Published : 15 Jul 2026, 01:51 AM
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে দিনভর বিভিন্ন স্থানে সড়ক আটকে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি, এমনকি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠলেও কোনো সমাধান আসেনি।
আন্দোলনকারীদের দাবির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সরকার জানিয়ে দিয়েছে, বন্যাকবলিত চট্টগ্রাম বিভাগ বাদে অন্যান্য জেলায় পরীক্ষা অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, বুধবারের পরীক্ষা স্থগিত নাহলে তারা সচিবালয় অভিমুখে ‘লং মার্চ’ করবে।
পরীক্ষা পেছানোর এ দাবি উঠেছে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বন্যা হওয়ার কারণে।
মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে ফেইসবুকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, “চট্রগ্রাম বোর্ড ছাড়া দেশের সব বোর্ডের কেন্দ্রগুলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য উপযোগী।”
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি— এই পাঁচ জেলায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে বুধবারের পরীক্ষা নিয়ে মঙ্গলবার রাত ১১টা পর্যন্ত নতুন করে কোনো ঘোষণা দেয়নি শিক্ষা বোর্ডগুলোর মোর্চা আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।
তবে মঙ্গলবার কমিটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, যেখানে পরীক্ষা নিয়ে মূলত সরকারের সিদ্ধান্তই তুলে ধরা হয়।
রাতে পরীক্ষার বিষয়ে জানতে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
টেলিফোনে সাড়া দেননি শিক্ষা বোর্ডগুলো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের মোর্চা আন্তশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তসলিমা বানুও।
বুধবার চট্টগ্রাম ছাড়া নয়টি সাধারণ বোর্ডের অধীনে এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা হবে।
এদিন চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা ছাড়া অন্যান্য জেলায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিমে আরবি দ্বিতীয় পত্র এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি বিএমটির ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ১ ও ২, ভোকেশনালের উচ্চতর গণিত ১ ও ২ এবং ডিপ্লোমা ইন কমার্সের উচ্চতর হিসাব বিজ্ঞান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে।
গত ২ জুলাই থেকে সারাদেশে ২ হাজার ৬৯৭টি পরীক্ষা কেন্দ্রে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থীর।

কেন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
সোমবার ছিল এইচএসসি ও সমমানে ষষ্ঠ দিনের পরীক্ষা। বৈরী আবহাওয়া ও বন্যার কারণে গত ৮ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম বিভাগ ও এ বোর্ডের জেলাগুলোতে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত আছে, যা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
রোববার দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারি বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে সোমবারের এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র পরীক্ষা স্থগিতের দাবি ওঠে।
তবে চট্টগ্রাম বোর্ডে ও এ বিভাগ ছাড়া সোমবার অন্যান্য এলাকায় পরীক্ষা চালিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয় শিক্ষা বোর্ডগুলো। ভারি বর্ষণ চলে সোমবার বিকাল পর্যন্ত। ফলে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ আসে।
এরমধ্যেই সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ঘিরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়ে।
ওই অডিওতে একটি নারী ও একটি পুরুষ কণ্ঠের মধ্যে কথা হচ্ছিল।
এক পর্যায়ে পুরুষ কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, “আমি এভাবে মিটিংয়ে বলতেছিলাম যে, এরা তো ফার্মের মুরগি, কিন্তু মাথায় বৃষ্টি পড়লেই জ্বর আসে, আমার মেয়ের তাই হয়। তো আমি বললাম যে, দৌড়-লাফ ঝাঁপ দিয়ে পরীক্ষা দিতে যাবে, বৃষ্টির মধ্যে মাথায় পানি পড়বে, পরের দিন ঠিকঠাক পরীক্ষা দিতে পারবে না। তারপরে আবার ওয়েদার ফরকাস্ট সেন্টারে ডিজিকে কল করল। তারা বলল যে কাল বৃষ্টি হবে না, আজকে রাতেই শেষ।”
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ওই পুরুষ কণ্ঠটি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক আটকে বিক্ষোভ
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ, পরীক্ষা স্থগিত করা এবং সোমবারের পরীক্ষায় বসতে না পারা পরীক্ষার্থীদের ফের সুযোগ দাবিতে মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানী ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি, জয়পুরহাট, বরিশাল, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক আটকে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
বেলা পৌনে ১২টা থেকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব ও উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনের সড়ক আটকে বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। পরে দুপুরে তারা ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল গেইটের সামনে পুলিশ শিক্ষার্থীদের আটকে দেন। এসময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করে।
