Published : 13 Jul 2026, 10:08 AM
লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও মোহাম্মদ সালাহ বিগত দুটি দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এবারের বিশ্বকাপ মেসি, রোনালদো ও সালাহর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এ মাহেন্দ্রক্ষণেই তারা মাঠের বাইরের ভবিষ্যতের জন্যও নিজেদের প্রস্তুত করছেন।
খেলার মাঠের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে এবার ব্যবসার মাঠেও একে অপরকে টেক্কা দিচ্ছেন মেসি ও রোনালদো। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে সিলিকন ভ্যালির এআই স্টার্টআপ বা আধুনিক হেলথ-টেকনোলজির ব্যবসায় বিপুল বিনিয়োগ করছেন এ দুই তারকা।
প্রযুক্তি সাইট ওয়্যার্ড প্রতিবেদনে লিখেছে, ফুটবল বিশ্বের এ তারকারা যখন স্পনসরশিপের চেয়ে টেক পোর্টফোলিও বা কোম্পানির অংশীদারিত্বকে নিজেদের ভবিষ্যৎ বানাচ্ছেন তখন মোহাম্মদ সালাহ হাঁটছেন রিয়াল এস্টেট ও চেনা বিজ্ঞাপনী চুক্তির একদমই ভিন্ন এক পথে।
মঙ্গলবার টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ম্যাচে সালাহর মিসরের মুখোমুখি হয়েছিল মেসির আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের আগে সালাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মেসি ও রোনালদোর এই সোনালী প্রজন্ম থেকে ক্যারিয়ারের শেষ একটি ম্যাচ বা ‘লাস্ট ড্যান্স’-এর জন্য তিনি কাকে বেছে নেবেন?
সালাহ কোনো দ্বিধা ছাড়াই মেসির নাম নিয়েছিলেন। সালাহর এ জবাবটি আলাদা গুরুত্ব বহন করছে, কারণ পর্তুগাল শেষ ষোলোর ম্যাচে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার আগেই রোনালদো নিশ্চিত করেছিলেন, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। এর মাধ্যমেই রোনালদোর ছয়টি বিশ্বকাপ খেলার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতি ঘটল।
তবে ফুটবলের বাইরে এ তারকাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখন ভিন্ন ভিন্ন দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে। মেসি ও রোনালদো ইদানীং বিভিন্ন স্টার্টআপ কোম্পানি, ইকুইটি স্টেক বা শেয়ার বা মালিকানা এবং হেলথ-টেক বা স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি খাতের ব্যবসায় বেশি ঝুঁকছেন।
অন্যদিকে সালাহ এখনও প্রচলিত বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনী চুক্তি, আবাসন ব্যবসা ও দাতব্য কাজের মধ্যেই নিজের কার্যক্রম সীমিত রেখেছেন।
গত এক দশকে এ প্রবণতা আরও বেড়েছে। কারণ বিভিন্ন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম ও স্টার্টআপ এখন এমন সব তারকা বিনিয়োগকারী খুঁজছে যারা কেবল অর্থই দেবেন না, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু নিয়ে আসবেন। শত কোটি অনুসারী বা ফলোয়ার থাকা একজন ফুটবলার কোনো কোম্পানিকে যে বৈশ্বিক পরিচিতি, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রচার এনে দিতে পারেন তা সাধারণ কোনো বিনিয়োগকারীর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।
দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ‘আর্চার্স ভ্যালুয়েশন অ্যান্ড অ্যাডভাইজরি’র পার্টনার কামরান খান বলেছেন, “প্রচলিত স্পনসরশিপ বা বিজ্ঞাপনী চুক্তি থেকে সরে এসে স্টার্টআপে মালিকানা বা শেয়ার নেওয়ার এ প্রবণতাটি খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ তৈরি এবং খেলোয়াড়ি জীবন পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তার বৃহত্তর এক প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করছে।”
