Published : 12 Jul 2026, 04:09 PM
কেবল ৩০ পাউন্ড বা সাড়ে চার হাজার টাকায় চোখের সামনে তাৎক্ষণিক ভাষা অনুবাদের এক অভিনব ডিভাইস তৈরি করেছেন যুক্তরাজ্যের এক শিক্ষার্থী।
সাধারণ চশমার সঙ্গে সহজে ব্যবহারযোগ্য এ ডিভাইসটি কথাকে টেক্সটে রূপান্তর করে সাবটাইটেলের মতো চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে, যা ভাষা ও শ্রবণের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ভূমিকা রাখবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটি অফ প্লেমাথ’-এর ‘ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিভাগের শিক্ষার্থী ২২ বছর বয়সী মিলইয়া মোহাম্মাদ আশরাফ নিজের ডিগ্রির অংশ হিসেবে দীর্ঘ ছয় মাস চেষ্টার পর এ বিশেষ ডিজাইনটি তৈরি করেছেন।
মিলইয়া বলেছেন, ডিভাইসটি তৈরি করতে খরচ পড়েছে কেবল ৩০ পাউন্ডের মতো, যা মানুষের মুখের কথাকে প্রথমে টেক্সট বা লেখায় রূপান্তর করে। এরপর চশমার ফ্রেমে আটকে থাকা একটি ছোট ইলেকট্রনিক বক্সের সাহায্যে সেই লেখাটিকে চোখের সামনে থাকা এক ছোট্ট স্ক্রিনে দেখায়।
সাশ্রয়ী ও পুনরায় ব্যবহারযোগ্য উপাদান দিয়ে তৈরি করায় বাজারে থাকা এ ধরনের অন্যান্য প্রযুক্তির চেয়ে ডিভাইসটি সাশ্রয়ী। যোগাযোগের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে মানুষকে সাহায্য করাই এ উদ্ভাবনের মূল উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেছেন মিলইয়া।
নিজের এ কাজের পেছনের গল্প তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার এ প্রজেক্টের পেছনের মূল অনুপ্রেরণা এসেছে আমার ছোটবেলা থেকে। আমি বহু ভাষা রয়েছে এমন পরিবেশে বড় হয়েছি এবং সবসময়ই দেখা যেত যে, বাকিরা কী বলছে তা ঠিকঠাক বুঝতে পারছি না।
“ভাষাগত বাধা বা উচ্চারণের ভিন্নতার কারণে পারস্পরিক যোগাযোগ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে বাজারে যেসব অনুবাদের টুল রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ফোন, অডিও প্লেব্যাক বা দামি স্মার্ট চশমার ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হয় স্বাভাবিক আলাপে ব্যাঘাত ঘটায়, না হয় অতিরিক্ত দামের কারণে সবার পক্ষে কেনা সম্ভব হয় না।”
নিজের উদ্ভাবিত ডিভাইসের কার্যকারিতা নিয়ে মিলইয়া বলেছেন, সাধারণ চশমার সঙ্গেই সহজে জুড়ে দেওয়া যায় এই ডিভাইস। ‘অন্যান্য স্মার্ট চশমার মতো এতে অতিরিক্ত কোনো ফিচার রাখা হয়নি। কারণ, স্মার্ট চশমার আকাশচুম্বী দাম হয়’।
ডিভাইসটির কাজের পদ্ধতি
চশমায় থাকা ছোট মাইক্রোফোনের মাধ্যমে ডিভাইসটি প্রথমে আশপাশের কথা রেকর্ড করে। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলের সাহায্যে সেই কথাকে রিয়াল-টাইমে অনুবাদ করে লিখিত টেক্সট হিসেবে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে।
অনূদিত এ টেক্সট বা লেখাটি এরপর ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি মাইক্রোকন্ট্রোলারে পাঠানো হয়। এ মাইক্রোকন্ট্রোলার সম্পর্কে মিলইয়া বলেছেন, এটা ‘এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে সিগনাল বা বার্তা পাঠায়’।
কন্ট্রোলারটির কার্যপ্রণালী বর্ণনা করে মিলইয়া বলেছেন, ডিভাইসটি আসলে ‘এক ধরনের ছোট কম্পিউটার, আর এভাবেই ভাষাটি শনাক্ত ও অনুবাদ করা সম্ভব হয়’।
এরপর লেখাটি একটি আয়না, লেন্স ও রিফ্লেক্টরের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে ব্যবহারকারীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে, যা দেখতে ঠিক সিনেমার সাবটাইটেলের মতো মনে হয়।
মিলইয়া বলেছেন, ডিভাইসটিকে সুনির্দিষ্ট কোনো ভাষার জন্য প্রোগ্রাম বা সেট করে নেওয়া হলে তা আরও নিখুঁতভাবে কাজ করে। তবে ডিভাইসটি যে কেবল বিদেশি ভাষা বোঝার জন্যই উপকারী এমনটা নয়।
এর বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে মিলইয়া বলেছেন, “অনুবাদের পাশাপাশি ডিভাইসটি নিখুঁতভাবে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে। ফলে যারা কানে কম শোনেন, তারা এ ডিভাইসের মাধ্যমে চোখের সামনে সাবটাইটেল দেখার সুবিধা পাবেন।”
নিজের ভবিষ্যৎ ভাবনা ও প্রযুক্তিগত দর্শন নিয়ে মিলইয়া বলেছেন, সহজলভ্য ও প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে তিনি “ভীষণ আগ্রহী”।
“আমি এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে চাই, যা মানুষের সত্যিই উপকারে আসবে।”
যারা নতুন ডিজাইন বা উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন তাদের উদ্দেশে মিলইয়া বলেছেন, “আমি বলব, কোনো কিছু না জানলেও এখনই কাজ শুরু করে দিন। কেবল একটি কাগজের টুকরো নিন এবং মনে যা আসছে তা লিখে ফেলুন, হোক না সেটা কেবল মাথা থেকে চিন্তাগুলো বের করে আনার একটা সাধারণ পরিকল্পনা। একসময় দেখবেন সবকিছু ঠিকঠাক মতোই মিলে যাচ্ছে।”