মুহসীন হলের সামনে বাধা পেয়ে দুপুর ১টার দিকে নীলক্ষেত মোড়ে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। পরে দুপুর পৌনে ২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা পলাশী মোড় হয়ে শিক্ষা বোর্ডের দিকে রওনা হন।
দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেন পরীক্ষার্থীরা।
তখন পরীক্ষার্থীদের শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা আলোচনার প্রস্তাব দিলেও তারা তা না করে ফের সায়েন্স ল্যাবে চলে যান। বিকাল পৌনে চারটা থেকে দেড় ঘণ্টা তারা সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অবস্থান করেন। পাঁচটা বিশ মিনিটে তারা সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় ছেড়ে সংসদের দিকে রওনা হন। তারা প্রথমে ঢাকা বোর্ডের দিকে যাওয়ার কথা বললেও পরে সংসদ ভবনের দিকে যান।
এদিকে উত্তরা বিএনএস সেন্টারের সামনে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীরা বুধবার সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করে বিকাল সোয় ৩টার দিকে সড়ক ছেড়ে দেন।
এদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছে মানিক মিয়া এভিনিউ সংলগ্ন বটতলার গেইটে অবস্থান নেন। পরে তারা মানিক মিয়া এভিনিউয়ের দুই পাশেই অবরোধ করেন।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পুলিশ আন্দোলনরতদের সংসদ ভবনের সামনে থেকে লাঠিপেটা করে সরিয়ে দেয়। এদিকে আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল সংসদের ভেতরে প্রবেশ করলেও তাদের সঙ্গে সরকারের কোনো আলোচনা হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাত সোয়া ৮টার দিকে ফের জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে জড়ো হয়। এরপর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গেলে তাদের আটকে দেওয়া হয়। রাত ৯টা চল্লিশ মিনিটের পর তারা অ্যাভিনিউ ত্যাগ করলে সড়কটিতে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
দিনভর আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ‘তুমি কে, আমি কে, ফার্মের মুরগি’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে, শিক্ষামন্ত্রী’, ‘দফা এক, দাবি এক, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’, ‘জ্বালো রে জ্বালো আগুন জ্বালো’ স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ
পরীক্ষার্থীদের ফার্মের মুরগির সঙ্গে তুলনা করায় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামার পর জাতীয় সংসদে ওই বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
বিকালে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি বলেন, “আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য, সেটি নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। সেই ব্যাপারেও বলতে চাই, আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলি নাই। যদি কেউ আহত হয়ে থাকে, সিম্পলি আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।”
ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রে প্রয়োজনে আবার পরীক্ষা
বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে এইচএসসির কোনো কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে না পারলে জরিপের ভিত্তিতে সেখানে আবার পরীক্ষা নেওয়া হতে পারে বলে প্রতিশ্রুতি দেন শিক্ষামন্ত্রী।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছেড়ে পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি সংসদে বলেন, “যেসব কেন্দ্রে ভুলত্রুটি হয়েছে, সেখানে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রয়েছে।”
ভুল প্রশ্নে চার শিক্ষককে শোকজ
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পদার্থ বিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্রের প্রশ্নে ‘ত্রুটি ও অসঙ্গতির’ ঘটনায় চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।
বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন বলছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মঙ্গলবার তাদের ওই নোটিস দেওয়া হয়েছে।
ওই চার শিক্ষক হলেন- শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান, বৃন্দাবন সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক কাজী জুনায়েদ আল আমিন, এমসি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোছাদ্দেক হোসেন খান এবং সিলেট সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
বুধবার 'লংমার্চ টু সচিবালয়'
বুধবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত করা না হলে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ করার ঘোষণা দিয়ে মানিক মিয়া এভিনিউ ছাড়েন আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীরা।
রাত সাড়ে ৯টায় এক তাৎক্ষণিক ব্রিফিংয়ে এদিনের মত আন্দোলনের ইতি টানার ঘোষণা দেন ঢাকা সিটি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মিরাজ।
তিনি বলেন, "আমাদের দাবিগুলো আমরা আজকে দেখেছি মেনে নেওয়া হয়নি। আমাদের মূল দাবিগুলোর কিছুই মেনে নেওয়া হয়নি। আমরা বুধবারের পরীক্ষা স্থগিত চাই আজকে রাতের মধ্যেই।
"একইসঙ্গে আমরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাচ্ছি। কারণ আমরা শিক্ষার্থী বান্ধব একজন শিক্ষামন্ত্রী চাচ্ছি। আমাদের দাবি যদি মেনে নেওয়া না হয়, আমাদের যদি বুধবারের পরীক্ষায় বসতে হয় তাহলে আমরা 'লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়' পালনের ঘোষণা দিলাম।"
আরো পড়ুন