Published : 12 Jul 2026, 05:21 PM
ভারতের প্লেব্যাক সংগীতশিল্পী এস জানকী আর নেই। শনিবার দেশটির কর্ণাটকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি।
এনডিটিভি লিখেছে, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই সুরসম্রাজ্ঞী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
পারিবারিক সূত্রে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, গত শুক্রবার রাতে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শনিবার তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
নিজের অসাধারণ কণ্ঠ আর বহুমুখী গায়কীর জন্য ‘দক্ষিণ ভারতের কোকিল’ (নাইটিঙ্গেল অব সাউথ ইন্ডিয়া) হিসেবে পরিচিত ছিলেন এস জানকী।
ছয় দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি কন্নড়, তামিল, তেলুগু এবং মালয়ালমসহ প্রায় ২০টি ভাষায় ৪৮ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন। এর মধ্যে হিন্দি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, উর্দু এবং বাংলা ভাষার গানও রয়েছে। এছাড়া ইংরেজি, জাপানি, জার্মান এবং সিংহলী ভাষাতেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
ঠাকুমার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে তার নাতনি অপ্সরা ভিদ্যুলা ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, "গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমাদের প্রিয় ঠাকুমা ও কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী শ্রীমতী এস জানকী আর আমাদের মাঝে নেই। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই তিনি শান্তিতে বিদায় নিয়েছেন। আমাদের হৃদয় আজ ভারাক্রান্ত, তবে একই সঙ্গে তিনি যে অসাধারণ জীবন কাটিয়েছেন এবং তার কালজয়ী সংগীতের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের মুখে যে অনাবিল আনন্দ ফুটিয়ে তুলেছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ।"
তিনি আরও লিখেছেন, "বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন একটি আইকনিক কণ্ঠস্বর, যার গান বহু স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে। আর আমাদের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্নেহময়ী ঠাকুমা, যার আদর, নম্রতা, দয়া এবং করুণা আমাদের মাঝে চিরকাল থাকবে। এই কঠিন সময়ে আমরা শোকগ্রস্ত, তাই পরিবারের এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সবার কাছে আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।"
১৯৩৮ সালের ২৩ এপ্রিল অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুরের পাল্লাপাটলায় জন্ম নেওয়া জানকী শিষ্য ও ভক্তদের কাছে 'জানকী আম্মা' নামে পরিচিত ছিলেন।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে ১৯৫৭ সালে তামিল সিনেমা 'বিধিয়িন ভিলাইয়াত্তু'র মাধ্যমে তার পেশাদার সংগীত ক্যারিয়ার শুরু হয়। দক্ষিণ ভারতের সব ভাষায় গান করলেও কন্নড় ভাষার গানেই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেশি গান গেয়েছেন তিনি। কর্ণাটকের ভক্তরা তাকে ভালোবেসে 'গান কোগিলে' (গানের কোকিল) বলে ডাকতেন।
সংগীতে অবদানের জন্য জানকী ৪ বার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং বিভিন্ন রাজ্য থেকে ৩৩ বার শ্রেষ্ঠ গায়িকার পুরস্কার পেয়েছেন।
এছাড়া মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট, তামিলনাড়ু সরকারের কাছ থেকে 'কালাইমামানি' এবং কর্ণাটক সরকারের কাছ থেকে 'রাজ্যোৎসব প্রশস্তি' পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
তবে ২০১৩ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'পদ্মভূষণ' নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তিনি। সে সময় তার অনুযোগ ছিল, দীর্ঘ সংগীতজীবনের তুলনায় এই স্বীকৃতি অনেক দেরিতে এসেছে। তিনি মনে করতেন, তার অবদানের জন্য দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'ভারতরত্ন' পাওয়ার কথা ছিল তার।
১৯৯৭ সালে স্বামী ভি রামপ্রসাদের মৃত্যুর পর থেকে সবসময় সাদা শাড়ি আর সাদামাটা জীবনযাপনেই অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। এটিই দীর্ঘ সময় ধরে তার নিজস্ব স্টাইল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি তার ছেলে মুরলী কৃষ্ণ মারা যান।
তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রজনীকান্ত, কমল হাসান, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়সহ ভারতের চলচ্চিত্র ও সংগীতজগতের তারকারা।
এই শিল্পীর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার। এক্স এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক শোকবার্তায় তিনি লিখেছেন, "জানকী আম্মার স্বর্ণালী কণ্ঠ কোটি মানুষের হৃদয়ে ও ঘরে জায়গা করে নিয়েছিল। এই বহুভাষী সংগীত তারকার বিদায়ে সুরের ভুবন স্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি বহু নতুন শিল্পীকে তৈরি করেছেন এবং নিজেই ছিলেন সরলতার প্রতীক। জানকী আম্মার অতুলনীয় কণ্ঠ কর্ণাটকের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।"
মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, এই সংগীতশিল্পীর শেষকৃত্য পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শেষকৃত্যে কর্ণাটক সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য মন্ত্রী ইয়াথিন্দ্র সিদ্দারামাইয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহীশূরের কানিয়ানাহুন্দি গ্রামের একটি খামারবাড়িতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে এবং সেখানে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শেষকৃত্যের সময় নির্ধারণ করবে তার পরিবার।