুধা কমায় ও বিপাক হার বাড়ায়| একে লাল মাংস বলা হয়| কারণ এতে রয়েছে মায়োগ্লোবিন। আরও থাকে বিভিন্ন ভিটামিন এবং খনিজ।
রক্তস্বল্পতার সমস্যা দূর করতে, শারীরিক শক্তি বাড়াতে, ক্লান্তি কমাতে, ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে, রোগ প্রতিরোধসহ নানান উপকারিতা পাওয়া যায় এই মাংস থেকে| তবে অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর উপায়ে গ্রহণ করতে হবে|
এছাড়া গরুর মাংস রান্নার প্রক্রিয়ার ও কতটুকু খাচ্ছেন, এসবের ওপর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বা সমস্যা নির্ভর করে।
জেনে নেওয়া যাক গরুর মাংস খাওয়ার নিয়ম ও সতর্কতা-
- গরুর মাংস খাওয়ার সময় ফ্যাট বা চর্বির দিকে খেয়াল রাখতে হয়| বিশেষ করে যাদের ওজন বেশি, ফ্যাটি লিভার, কোলেস্টেরল-সহ নানান শারীরিক সমস্যা আছে তাদের। এক্ষেত্রে চর্বি বাদে মাংস খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কারণ, ১ আউন্স মাংসে ৩ গ্রাম ফ্যাট ও ৫৩ ক্যালরি থাকে। অধিক চর্বিহীন (লীন) মাংস হলে ১ গ্রাম ফ্যাট ও ৩৫ ক্যালরি থাকে। মাঝারি ফ্যাটযুক্ত মাংস হলে ৫ গ্রাম ফ্যাট ও ৭৫ ক্যালরি পাওয়া যায়। আর উচ্চ চর্বিযুক্ত মাংস হলে ৮ গ্রাম ফ্যাট ও ১০০ ক্যালরি থাকে। এখানে চর্বির পাশাপাশি ক্যালরি বেশি, যা সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
- গরুর মাংসে ভালো পরিমাণে আয়রন বা লোহা থাকে। যে কারণে এই মাংস খাওয়ার পরপরই চা, কফি পান করা ঠিক না| এতে আয়রন শোষণে বাধাগ্রস্থ হয়|
- গরুর মাংস খাওয়ার পর অনেকেই কোমল পানীয় পান করেন। এটা ঠিক না। কারণ গরুর মাংসে ফসফরাস ও সোডিয়াম থাকে, যা রক্তচাপ বাড়ায়। সঙ্গে কোমল পানীয়তে থাকা অতিরিক্ত চিনি আরও প্রভাব ফেলে। যাদের আগে থেকে উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের এই বিষয়ে সাবধান হতে হবে।
- ঈদের মধ্যে মিষ্টি খাবার থাকে। তাই অতিরিক্ত না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে দুয়েকবার মাংস খাওয়া উচিত হবে|
- প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির দিনে ৭০ থেকে ৮০ গ্রামের বেশি লাল মাংস খাওয়া উচিত না।
- গরুর মাংস প্রোটিনের ভালো উৎস। তবে প্রোটিনের চাহিদা পূরণে শুধু মাংস খাওয়া ঠিক না। খাবারে বৈচিত্র্য আনতে হবে| কারণ অতিরিক্ত প্রাণীজ প্রোটিন গ্রহণ করলে বৃক্ক, মানে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর শরীরে চর্বি জমে।
- শুধু গরুর মাংস বেশি করে না খেয়ে সঙ্গে সালাদ, সবজি যোগ করে খাওয়া উপকারী।
- মাংস হজম হতে বেশি সময় নেয়| তাই অতিরিক্ত খেলে পরিপাকতন্ত্রে প্রভাবিত হয়। যেমন পেট ফাঁপা, পেট ভারি, এমনকি দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে| এজন্য মাংস খাওয়ার সময় সালাদ, দই, বোরহানি, ক্যাপসিকাম, টামেটো খাওয়া উপকারী।
- মাংস খাওয়ার পর কুসুম গরম পানি পান করা যেতে পারে। আর সবজি দিয়ে মাংস রান্না করলে উপকারিতা বেশি|
- ভালোভাবে সিদ্ধ করে খেতে হবে গরুর মাংস| সিদ্ধ না হলে এটি সালমোনেলা এবং ই কোলি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে| তাছাড়া ভালো মতো রান্না হলে পুষ্টি শোষণ নিশ্চিত হবে না|
- গরুর মাংস দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ তাপে রান্না করলে, এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা হারায়। উচ্চ তাপে রান্না করলে ভিটামিন ‘বি’ প্রায় ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়|
- গরুর মাংসে প্রচুর পরিমাণে 'এল-কার্নিটিন' নামক পুষ্টি উপাদান থাকে। গরুর মাংস খাওয়ার পর অন্ত্রের কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া এই কার্নিটিনকে ভেঙে প্রথমে 'টিএমএ' গ্যাসে রূপান্তর করে। পরে লিভার বা যকৃৎ এটিকে 'ট্রাইমেথাইলামাইন এন-অক্সাইড' (টিএমএও) নামক মেটাবোলাইড বা ক্ষতিকর উপাদানে পরিণত করে।
- যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেল্থ’ এবং ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের অর্থায়নে করা গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে টিএমএও-এর মাত্রা বেড়ে গেলে রক্তনালীতে চর্বি বা প্লাক জমতে মারাত্মকভাবে সাহায্য করে, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এজন্য গরুর মাংস খাওয়ার নিরাপদ মাত্রা হল, সপ্তাহে সর্বোচ্চ মোট ৩৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম (রান্না করা মাংস)। অর্থাৎ, যদি সপ্তাহে ২ দিন মাংস খাওয়া হয়, তবে প্রতিবারে ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ গ্রাম পর্যন্ত খাওয়া যেতে পারে।
