Published : 13 Jul 2026, 11:36 AM
গোটা বিশ্ব এখন ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির ওপর ভর করে চললেও অদ্ভুত সব কারণে এর গতি ব্যাহত হতে পারে, যেখানে ব্যবহারকারীর দুপুরের দুমঠো খাবারও হয়ে উঠতে পারে এর শত্রু।
ঘরের মোটা দেয়াল বা দূরত্ব ওয়াই-ফাইয়ের গতি কমিয়ে দেয় তা সবারই জানা। তবে দুপুরের গরম-গরম খাবার, ঘরের শখের অ্যাকোয়ারিয়াম বা দেয়ালে ঝোলানো আয়নাও যে ইন্টারনেটের গতি গিলে খেতে পারে তা হয়ত অনেকেরই অজানা।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক অ্যালেক্স হিলস হলেন এমন ক্ষেত্রের একজন অগ্রগামী মানুষ, যিনি পৃথিবীর বুকে যারা প্রথম ওয়াই-ফাই সংযোগের নানা সমস্যার মুখে পড়েছিলেন এবং তা সমাধানের লড়াই করেছিলেন তাদেরই একজন।
১৯৯৩ সালে হিলস একটি দলের নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বের প্রথম বড় আকারের ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কগুলোর একটি তৈরি করেছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
অধ্যাপক হিলস তার লেখা ‘ওয়াই-ফাই অ্যান্ড দ্য ব্যাড বয়েজ অফ রেডিও’ বইয়ে সেই অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন। তবে এখানে ‘ব্যাড বয়েজ’ বলতে তিনি তার ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞদের দলটিকে বোঝাননি, বরং বুঝিয়েছেন ওয়াই-ফাইয়ের মসৃণ গতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ানো বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দেওয়া নাম।
ঘরের ভেতরেও এমন কিছু ‘ব্যাড বয়েজ’ বা বাধা লুকিয়ে থাকতে পারে, যা ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট ব্যবহারের আনন্দ মাটি করতে সদা প্রস্তুত। যার মধ্যে মোটা দেয়ালের মতো কিছু চেনা বাধা যেমন আছে, তেমনই আছে বেশ কিছু অদ্ভুত কারণও। এসব বাধা চিহ্নিত করতে পারলে ব্যবহারকারীর হয়ত নিজের ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, যা গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিটি নিয়ে আপনার ভাবনাই বদলে দেবে।
মাইক্রোওয়েভ ওভেন
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এক রহস্যময় রেডিও সিগনাল অস্ট্রেলিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের রীতিমতো বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। কেউ কেউ এর জন্য সৌর শিখাকে দায়ী করেছিলেন, আবার সাধারণ মানুষ সন্দেহ করেছিল এলিয়েন বা ভিনগ্রহের বাসিন্দাদের।
অবশেষে জানা গেল আসল অপরাধী আসলে খুবই চেনা এক যন্ত্র। তাদের ব্যবহৃত শক্তিশালী টেলিস্কোপটি আসলে দুপুরের খাবারের সময় অফিসের মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকে নির্গত শক্তির ঝলকানি বা ‘বা্স্ট অফ এনার্জি’ ধরে ফেলছিল।
কেবল টেলিস্কোপই নয়, মাইক্রোওয়েভের এই উৎপাত ব্যবহারকারীর ঘরের ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ককেও ওলটপালট করে দিতে পারে।
অধিকাংশ বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তির মতোই ওয়াই-ফাই রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে। সাধারণত বিভিন্ন দেশের সরকার সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য সংরক্ষিত রাখে।
যেমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, প্লেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা এএম ও এফএম রেডিও স্টেশন। তবে এর মধ্যে কিছু ফ্রিকোয়েন্সি লাইসেন্স ছাড়াই সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক ও ব্লুটুথ ডিভাইসে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ফ্রিকোয়েন্সিগুলোর একটি হচ্ছে ২.৪ গিগাহার্টজ। কাকতালীয়ভাবে, আপনার দুপুরের খাবার গরম করার জন্য মাইক্রোওয়েভ ওভেনও ঠিক এই একই ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে।
মাইক্রোওয়েভ ওভেনে সাধারণত বিশেষ সুরক্ষামূলক আবরণ বা শিল্ড থাকে, যেন খাবার গরম করার বিভিন্ন তরঙ্গ মেশিনের ভেতরেই আটকে থাকে। তবে অধ্যাপক হিলস বলেছেন, আপনার মাইক্রোওয়েভ ওভেনটি যদি পুরানো ও জরাজীর্ণ হয় বা রান্না শেষ হওয়ার আগেই আপনি যদি এর দরজা খুলে ফেলেন তবে তা ওয়াই-ফাই সিগনালে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
“ওয়াই-ফাই সিগনালে বিঘ্ন ঘটার পেছনে মানুষের মুখে মুখে ফেরা অন্যতম প্রধান কারণ এটা।” ফ্লোরোসেন্ট বা টিউব লাইট বা গাড়ির ইগনিশন সিস্টেম থেকে নির্গত তরঙ্গের কারণেও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে।
“তবে বর্তমানে মাইক্রোওয়েভ ওভেনগুলো খুব একটা বড় সমস্যা তৈরি করে না।”
বর্তমানের ওভেনগুলো আগের চেয়ে উন্নতমানের এবং আধুনিক ওয়াই-ফাই এখন ২.৪ গিগাহার্টজের বদলে ৫ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতেও কাজ করে। তবে ঘরে পুরানো ওয়াই-ফাই সেটআপ বা বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মাইক্রোওয়েভ ওভেন থাকলে ওভেনে খাবার গরম করার ওই সামান্য সময়টুকু আপনার ইন্টারনেটের গতি থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
অ্যাকোয়ারিয়াম
কারো ঘরে যদি জলচর কোনো পোষা প্রাণী থাকে তবে তাও ওয়াই-ফাইয়ের জন্য ঝামেলার কারণ হতে পারে।
অধ্যাপক হিলস বলেছেন, “দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রেডিও সিগনাল স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে মাঝেমধ্যে এ সিগনাল এমন কিছু বস্তুর ভেতর দিয়ে যায়, যা একে আরও নিস্তেজ করে দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা একে বলি ‘শ্যাডোয়িং’।”
আসলে ওয়াই-ফাই ও পানি এ দুটি জিনিস কখনোই একসঙ্গে ভালো চলে না। অন্যান্য সমস্যার পাশাপাশি পানির বিভিন্ন অণু ছোট ছোট চুম্বকের মতো কাজ করে, যা রেডিও সিগনালের শক্তি শুষে নেয়।
ফলে ব্যবহারকারী ও রাউটারের মাঝখানে যদি কোনো মাছের ট্যাংক বা অ্যাকোয়ারিয়াম থাকে তবে তা ঘরের ওই অংশে একটি ওয়াই-ফাই ‘ডেড জোন’ বা যেখানে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না এমন জায়গা তৈরি করতে পারে।
হিলস বলেছেন, ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন ‘শ্যাডোয়িংয়ের’। আর এর জন্য কেবল মাছের ট্যাংকই দায়ী নয়।
রেডিও তরঙ্গ কাঠ বা ড্রাইভালের মতো হালকা উপাদানের তৈরি দেয়াল খুব সহজেই ভেদ করতে পারে। তবে কারো ঘরের দেয়াল যদি ইট বা কংক্রিটের মতো ঘন ও শক্ত উপাদানে তৈরি হয় তবে তা ভেদ করা সিগনালের জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
হিলসের পরামর্শ, “আপনার রাউটার ও আপনি যে ডিভাইসটি ব্যবহার করছেন তার মাঝখানের সোজা পথটির কথা চিন্তা করুন।”
সিগনাল সাধারণত ঘরের দেয়ালে বা বস্তুতে ধাক্কা খেয়ে ঘুরে অন্য পথে ব্যবহারকারীর ডিভাইসে পৌঁছাতে পারে। তবে মাঝপথে যত বেশি বাধা থাকবে সিগনাল পৌঁছানো ততটাই কঠিন হবে।
দূরত্ব কম হলে ওয়াই-ফাইয়ের জন্য কাজ করা সহজ হয়। ফলে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে রাউটারটিকে ঘরের ঠিক মাঝখানে ও যতটা সম্ভব উঁচুতে রাখা উচিত।
