Published : 02 Jun 2026, 01:41 PM
হঠাৎ কানে আসা পুরনো কোনো গানের সুর, শৈশবের চেনা কোনো সুবাস কিংবা ধুলো জমা ছবির অ্যালবাম—মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের নিয়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলোতে।
মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘নস্টালজিয়া’ বা স্মৃতিবিধুরতা।
সতেরো আঠারো শতকে নস্টালজিয়াকে এক ধরনের ‘মানসিক ব্যাধি’ বা রোগ মনে করা হত। তবে আধুনিক যুগে গবেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, নস্টালজিয়া আসলে মানুষের বেঁচে থাকার ও সংকট কাটিয়ে ওঠার বড় শক্তি বা ‘ওষুধ’।
নস্টালজিয়া শব্দটি এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ থেকে, ‘নটোস’ যার অর্থ ‘বাড়ি ফেরা’ ও ‘অ্যালগোস’ অর্থ ‘যন্ত্রণা’ বা ‘ব্যথা’।
ব্রিটিশ সাইকোলজিকল সোসাইটি জানায়, এই দুই শব্দের সমন্বয়ে আক্ষরিক অর্থ দাঁড়াচ্ছে- নিজের জন্মভূমি বা ঘরে ফিরে যেতে না পারার কারণে তৈরি যন্ত্রণা বা কাতরতা।
আর এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে, ১৬৮৮ সালে ইয়োহানেস হোফার নামের একজন সুইস চিকিৎসক শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। সেসময় নিজের দেশ থেকে দূরে থাকা সৈনিকদের মধ্যে তীব্র বিষণ্ণতা, ঘুমের সমস্যা ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিত, যেটিকে তিনি একটি রোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে 'নস্টালজিয়া' নামকরণ করেন।
সময়ের বিবর্তনে নস্টালজিয়া এখন আর কেবল ভৌগলিক সীমানায় আটকে নেই। এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে হারানো সময়ের প্রতি এক গভীর তৃষ্ণা।
দীর্ঘকাল ধরে একে কেবল এক ধরনের বিষণ্ণতা বা অতীতের প্রতি দুর্বলতা মনে করা হলেও, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বলছে ভিন্ন কথা। বিজ্ঞানীদের মতে, জীবনের কঠিন সময়ে নস্টালজিয়া আমাদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং একাকিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করে ‘বাঁচিয়ে রাখতে’ সাহায্য করে।
একাকিত্বের বিরুদ্ধে ঢাল
যুক্তরাজ্যের সাউথ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ-মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক কনস্টানটাইন সেডিকাইডস এবং টিম ওয়াইল্ডশাট নস্টালজিয়া নিয়ে দীর্ঘ দুই দশক ধরে গবেষণা করছেন।
তাদের গবেষণার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞদের মত হল, মানুষ যখন বর্তমান জীবনে চরম একাকিত্ব বা বিষণ্ণতায় ভোগেন, তখন তার মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নস্টালজিয়াকে একটি ‘প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যবহার করে।
পুরনো প্রিয় মানুষ বা পারিবারিক স্মৃতির রোমন্থন মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা অতীতেও ভালোবাসার পাত্র ছিলাম, যা বর্তমানের একাকিত্ব দূর করতে সাহায্য করে।
নস্টালজিয়া কীভাবে মানুষের উপকার করে, তা নিয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) পক্ষ হয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে, ওয়াশিংটন ডিসির আর্চব্রিজ ইনস্টিটিউটের ‘হিউম্যান ফ্লুরিশিং ল্যাব’, দুই হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকের ওপর জরিপ চালায়।
এপিএ-এর প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ৭৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে, জীবনের অনিশ্চিত ও কঠিন সময়ে নস্টালজিক স্মৃতিগুলো তাদের জন্য সান্ত্বনাদায়ক উৎস হিসেবে কাজ করে এবং ৭২ শতাংশ মানুষের মতে এটি অনুপ্রেরণা জোগায়।
গবেষণাটির পরিচালক যুক্তরাষ্ট্রে গবেষক ও আর্চব্রিজ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক ড. ক্লে রাউটলেজ জানান, নস্টালজিয়া মানুষকে অতীতে আটকে রাখে না বরং সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
‘জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’তে প্রকাশিত এই গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন যুক্তরাজ্যের সাউথ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল অ্যান্ড পার্সোনালিটি সাইকোলজির অধ্যাপক কনস্টানটাইন সেডিকাইডস।
তারা গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন- নস্টালজিয়া মানুষের জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। যখন কেউ অস্তিত্ব সংকটে ভোগেন, তখন অতীতের সার্থক স্মৃতিগুলো তার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
পিএমসি সাময়িকীতে প্রকাশিত নিউরোসায়েন্টিফিক গবেষণা ‘প্যাটার্ন অফ ব্রেইন অ্যাক্টিভিটি অ্যাসোসিয়েটেড উইথ নস্টালজিয়া’ অনুযায়ী, যখন কোনো মানুষ নস্টালজিক হন, তখন তার মস্তিষ্কের স্মৃতি নিয়ন্ত্রণকারী অংশ এবং পুরস্কার বা আনন্দ নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের মতো ভালোলাগার হরমোন নিঃসৃত হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে মানসিক চাপ ও শারীরিক ব্যথা কমাতে কাজ করে।
‘কগনিশন অ্যান্ড ইমোশন জার্নালে প্রকাশিত, জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কুয়ান-জু হুয়াং-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ‘যারা বেশি নস্টালজিক বোধ করেন, তারা বর্তমানের সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে অনেক বেশি যত্নবান হন।’
অতিরিক্ত অতীত বিলাসিতা ক্ষতিও করতে পারে
এসব গবেষণায় নস্টালজিয়ার ইতিবাচক দিক উঠে এলেও, গবেষকেরা কিছুটা সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
হেলথলাইন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, নস্টালজিয়া তখনই ক্ষতিকর হতে পারে, যখন কেউ বর্তমানের বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, আর কেবল অতীতেই বাস করতে চান। একে ‘নস্টালজিক ডিপ্রেশন’ বলা হয়।
যদি বর্তমানের জীবনকে অতীতের চেয়ে একেবারেই মূল্যহীন মনে হতে শুরু করে, তবে তা মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
আরও পড়ুন