গত এক দশকে বিশ্বসেরা অ্যাথলেটরা এককালীন বিজ্ঞাপনী ফি নেওয়ার চেয়ে বিভিন্ন কোম্পানির মালিকানার অংশীদার হওয়াকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তারা কেবল ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বা দূত হিসেবে না থেকে সরাসরি বিনিয়োগকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন।
২০২২ সালের অক্টোবরে ভিডিও-স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ‘ভিকি’, যা পরবর্তীতে রাকুসেন অধিগ্রহণ করে এর প্রতিষ্ঠাতা ও উদ্যোক্তা রাজমিক হোভাগিমিয়ানের সঙ্গে যৌথভাবে স্যান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক বিনিয়োগকারী কোম্পানি ‘প্লে টাইম হোল্ডকো’ চালু করেছেন মেসি। কোম্পানিটির লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট, যেখানে খেলাধুলা, মিডিয়া ও প্রযুক্তি খাতে কাজ করা কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করা হয়।
কামরান খান বলেছেন, “বিভিন্ন স্পনসরশিপ চুক্তি সাধারণত একজন অ্যাথলেটের ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে ভালো আয় এনে দেয়। তবে ইকুইটি বা শেয়ারে বিনিয়োগ করলে পরবর্তীতে পুঁজির দামবৃদ্ধি ঘটে এবং ভবিষ্যৎ লভ্যাংশ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা অবসরের পরও স্থায়ীভাবে সম্পদ ধরে রাখতে সাহায্য করে।”
প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ কোটি ডলারের তহবিল গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করা মেসির এ ‘প্লে টাইম’ বর্তমানে সিলিকন ভ্যালির কোনো বড় ভেঞ্চার ফান্ডের মতোই এক শক্তিশালী পোর্টফোলিও বা ব্যবসায়িক রূপ দাঁড় করিয়েছে।
‘প্লে টাইম’-এর ওয়েবসাইট অনুসারে, কোম্পানিটির বিনিয়োগ করা স্টার্টআপগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফিল্ডএআই’, ‘ফিশ অডিও’, ‘ওয়ার্ল্ড ল্যাবস’, ‘পারসেপট্রন’, ‘ইনট্যানজিবল’ ও ‘সুপারঅ্যানোটেট’।
পাশাপাশি ফিফা-অনুমোদিত মোবাইল গেইম ‘ম্যাচডে’ ও ক্রীড়া স্মারক বিক্রির বাজার ‘এসি মোমেন্টো’তেও বিনিয়োগ করেছে কোম্পানিটি।
প্লে টাইমের বাইরেও মেসির ব্যবসায়িক পরিধি বিস্তৃত। তিনি ফ্যান্টাসি ফুটবল প্ল্যাটফর্ম ‘সোরাব’-এর শেয়ারহোল্ডার, যা ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল প্লেয়ার কার্ড কেনাবেচার সুযোগ দেয়।
এ ছাড়া আর্জেন্টিনার সাবেক সতীর্থ সার্জিও অ্যাগুয়েরোর প্রতিষ্ঠিত ভ্যালোরেন্ট ও রকেট লিগভিত্তিক গেইমিং কোম্পানি ‘ক্রু ইস্পোর্টস’-এর মালিকানা গ্রুপেও যোগ দিয়েছেন মেসি।
ব্লকচেইনভিত্তিক ফ্যান-টোকেন প্ল্যাটফর্ম ‘সোসিওস ডটকম’-এর বৈশ্বিক দূত হিসেবে মেসির তিন বছরের ২ কোটি ডলারের চুক্তিটি একটি বিজ্ঞাপনী চুক্তি, কোনো গোপন ব্যবসায়িক পার্টনারশিপ নয়।
২০২৩ সালে ‘মেজর লিগ সকার’ বা এমএলএস দল ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার সময় মেসি নিজের বেতন ও সাইনিং বোনাসের পাশাপাশি ক্লাবটির মালিকানার একটি অংশও পান, যা এমএলএস-এর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন চুক্তি।
এ মালিকানার সঠিক পরিমাণ কত সে বিষয়ে ক্লাব বা এমএলএস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্পোর্টিকোর এক মূল্যায়নে ইন্টার মায়ামির বাজারমূল্য ধরা হয় ১৪৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২২ শতাংশ বেশি ও এমএলএস-এর ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
