Published : 24 Jun 2026, 04:53 PM
একসময় ‘মিনিমালিজম’ বলতে চোখের সামনে ভেসে উঠতো পুরো ফাঁকা ঘর, সাদা দেয়াল আর কিছুটা শীতল পরিবেশ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণায় এসেছে বড় বদল।
ইন্টেরিয়রডিজাইনইন্সটিটিউট ডটকম’য়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়- অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কমিয়ে, কীভাবে ঘরের মধ্যে একটি উষ্ণ ও আমন্ত্রিত ভাব ধরে রাখা যায়, সেটিই শেখায় এই নতুন ধারা।
আর আশার কথা হল, ড্রয়িং রুম বা বসার ঘর এই আধুনিক রূপ দিতে পকেট খালি করে দামি আসবাব কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। ঘরের বর্তমান জিনিসপত্র দিয়েই খুব কম খরচে এই রূপান্তর সম্ভব।
ওয়ার্ম মিনিমালিজম আসলে কী?
সহজ কথায় এটি হল, প্রথাগত মিনিমালিজমের সরলতা এবং সাধারণ আরামের এক মিশ্রণ। যেখানে ঘরকে অতিরিক্ত আসবাব দিয়ে ঠাঁসা হবে না, আবার ঘর ফাঁকা বা প্রাণহীনও মনে হবে না।
এই বিষয়ে মার্কিন গৃহসজ্জাবিদ এবং ‘ক্যাথি কুও হোম’-এর প্রতিষ্ঠাতা ক্যাথি কুও এই ধারা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নিউ হোম সোর্স ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “ইন্টেরিয়র ডিজাইনের দুনিয়ায় এটি একটি বড় পরিবর্তন। মানুষ এখন অতিরিক্ত ছিমছাম বা খালি জায়গার চেয়ে ঘরের ভেতর একটি উষ্ণ, স্তরভিত্তিক এবং আমন্ত্রিত পরিবেশ বেশি পছন্দ করছেন।"
তিনি আরও বলেন, "এই ধারায় ঘর সাজাতে একদম সাধারণ জিনিস, যেমন- সুতি বা লিনেনের কাপড়, কম খরচে পাওয়া যায় এমন বাঁশ-বেত এবং মাটির কাছাকাছি থাকা রংয়ের শেইড ব্যবহার করা উচিত।"

রংয়ের খেলায় মাটির ছোঁয়া
ওয়ার্ম মিনিমালিজমের প্রথম শর্ত হল, রংয়ের সঠিক ব্যবহার। ঘরের দেয়াল বা সোফার কভারে পুরোপুরি সাদা বা কালোর বদলে বেছে নিতে হবে অফ-হোয়াইট, ক্রিম, বেইজ, হালকা বালু রং বা টেরাকোটা।
গৃহসজ্জাবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘টেস্টাহোমস ডটকম’য়ের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, এই রংয়ের শেইডগুলো ঘরের আলো ছড়াতে সাহায্য করে এবং চোখের জন্য বেশ আরামদায়ক।
পুরো ঘর নতুন করে রং করার বাজেট না থাকলে, কেবল একটি দেয়ালে বেইজ বা মাটির রংয়ের গঠনের ওয়ালপেপার ব্যবহার করা যেতে পারে।
কাপড় ও বুননে স্তরতা
নকশায় একঘেয়েমি থেকে বাঁচাতে ‘টেক্সচার’ জাদুর মতো কাজ করে। ড্রয়িং রুমের সোফায় সুতি বা লিনেনের কুশন কভার ব্যবহার করা যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার গৃহসজ্জা সামগ্রীর ব্র্যান্ড ‘সুজিঅ্যান্ডারসন হোম’য়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, গৃহসজ্জাকর সুজি অ্যান্ডারসন পরামর্শ দেন, “সোফার একপাশে একটি হালকা রংয়ের ‘উইন্টার থ্রো’ বা পাতলা চাদর কিছুটা কুঁচকে ফেলে রাখলে, ঘরে একটি 'লিভড-ইন' বা জীবন্ত ভাব আনে। নিচে বিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে, সাধারণ চট বা পাটের তৈরি কার্পেট।”
দেশীয় এই উপাদানগুলো খুব সস্তা অথচ ঘরে আভিজাত্য এনে দেয়।

