Published : 13 Jul 2026, 02:20 PM
টানা কয়েকদিন ধরে ঝুম বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশ। এমন আবহাওয়ায় বিছানা ছেড়ে উঠতে আলসেমি লাগে, কোনো কাজে মন বসে না, চেনা আড্ডাও কেমন যেন একঘেয়ে ঠেকে আর হুটহাট মন খারাপ হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিকে ‘রেইনি ডে ব্লুজ’ বা মেঘলা দিনের বিষণ্ণতা বললেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
এটি কোনো কাল্পনিক মন খারাপ নয়; বরং অবিরত বৃষ্টি ও আলোহীন পরিবেশ কীভাবে হরমোন আর মস্তিষ্ককে ওলটপালট করে দেয়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বড় বড় গবেষণা হয়েছে।
যে কারণে হয় এই বিষণ্ণতা
১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ-এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নরম্যান ই. রোজেনথাল এবং তার সহযোগী বিজ্ঞানীদের গবেষণায়, ইতিহাসে প্রথম আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মনের এই নেতিবাচক পরিবর্তনকে ‘সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (এসএডি বা স্যাড)’ বা ‘ঋতুভিত্তিক বিষণ্ণতা’ হিসেবে নামকরণ করেন।
পরে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ এবং চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘জনস হপকিন্স মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একাধিক গবেষণার ফলাফলে বৃষ্টির দিনে মানুষের মেজাজ খিটখিটে বা বিষণ্ণ হওয়ার পেছনে ৩টি প্রধান হরমোন জনিত কারণ প্রমাণিত হয়েছে।
সেরোটোনিন হরমোনের পতন
ডা. রোজেনথাল গবেষণায় দেখান, সূর্যের আলো ত্বকে ও চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটার বা হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মনকে উৎফুল্ল, শান্ত ও সুখী রাখে।
টানা বৃষ্টির দিনে যখন আকাশ মেঘলা থাকে, তখন সূর্যালোকের অভাবে শরীরে সেরোটোনিনের উৎপাদন এক ধাক্কায় অনেক কমে যায়। ফলে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই মানুষ তীব্র একাকিত্ব, অবসাদ ও বিষণ্ণতায় ভুগতে শুরু করে।
মেলাটোনিনের রাজত্ব
ডা. রোজেনথালের সঙ্গে এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মেললাটোনিন বিশেষজ্ঞ ডা. আলফ্রেড লেউই এবং ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ গবেষক ডা. টম ওয়ের।
গবেষণাগারে করা তাদের যৌথ পরীক্ষায় দেখা যায়, যখন চারপাশ অন্ধকার বা মেঘলা থাকে, তখন মানুষের চোখের রেটিনা মস্তিস্ককে সংকেত পাঠায় যে এটি ঘুমানোর সময়। ফলে মস্তিষ্ক থেকে ‘মেলাটোনিন’ নামক ঘুমের হরমোন অতিরিক্ত মাত্রায় নিঃসৃত হতে থাকে। এই হরমোনের আধিক্যের কারণেই বৃষ্টির দিনে শরীর সবসময় অলস, ক্লান্ত এবং ঘুম ঘুম ভাব অনুভব করে।
মিষ্টি ও কার্বোহাইড্রেইট খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়ার কারণ
বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি-ইলিশ, পাকোড়া বা চকোলেটের মতো ক্যালরিযুক্ত ভারী খাবার খাওয়ার ইচ্ছা বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ইয়েল উইন্টার ডিপ্রেশন রিসার্চ ক্লিনিক-এর গবেষকদের মতে, এটিও মূলত ‘স্যাড’-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক লক্ষণ।
ইয়েল স্কুল অফ মেডিসিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষকরা জানান, রক্তে যখন সেরোটোনিন (সুখী হরমোন) কমে যায়, তখন শরীর সাময়িকভাবে সেই ঘাটতি পূরণ করতে শর্করার সন্ধান করে।
কার্বোহাইড্রেইট বা মিষ্টি ধরনের খাবার খেলে শরীরে দ্রুত ডোপামিন ও সেরোটোনিন বাড়ে। তবে এটি অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। ফলে ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে।
রেইনি ডে ব্লুজ বা এই মন খারাপ কাটানোর ৫টি উপায়
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়েবএমডি ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিদ ডা. ন্যান্সি এ. পিওট্রোস্কি, মেঘলা দিনের বিষণ্ণতা কাটিয়ে আবার চাঙা হয়ে ওঠার জন্য বেশ কিছু কার্যকর ও পরীক্ষিত পরামর্শ দিয়েছেন
আলোর থেরাপি ব্যবহার: যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আলফ্রেড লেউই এবং ডা. টম ওয়ের-এর আবিষ্কৃত ‘ব্রাইট লাইট থেরাপির’ নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঘরের ভেতরের অন্ধকার ভাব দূর করতে হবে। ঘরের পর্দাগুলো খুলে দেওয়া এবং কৃত্রিম উজ্জ্বল আলোর (কমপক্ষে ১০,০০০ লাক্স ক্ষমতার লাইট বক্স) ব্যবস্থা করা উপকারী।
উজ্জ্বল আলো চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক, মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে শরীরকে চাঙা করে তোলে।
ইনডোর ব্যায়াম ও মোশন: বৃষ্টিতে বাইরে গিয়ে হাঁটা বা ব্যায়াম করা সম্ভব না হলেও ঘরেই ‘ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ’, ইয়োগা বা হালকা স্ট্রেচিং করা যেতে পারে। মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের শারীরিক সক্রিয়তা মস্তিষ্কে ‘এন্ডোরফিনস’ হরমোন তৈরি করে, যা ঘরে থাকার অবসাদ দূর করে দেয়।
ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ ডায়েট: সূর্যের আলো না পাওয়ায় এই সময়ে শরীরে ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই এই দিনগুলোতে ডিমের কুসুম, মাশরুম, দুধ এবং ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস সমৃদ্ধ মাছ বেশি করে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডিজিটাল ডিটক্স ও সামাজিক যোগাযোগ: বৃষ্টির দিনে একাকিত্ব কাটাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনবরত স্ক্রল না করে একটি ভালো বই পড়া বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে কথা বললে উৎফুল্ল ভাব আসে। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ‘ইনডোর গেইম’ খেলেও মেতে ওঠা যায়।
পেশাদার থেরাপিস্টের সাহায্য: যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টস-এর বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, যদি এই মন খারাপ কেবল দু-একদিনের বৃষ্টির ক্লান্তি না হয়ে টানা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, দৈনন্দিন কাজের ক্ষতি করে এবং মনের ভেতর তীব্র নেতিবাচক চিন্তা উঁকি দেয়ম, তবে দেরি না করে একজন পেশাদার মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও, দৈনন্দিন জীবনে ডা. রোজেনথাল ও তার দলের উল্লেখিত পন্থায়, ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন এনে, সহজেই এই ‘রেইনি ডে ব্লুজ’-কে হারিয়ে মনের জানালা সতেজ ও প্রফুল্ল রাখা সম্ভব।
আরও পড়ুন
ভালো ঘুম আর ওজন কমাতে ম্যাগনেসিয়ামের ভূমিকা
নিয়ন্ত্রণহীন অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এক ধরনের মানসিক সমস্যা
স্মৃতির আলোয় বেঁচে থাকা: নস্টালজিয়া যেভাবে মানসিক শক্তি জোগায়