এতেও যদি কাজ না হয় তবে আপনি একটি ‘ওয়াই-ফাই এক্সটেন্ডার’ ব্যবহার করতে পারেন, যা সিগনালের শক্তি বাড়িয়ে দেয় বা আপনার পুরানো রাউটারটি বদলে একটি ‘মেশ নেটওয়ার্ক’ ব্যবহার করতে পারেন, যা ছোট ছোট কয়েকটি ডিভাইসের মাধ্যমে পুরো ঘরে সমানভাবে ওয়াই-ফাই ছড়িয়ে দেবে।
এভাবে নেটওয়ার্কের সমস্যাও মিটবে, আবার অ্যাকোয়ারিয়ামের নিরীহ মাছগুলোকেও বিরক্ত করতে হবে না।
আয়না
মাইক্রোওয়েভ ওভেন যেখানে ওয়াই-ফাই সিগনালে বিঘ্ন ঘটায় ও অ্যাকোয়ারিয়াম একে গিলে খায়, সেখানে আরেকটি সাধারণ সমস্যা ‘রিফ্লেকশন’ বা প্রতিফলন।
রেডিও তরঙ্গ আলোরই আরেকটি রূপ। আলো যেভাবে আয়নার মতো প্রতিফলক পৃষ্ঠে বাধা পেয়ে দিক পরিবর্তন করে বা ফিরে আসে, ওয়াই-ফাই সিগনালের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটে।
টেলিভিশনের মতো যে কোনো সমতল ও চকচকে পৃষ্ঠও একই সমস্যা তৈরি করতে পারে। ঘর তৈরির উপাদানে যদি ধাতব বা মেটালের শিট ব্যবহৃত হয় তবে এ জটিলতা দেখা দেয়।
ঘরের কোনো নির্দিষ্ট কোণায় নেটওয়ার্ক না পাওয়া গেলে রাউটার ও আপনার মাঝখানের সোজা লাইনে কোনো আয়না বা বড় টিভি আছে কি না, যা সিগনালটিকে অন্য দিকে প্রতিফলিত করে দিচ্ছে তা একটু খতিয়ে দেখুন।
এ ক্ষেত্রে ঘরের ওই প্রতিফলক বিভিন্ন বস্তুর জায়গা পরিবর্তন করার কথা ভাবতে পারেন। আর যদি ঘরের সাজগোজে হাত দিতে না চান তবে এ সমস্যার সমাধানেও ওয়াই-ফাই এক্সটেন্ডার আপনাকে সাহায্য করতে পারে।
বৈরী আবহাওয়া
ওয়াই-ফাই রাউটারটি ঘরের ভেতরে থাকলে বাইরের বৃষ্টি সাধারণত ইন্টারনেটের গতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। অবশ্য যদি আপনি খোলা জায়গার ওপারে থাকা অন্য কোনো ভবনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার না করেন। তবে আবহাওয়া চরম রূপ নিলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে।
ভারী তুষারপাত একটি বাড়ি, পুরো এলাকা বা গোটা শহরের ইন্টারনেট অবকাঠামোকে অচল করে দিতে পারে তা তীব্র ঠান্ডায় কেবলের ভেতরের ধাতব তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেই হোক বা স্যাটেলাইট ডিশের ওপর তুষার জমে সিগনাল আটকে যাওয়ার কারণেই হোক না কেন।
তীব্র গরম বা তাপদাহের ফলেও একই ধরনের যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিতে পারে। আর আবহাওয়া সরাসরি কোনো সমস্যা না করলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঘরের সবাই যখন একসঙ্গে আটকে থেকে ইউটিউবে ভিডিও দেখা শুরু করেন তখন স্বভাবতই নেটওয়ার্কের গতি ধীর হয়ে যায়।
এর মানে দাঁড়ায়, জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি পরোক্ষ শিকার হতে পারে ইন্টারনেটের গতি। তবে এর সমাধান কী? পৃথিবীর সুরক্ষায় নিজের দায়িত্বটুকু পালনের পাশাপাশি এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে আগাম ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য টেলিকম কোম্পানি ও স্থানীয় প্রশাসনকে তাগিদ দিতে পারেন।
ওয়াই-ফাইয়ের অন্যতম রূপকার অ্যালেক্স হিলসের কথা ধরা যাক। তিনি এখন আলাস্কাতে বসবাস করছেন, যেখানে তিনি নিজের কর্মজীবনের বড় অংশ ব্যয় করেছেন শহর ও গ্রামগুলোকে ইন্টারনেটের আওতায় নিয়ে আসার কাজে।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা বর্তমানে এ ধরনের কাজ সহজ করে দিয়েছে সত্যি। তবে এর নিজস্ব কিছু ‘ব্যাড বয়েজ’ বা যান্ত্রিক বাধাও রয়েছে।