দেশীয় ও প্রাকৃতিক উপাদানের জাদু
প্লাস্টিক বা কৃত্রিম মেটালের আসবাবের চেয়ে বাঁশ, কাঠ এবং বেতের তৈরি জিনিস ‘ওয়ার্ম মিনিমালিজমের’ মূল চাবিকাঠি।
বসার ঘরের এক কোণে, একটি বেতের মোড়া বা কাঠের ছোট ট্রাইপড টেবিল রাখা যেতে পারে। সেন্টার টেবিলে প্লাস্টিকের ফুলের বদলে মাটির তৈরি ‘আনইভেন’ বা অসমান পাত্র আলাদা ভাব আনবে।
‘ভোগ আদ্রিয়া’ ম্যাগাজিনের ওয়েবসাইটে, এই ঘরানার গৃহসজ্জার বিষয়ে মন্তব্য করতে ক্রোয়েশিয়ার ‘ক্রিয়োর্তিভা ডিজাইন স্টুডিও’র প্রতিষ্ঠাতা ও গৃহসজ্জাবিদ মাতেয়া রাইচিচ বলেন, "প্রথাগত মিনিমালিজম যদি ঘর থেকে সব বাদ দেওয়ার কথা বলে, তবে ওয়ার্ম মিনিমালিজম বলে ভারসাম্যের কথা। এটি মূলত ঘরকে এমনভাবে তৈরি করে যেখানে মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবে, অথচ ঘরের কোণে মানুষের স্পর্শ ও উপস্থিতির একটা সুন্দর অনুভূতি থাকবে।"
আলোকসজ্জায় কোমলতা
বসার ঘরে তীব্র বা কড়া সাদা আলো ব্যবহার করার পরিবর্তে বেছে নিতে হবে, উষ্ণ আলো বা ‘ওয়ার্ম লাইট’।
‘আর্কঅ্যান্ডঅ্যাম্বার ডটকম’য়ের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, লিনেন বা কাগজের ল্যাম্পশেইড দিয়ে ঢাকা ফ্লোর ল্যাম্প ঘরের কোণে মৃদু আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করে, যা নিমেষেই পরিবেশকে শান্ত ও স্নিগ্ধ করে তোলে।
‘লেস ইজ মোর’- অল্পতেই সুখী
এই বিষয়বস্তুর প্রধান মন্ত্রই হল, ঘর থেকে অপ্রয়োজনীয় শো-পিস মুক্ত করা।
জীবনযাপন-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘দ্য লাইফস্টাইলড কো’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, সুজি অ্যান্ডারসন বলেন, "ওয়ার্ম মিনিমালিজম কোনো সাময়িক ট্রেন্ড নয়। এটি হল নিজের ঘরটিকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা 'স্যাঙ্কচুয়ারি' হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি। যেখানে দিনান্তের ক্লান্তি শেষে আপনাকে দেবে শান্ত ও মানসিক প্রশান্তি।
তাই দেয়ালে অনেকগুলো ছোট ছবি না ঝুলিয়ে একটিমাত্র বড় আকারের সাধারণ আর্ট বা ক্যানভাস ঝুলিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আর ঘরের প্রাণ বাড়াতে এক কোণে রাখা যেতে পারে ‘ইনডোর প্ল্যান্ট’।

পরিশেষে
ফরাসি ডিজাইনার লাইটিং ও গৃহসজ্জা সামগ্রীর ব্র্যান্ড ‘আর্ক অ্যান্ড অ্যাম্বার’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- ওয়ার্ম মিনিমালিজম মনে করিয়ে দেয় যে, সুন্দর ঘরের জন্য বিপুল অর্থের চেয়ে নান্দনিক রুচি ও পরিচ্ছন্নতাই বেশি জরুরি।
তাই বসার ঘর থেকে অপ্রয়োজনীয় জিনিসগু সরিয়ে, কয়েকটি মাটির পাত্র আর ইনডোর প্ল্যান্টের ছোঁয়ায় পুরো ঘরকে দেওয়া যেতে পারে আধুনিক ও প্রশান্তিময় রূপ।
আরও পড়ুন
জায়গা নষ্ট না করে রান্নাঘর সাজানোর উপায়