- কম রান্না করা মাংস ‘টক্সোপ্লাজমা গন্ডি’ নামক পরজীবী থাকতে পারে। যা স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হয়। বিশেষ করে গর্ভবতীর জন্য। গর্ভাবস্থায় এই জীবাণু মায়ের শরীরে প্রবেশ করলে তা ‘প্লাসেন্টা’ বা গর্ভফুলের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শিশুর মস্তিষ্ক ও চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, এমনকি গর্ভপাত বা মৃত শিশু জন্মের ঝুঁকি থাকে।
- গর্ভবতীর অতিরিক্ত কলিজা খাওয়া ঠিক নয়| প্রাণীর কলিজা বা যকৃতে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রায় 'রেটিনল' বা ‘প্রি-ফর্মড ভিটামিন এ’ থাকে। সাধারণ মানুষের জন্য ভিটামিন ‘এ’ উপকারী হলেও গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত রেটিনল শরীরের জমা হলে তা ‘টেরাটোজেনিক’ প্রভাব ফেলে। মানে হল, এটি গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটি, যেমন হৃদযন্ত্রের সমস্যা, ‘ক্লিফট প্যালেট’ বা ঠোঁট ও তালু কাটা এবং লিভারের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
- মাংস একেবারে অনেক রান্না করে বারে বারে গরম করে খাওয়া যাবে না| এতে পুষ্টিগুণ হারায়|

গরুর মাংস কার জন্য কতটুকু নিরাপদ?
খাদ্যতালিকায় গরুর মাংস যেমন সুস্বাদু, তেমনই পুষ্টিকর। তবে শারীরিক অবস্থা ভেদে গরুর মাংস খাওয়ার পরিমাণে ভিন্নতা আনা জরুরি। পরিমিত পরিমাণ না মেনে অতিরিক্ত মাংস খেলে, উপকারের চেয়ে শরীরের ক্ষতিই বেশি করে।
নিচে চার ধরনের শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে একটি নিরাপদ নির্দেশিকা দেওয়া হল
উচ্চ প্রোটিন চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি: গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, বাড়ন্ত শিশু-কিশোর, ক্রীড়াবিদ, বডিবিল্ডার এবং যারা অস্ত্রোপচার (সার্জারি) থেকে সুস্থ হয়ে উঠছেন, তাদের শরীরে প্রোটিনের চাহিদা বেশি থাকে। তারা দিনে গড়ে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ গ্রাম চর্বিহীন গরুর মাংস খেতে পারেন। তবে প্রোটিনের বাকি চাহিদা মেটাতে গরুর মাংসের পাশাপাশি মুরগি, মাছ, ডিম ও ডাল খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।
মেটাবলিক ও হজমের সমস্যায় আক্রান্ত রোগী: যারা ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার বা আইবিএস বা ‘ইরিটেইবল বাওয়েল সিন্ড্রোম’-এর সমস্যায় ভুগছেন, তাদের অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস এড়িয়ে চলা উচিত। লাল মাংসের চর্বি ফ্যাটি লিভার ও আইবিএস-এর সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই এই ধরনের রোগীর জন্য দৈনিক নিরাপদ সীমা হল মাত্র ৫০ থেকে ৭০ গ্রাম (মাঝারি আকারের ২-৩ টুকরো)।
হৃদরোগ ও কিডনি রোগী: স্ট্রোক, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, পিত্তথলির বা গলব্লাডারের সমস্যা অথবা প্রাথমিক ধাপের কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য গরুর মাংস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, এই ধরনের রোগীদের দৈনিক খাদ্যতালিকা থেকে গরুর মাংস বাদ দেওয়াই শ্রেয়। তবে খুব ইচ্ছে হলে চিকিৎসকের অনুমতি সাপেক্ষে সপ্তাহে বা ১৫ দিনে এক-আধবার মাত্র ৩০ থেকে ৫০ গ্রাম (১-২ টুকরো) সম্পূর্ণ চর্বিহীন মাংস খাওয়া যেতে পারে।
অতিরিক্ত ওজনসম্পন্ন ব্যক্তি: যাদের ওজন বেশি, তবে কোলেস্টেরল এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে, তাদের ওজন আরও বৃদ্ধি পাওয়া ঠেকাতে মাংসের দৃশ্যমান সাদা চর্বি সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে রান্না করতে হবে। তাদের দিনে ১ থেকে ২ টুকরোর (৩০-৪০ গ্রাম) বেশি মাংস খাওয়া ঠিক না।
বিশেষ সতর্কতা
শারীরিক অবস্থা ভেদে যেকোনো ডায়েট চার্ট তৈরির আগে একজন নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো। এছাড়া মাংস খাওয়ার স্বাস্থ্যকর কৌশল, যেমন কম তোলে ও মাঝারি আঁচে রান্না করা, রান্নার আগে লেবুর রস বা টকদই দিয়ে মেরিনেইট করা এবং মাংসের সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি ও সালাদ রাখা স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেল্থ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
আরও পড়ুন
গরমে যেমন খাবারে মিলবে স্বস্তি
কৃত্রিম মিষ্টি না খেলে যে পরিবর্তন আসে
শুধু প্রোটিন গ্রহণে ওজন কমে না