Published : 21 May 2026, 07:52 PM
চিনি এড়িয়ে চলার প্রবণতার সঙ্গে সঙ্গে এখন ‘চিনিমুক্ত’ বা ‘চিনি শূন্য’ খাবার ও পানীয় যোগ হয়েছে খাদ্য তালিকায়।
আর চিনির বদলে খাবারে স্বাদের জন্য ব্যবহার করা হয় কৃত্রিম মিষ্টি উপাদান। স্বাভাবিকভাবেই মনে করা হয় এগুলো সাধারণ চিনির তুলনায় স্বাস্থ্যকর।
তবে পুষ্টিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত কৃত্রিম মিষ্টি গ্রহণ শরীরের পাশাপাশি মানসিক অবস্থার ওপরেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বারডেম হাসপাতালের পুষ্টি বিভাগের সাবেক প্রধান ও পুষ্টি কর্মকর্তা আখতারুন নাহার আলো বলেন, “অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিয়মিত এসব উপাদান খেলে শরীরে নানান ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।”
বিশেষ করে মস্তিষ্ক, অন্ত্র ও মানসিক স্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে, বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। আমরা কী খাচ্ছি তা শুধু শরীর নয়, মনের অবস্থাকেও প্রভাবিত করে।
এই পুষ্টিবিদ বলেন, “কৃত্রিম মিষ্টি অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।”
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্রোসিডিংস অব দি ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’য়ে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিন’য়ের গবেষকদের করা পরীক্ষায় দেখা গেছে- কিছু কৃত্রিম মিষ্টি শরীরে এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে- যা বিরক্তি, অস্থিরতা বা উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
যে কারণে শরীর মিষ্টি স্বাদ পেলেও প্রত্যাশিত শক্তি পায় না। এতে মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত সংকেত পায় এবং ধীরে ধীরে মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
গবেষণাপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, কৃত্রিম মিষ্টির ব্যবহার কমালে অনেকের মধ্যে ধীরে ধীরে মানসিক স্থিরতা ফিরে আসতে পারে। কয়েক সপ্তাহ পর বিরক্তি বা অস্থিরতা কম অনুভব করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এছাড়া শরীর যখন প্রাকৃতিক খাবারের সঙ্গে বেশি অভ্যস্ত হয়, তখন মানসিক ওঠানামাও কমতে শুরু করে। অতিরিক্ত মিষ্টির প্রতি নির্ভরতা কমলে শরীরের স্বাভাবিক ক্ষুধা ও তৃপ্তির অনুভূতিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
বিষণ্নতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক
যু্ক্তরাষ্ট্রের ‘হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল’ এবং ‘ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল’-এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মহামারী সংক্রান্ত গবেষকরা, ১৪ বছর ধরে প্রায় ৩০ হাজার মধ্যবয়সি নারীর খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান, যারা প্রতিদিন কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত খাবার বা ডায়েট পানীয় গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ বেড়েছে।
‘জামা ওপেন নেটওয়ার্ক’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলে আরও জানানো হয়, কৃত্রিম মিষ্টি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু ‘সিগন্যালিং মলিকিউল’ বা হরমোনের স্বাভাবিক প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটায়, যা মানুষের মেজাজ ও মানসিক স্বাস্থ্য সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে
মনোযোগ ও মানসিক শক্তির পরিবর্তন
নিয়মিত কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত পানীয় বা খাবার খাওয়ার পর দ্রুত ক্লান্তি বা মনোযোগ কমে যাওয়ার পরিবর্তনও অনেকে দেখেন।
এই বিষয়ের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি’র ‘বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সেস’ বিভাগের বিজ্ঞানী দল গবেষণা চালিয়ে দেখতে পান, কৃত্রিম মিষ্টি ‘ডোপামিন’ হরমোন তৈরিতে বাধা দেয়, যা কোনো কাজে মনোযোগ বা ‘ফোকাস’ ধরে রাখার জন্য সবচেয়ে জরুরি উপাদান।
'নেচার সায়েন্টিফিক রিপোর্টস'-এ প্রকাশিত গবেষণায় কারণ হিসেবে বলা হয়, মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করতে স্থিতিশীল শক্তির প্রয়োজন হয়। তবে কৃত্রিম মিষ্টি শুধু স্বাদ দেয়, প্রয়োজনীয় শক্তি দেয় না।
“কৃত্রিম মিষ্টির ব্যবহার কমিয়ে বেশি প্রাকৃতিক ও সুষম খাবার খেলে মস্তিষ্কও স্থিতিশীল শক্তি পেতে শুরু করে। এতে মনোযোগ বাড়ে এবং মানসিক ক্লান্তি কমতে পারে” পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদ আলো।
মিষ্টির প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ বাড়াতে পারে
‘নেচার মেটাবলিজম’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ করা হয়- কৃত্রিম মিষ্টি বা ‘জিরো-ক্যালোরি সুগার ফ্রি’ খেলে মানুষের মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়ে যায়।
‘ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া’র ‘কেক স্কুল অব মেডিসিন’-এর বিজ্ঞানী ও পুষ্টিবিদদের করা এই গবেষণায় বলা হয়- কৃত্রিম মিষ্টি খাওয়ার ফলে মস্তিষ্কের 'হাইপোথ্যালামাস' (যা ক্ষুধা ও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে) অংশকে বিভ্রান্ত করে। মস্তিষ্ক জিভে মিষ্টির স্বাদ পেলেও বাস্তবে কোনো ক্যালোরি বা শক্তি পায় না। ফলে মস্তিষ্ক ধরে নেয় শরীর 'অনাহারে' আছে এবং তাৎক্ষণিক শক্তির জন্য তীব্র মিষ্টি খাওয়ার সংকেত পাঠাতে থাকে, যা মানুষকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চিনি খেতে প্ররোচিত করে।”
পুষ্টিবিদ আলো পরামর্শ দেন, “কৃত্রিম মিষ্টি কমালে ধীরে ধীরে স্বাদের অনুভূতিও বদলাতে শুরু করে। এতে অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা কমে।”
অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের 'সিডার্স-সিনাই মেডিকেল সেন্টার'-এর ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ড. রুচি মাথুর ও তার দল গবেষণা করে দেখিয়েছেন, কৃত্রিম মিষ্টি অন্ত্রে ক্ষতিকর ‘টক্সিন’ বা বিষাক্ত উপাদান বাড়ায় এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য কমিয়ে দেয়।
‘আইসায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেণায় আরও বলা হয়- যখনই কোনো ব্যক্তি ডায়েট সোডা বা সুগার-ফ্রি খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেন, তখন অন্ত্রের ভেতরের দেয়াল আবার শক্তিশালী হতে শুরু করে, যা রক্তে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার প্রবেশ আটকে দেয়।
আরও পড়ুন
কৃত্রিম মিষ্টি হতে পারে মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর