Published : 17 May 2026, 11:54 AM
সৌরজগতের বৃহত্তম ধাতব গ্রহাণুর অভিমুখে যাত্রার পথে মঙ্গল গ্রহের খুব কাছ দিয়ে উড়ে গেছে নাসার সাইকি প্রোব বা মহাকাশযান।
রয়টার্স লিখেছে, গ্রহাণুটিকে প্রাচীন আদি-গ্রহের অবশিষ্টাংশ বা উন্মুক্ত কেন্দ্রস্থল বলে ধারণা করা হয়। মঙ্গল গ্রহের মহাকর্ষীয় শক্তি বা টানকে কাজে লাগিয়ে নিজের গতি বাড়াতে ও চূড়ান্ত কক্ষপথে প্রবেশ করতেই মহাকাশযানটির এই নিখুঁত পরিকল্পনা।
২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রায় ২২০ কোটি মাইলের এক দীর্ঘ যাত্রার উদ্দেশ্যে এ সাইকি উৎক্ষেপিত হয়েছিল। মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যবর্তী প্রধান গ্রহাণু বেল্টের বাইরের প্রান্তে অবস্থিত এ ধাতব গ্রহাণুটিতে পৌঁছাতে যানটির আরও প্রায় তিন বছর সময় লাগবে।
নাসার তথ্য অনুসারে, শুক্রবার মহাকাশযানটি প্রতি ঘণ্টায় ১৯ হাজার ৮৪৮ কিলোমিটার গতিতে মঙ্গল গ্রহের কেবল সাড়ে চার হাজার কিলোমিটারের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে।
লাল গ্রহটির এ মহাকর্ষীয় টানকে কাজে লাগিয়ে গতি বাড়ানো ও পথ পরিবর্তন করার বিষয়টিকে মহাকাশবিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্লিং শট’ বা গুলতি বলে।
সাইকি মহাকাশযানের পুরো উৎক্ষেপণ পরিকল্পনায় এ মঙ্গলের ‘স্লিং শট’ ব্যবহারের বিষয়টি আগে থেকেই যোগ ছিল। এর মূল উদ্দেশ্য, যানটির সোলার-ইলেকট্রিক আয়ন থ্রাস্টার সিস্টেমে থাকা জেনন গ্যাস প্রোপেল্যান্ট বা জ্বালানি সাশ্রয় করা।
এই প্রথমবার কোনো আন্তঃগ্রহ মহাকাশ অভিযানে এ বিশেষ জ্বালানি ব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছে।
মঙ্গল গ্রহের এ পাসিং বা কাছ দিয়ে যাওয়ার ঘটনাটিকে কেবল গতি বাড়ানোর কাজে নয়, বরং সাইকি মহাকাশযানের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা পরীক্ষা ও সেগুলোর সঠিক মান নির্ধারণের দারুণ এক সুযোগ হিসেবে দেখছে এর অপারেশন টিম। যার মধ্যে রয়েছে বিশেষ কিছু ক্যামেরা, যা আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করে মহাজাগতিক বস্তুর ছবি তুলতে পারে।
এ ‘স্লিং শট’ প্রক্রিয়ার ঠিক আগে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছে অবস্থিত নাসার ‘জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি’ বা জেপিএলের সাইকি মিশন প্ল্যানিং প্রধান সারাহ বায়ারস্টো বলেছেন, “আমরা এই ফ্লাইবাই বা পাশ দিয়ে যাওয়ার জন্য ঠিক নিখুঁত লক্ষ্যেই এগোচ্ছি।”
সাইকি অভিযানের খুঁটিনাটি
ছোট এক ভ্যান আকারের এই সাইকি মহাকাশযানটি ২০২৯ সালের অগাস্টে তার গন্তব্যে পৌঁছাবে। সেখানে পৌঁছে টানা ২৬ মাস গ্রহাণুটিকে প্রদক্ষিণ এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে এর মাধ্যাকর্ষণ, চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও উপাদান পরীক্ষা করবে।
এরপর ২০৩১ সালে মিশন শেষ করার আগে যানটি গ্রহাণুটির আরও কাছে গিয়ে সর্পিল গতিতে ঘুরতে থাকবে। কোনো মহাকাশযানের মাধ্যমে এত কাছ থেকে পরীক্ষা করার জন্য সাইকি’ই প্রথম।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ গ্রহাণুটির সিংহভাগই লোহা, নিকেল, সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতে তৈরি, যার কাল্পনিক আর্থিক মূল্য ধরা হয় প্রায় ১০ কোয়াড্রিলিয়ন বা ১০ হাজার লাখ কোটি ডলার।
তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলেছেন, এ অভিযানের সঙ্গে মহাকাশ খনির কোনো সম্পর্ক নেই। এর মূল উদ্দেশ্য কেবল পৃথিবী ও অন্যান্য পাথুরে গ্রহের গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানা, যেগুলোর কেন্দ্রে গলিত ধাতু রয়েছে। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলটি এত বেশি গভীর ও উত্তপ্ত যে সেখানে সরাসরি পরীক্ষা চালানো মানুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়।
১৮৫২ সালে আবিষ্কৃত এ গ্রহাণুটির নামকরণ করা হয়েছে গ্রিক পুরাণের আত্মার দেবী ‘সাইকি’র নামানুসারে। পৃথিবী থেকে রেডার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত যে নয়টি ধাতব গ্রহাণুর সন্ধান মিলেছে সাইকি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
ধারণা করা হয়, গ্রহাণুটি লোহা ও নিকেলের মতো ধাতু এবং কিছু পাথুরে উপাদানের মিশ্রণে গঠিত। তবে নাসার এ মহাকাশযানটি প্রথম ছবি পাঠানোর আগ পর্যন্ত সাইকি দেখতে কেমন তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা কেবল অনুমানই করতে পারবেন।
এ গ্রহাণুটির উৎস নিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা, সৌরজগতের একদম শুরুর দিকে অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষের ফলে সদ্যজাত এক গ্রহ ধ্বংস হয়ে যায়। সাইকি হচ্ছে সেই আদি-গ্রহের এক সময়কার গলিত ও বহু বছর ধরে জমে হিমায়িত হয়ে থাকা ভেতরের কেন্দ্রস্থল বা মূল অংশ।
গ্রহাণুটি অনেক বড়। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দূরত্ব প্রায় ২৭৯ কিলোমিটার, যা সাধারণ কোনো মহাকাশের পাথরের চেয়ে অনেক বড়। পৃথিবী সূর্য থেকে যত দূরে আছে এ গ্রহাণুটি সূর্য থেকে তার চেয়েও তিন গুণ দূরে অবস্থিত। ফলে গ্রহাণুটি পৃথিবীর খুব কাছাকাছি কখনোই আসে না।