Published : 13 Jul 2026, 02:06 PM
গত ৫০ বছরে বিশ্বজুড়ে পুরুষদের দেহে গড় টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রায় অর্ধেক কমেছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। একইসঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছেন, মানব সমাজ এখন পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতার এক চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, লন্ডনে অনুষ্ঠিত ‘ইউরোপিয়ান সোসাইটি অফ হিউম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি’র বার্ষিক সভায় উপস্থাপিত তথ্যে উঠে এসেছে, ১৯৭২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে পুরুষদের দেহে মোট টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রায় ৫৪ শতাংশ কমেছে।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন ও ডায়াবেটিসের ক্রমাগত হার এ পতনের পেছনে ভূমিকা রাখছে। তবে গবেষণার সঙ্গে জড়িত দলটি বলেছে, এর বাইরেও পরিবেশগত কিছু কারণ রয়েছে।
যেমন, বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যে থাকা হরমোন বা এন্ডোক্রাইন বৃদ্ধিতে বাধা তৈরিকারী রাসায়নিক উপাদান এবং বৈশ্বিক উষ্ণতাও পুরুষের এই নাটকীয় হরমোন হ্রাসের বড় কারণ হতে পারে।
ইসরায়েলের ‘হিব্রু ইউনিভার্সিটি-হ্যাডাসাহ ব্রাউন স্কুল অফ পাবলিক হেলথ অ্যান্ড কমিউনিটি মেডিসিন’-এর অধ্যাপক হাগাই লেভিন বলেছেন, “আমার মনে হয় আমরা পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্যের এক বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে বর্তমানে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
“আমরা এ নির্দিষ্ট কালের মধ্যে মোট টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ৫০ শতাংশেরও বেশি কমতে দেখেছি, যা প্রতি বছর ১ শতাংশের বেশি পতনের হার নির্দেশ করছে। আর এমনটা কোনো আকস্মিক ঘটনা বা পরিসংখ্যানের ভুল নয়, বরং খুবই স্পষ্ট ও শক্তিশালী প্রবণতা।”
পুরুষের উর্বরতা বা প্রজনন সক্ষমতা আসলেই কমছে কি না ও কেন কমছে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলমান বিতর্কে এ নতুন তথ্যটিকে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে একই গবেষণা দলের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, গত ৪০ বছরে পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে, যা বিশ্বজুড়ে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে।
সম্প্রতি মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রও পুরুষের প্রজনন সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঘটনাটিকে ‘অস্তিত্বের সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিজ্ঞানীদের মহলে এসব দাবি নিয়ে বেশ বিতর্ক ও দ্বিমত রয়েছে। ‘ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন’-এর অধ্যাপক ও রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজি বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট চন্না জয়সেনা বলেছেন, টেস্টোস্টেরন নিয়ে সাম্প্রতিক এসব পর্যবেক্ষণকে ‘গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার চোখ রাঙানি’ হিসেবে দেখা উচিত।
“ইতিহাসের বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন সময়কাল ধরে এসব গবেষণা চালানো হয়েছে, যা আসলে আমাকে এ ফলাফলের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে। আমি সত্যিই মনে করি, পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্য দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অবনতি ঘটছে বলেই মনে হচ্ছে।”
পুরুষের দেহে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ও সার্বিক স্বাস্থ্যের মধ্যকার সম্পর্কটি দ্বিমুখী ও বেশ জটিল। টেস্টোস্টেরন শুক্রাণু উৎপাদন, যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ, পেশি গঠন ও হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে।
পাশাপাশি, টেস্টোস্টেরন মানুষের মেজাজ বা মুড, শক্তির মাত্রা ও মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়াতেও ভূমিকা রাখে। স্থূলতার মতো স্বাস্থ্যগত সমস্যা পুরুষের দেহে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে।
এ ছাড়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে টেস্টোস্টেরন সাপ্লিমেন্ট বা কৃত্রিম হরমোন ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে। কারণ আপাতবিরোধী মনে হলেও এসব সাপ্লিমেন্ট উল্টো শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে।
অধ্যাপক লেভিন বলেছেন, “প্রজনন স্বাস্থ্য মানুষের সার্বিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। জলবায়ু পরিবর্তন, ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ ও আমাদের জীবনযাত্রার ধরনের কারণে আমরা বর্তমানে এমন এক পরিবেশে বাস করছি, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও অনুকূল নয়।”
এ যৌথ পর্যালোচনায় টেস্টোস্টেরনের ওপর নজর রাখা আগের ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার তথ্য একত্র করা হয়েছে, যার প্রতিটিতে অন্তত তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ের তথ্য ছিল। সার্বিকভাবে, এতে ১৯৭২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৯৩ জন পুরুষের স্বাস্থ্যগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণাগুলোর প্রতিটিই এককভাবে পুরুষদের টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার চিত্রটি খুঁজে পেয়েছে। সব তথ্য একসঙ্গে মেলানো হলে সার্বিক পতনের হার দাঁড়ায় প্রায় ৫৪ শতাংশ; যার মধ্যে ২০০০ সালের পর এই হ্রাসের গতি আরও দ্রুত হয়েছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়ের এসব গবেষণাতে বয়সজনিত নানা বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা হলেও ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর গড় বয়সের পার্থক্যের মতো কিছু বিভ্রান্তিকর কারণ হয়ত চূড়ান্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।
এ ছাড়া গবেষণায় স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের বিষয়টি আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি, যা টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পরিচিত।
অধ্যাপক লেভিন বলেছেন, “আমাকে যদি অনুমান করতে বলা হয় তাহলে বলব, হরমোন কমে যাওয়ার এ ঘটনার চার ভাগের এক ভাগ থেকে শুরু করে অর্ধেক পর্যন্ত কারণ হতে পারে স্থূলতা ও মেটাবলিক সিন্ড্রোম বা বিপাকীয় জটিলতা।”
অন্যান্য বিজ্ঞানীদের অনুমান, এখনই এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কিছুটা তাড়াহুড়া হয়ে যাবে।
অধ্যাপক জয়সেনা বলেছেন, “স্থূলতা ও ডায়াবেটিস একাই এ পুরো পতনের কারণ হিসেবে যথেষ্ট হতে পারে। তবে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা যে কমছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের এখন দরকার স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কোনো পরিবেশগত কারণও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে কি না তা সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করা।”