মেসির বিনিয়োগগুলো যেখানে সিলিকন ভ্যালির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের জোয়ারকে নির্দেশ করছে, সেখানে রোনালদোর বিনিয়োগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি। এ খাতটি ফিটনেস ও দীর্ঘায়ু নিয়ে রোনালদোর গড়ে তোলা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের সঙ্গেও দারুণভাবে মেলে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রিমিয়াম মেম্বার হিসেবে ব্যবহারের পর ২০২৪ সালের মে মাসে পরিধানযোগ্য ফিটনেস ট্র্যাকার ও স্বাস্থ্য বিশ্লেষক কোম্পানি ‘হুপ’-এ বিনিয়োগ করেছেন রোনালদো।
হুপ নিজেই বিষয়টিকে ‘রোনালদোর অন্যতম সেরা বিনিয়োগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ওই সময় রোনালদো বলেছিলেন, “আমার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হুপ অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।”
সংযুক্ত আরব আমিরাতে হুপ-এর ব্যবসায়িক বিস্তৃতির পেছনে ‘কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি’ ও ‘মুবাদালা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’র মতো বড় কোম্পানির সমর্থন রয়েছে।
এদিকে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি নিয়েছেন রোনালদো। তিনি ‘হার্বালাইফ’-এর সহযোগী কোম্পানি ‘এইচবিএল প্রো-টু-কল সফটওয়্যার’-এর ১০ শতাংশ শেয়ার ৭৫ লাখ ডলারে কিনে নিয়েছেন।
এ কোম্পানিটি ‘প্রো-টু-কল’ নামের ডিজিটাল ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবা অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করছে। যার মাধ্যমে ২০১৩ সাল থেকে চলে আসা হার্বালাইফের সঙ্গে রোনালদোর পার্টনারশিপ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
এর ঠিক এক মাস পরেই হার্বালাইফ লন্ডনের এআইচালিত সাপ্লিমেন্ট কোম্পানি ‘বায়োনিক’কে ১৫ কোটি ডলারে অধিগ্রহণ করেছে। রোনালদো আগে থেকেই বায়োনিকের একজন প্রাথমিক বিনিয়োগকারী ছিলেন, যার প্রযুক্তি এখন ‘প্রো-টু-কল’-এর সঙ্গে যোগ হবে।
এক যৌথ বিবৃতিতে রোনালদো বলেছেন, “বায়োনিকের ব্যক্তিগত সাপ্লিমেন্ট প্রযুক্তি ও প্রো-টু-কল-এর সমন্বয়ে আমরা বৈশ্বিক স্তরে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে তুলছি।”
২০২৫ সালের জুনে চূড়ান্ত হওয়া এক চুক্তির মাধ্যমে সৌদি প্রো লিগের ক্লাব ‘আল-নাসর’-এর ৫ শতাংশ মালিকানা পেয়েছেন রোনালদো, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, মোহাম্মদ সালাহ হেঁটেছেন একদমই চেনা ও প্রচলিত পথে। যুক্তরাজ্যের করপোরেট নথিপত্র অনুসারে, কোনো প্রযুক্তিগত স্টার্টআপে প্রকাশ্যে বিনিয়োগ করার চেয়ে সালাহর ব্যবসায়িক আগ্রহ কমার্শিয়াল হোল্ডিং কোম্পানি ও রিয়াল এস্টেট বা আবাসন ব্যবসার মধ্যেই সীমিত।
সালাহর সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস এখনও অ্যাডিডাস, পেপসি ও ভোডাফোন ইজিপ্টের মতো ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে থাকা প্রচলিত বিজ্ঞাপনী চুক্তি। এ ছাড়া তিনি ‘মোহাম্মদ সালাহ চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন।
কামরান খান বলেছেন, “স্টার্টআপ, রিয়াল এস্টেট বা ব্যক্তিগত ব্যবসা-বিনিয়োগ যেখানেই হোক না কেন, মূলধন খাটানোর আগে এর স্বাধীন মূল্যায়ন ও সঠিক যাচাই-বাছাই করা জরুরি, যাতে ব্যবসার সুযোগ ও ঝুঁকি দুটিই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।”
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি, হেলথ প্ল্যাটফর্ম বা আবাসন ব্যবসা খাত যা-ই হোক না কেন ফুটবল বিশ্বের এই তারকারা এখন নিজেদের খেলোয়াড়ি জীবনের পরের সময়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। নিজেদের অর্জিত সম্পদের ব্যবস্থাপনায় অ্যাথলেটদের নিয়ন্ত্রণ যত বাড়ছে স্পনসরশিপের চেয়ে ‘ইকুইটি’ বা কোম্পানির অংশীদারিত্বই খেলাধুলার জগতের সবচেয়ে চতুর ও বুদ্ধিদীপ্ত চাল হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে।