Published : 29 May 2026, 06:19 PM
উৎক্ষেপণ কেন্দ্রেই বিস্ফোরিত হয়েছে জেফ বেজোসের মহাকাশ কোম্পানি ব্লু অরিজিনের একটি রকেট।
ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে এবং নাসার আগামী চন্দ্রাভিযান পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ব্লু অরিজিনের জন্য এ দুর্ঘটনা বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবেই দেখা দিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
বৃহস্পতিবার ব্লু অরিজিনের ‘নিউ গ্লেন’ রকেট ফ্লোরিডার উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে পরীক্ষা চলাকালীন ভয়াবহ বিস্ফোরণের শিকার হয়।
রকেট উৎক্ষেপণ সরাসরি সম্প্রচারকারী মাধ্যম ‘নাসাস্পেসফ্লাইট’-এর ভিডিওতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৯টার দিকে বড় আকারের এ রকেটটিতে হঠাৎ আগুন ধরে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই তা বিস্ফোরিত হয়ে বিশালাকার অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। ফলে আকাশে আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।
রকেটটিকে এর চতুর্থ উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল, যার লক্ষ্য ছিল অ্যাামাজনের ৪৮টি ‘লিও’ স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো। মাস্কের স্টারলিংক ইন্টারনেট নেটওয়ার্ককে টেক্কা দিতে অ্যামাজন যে নিজস্ব ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক তৈরি করছে এ ছিল তারই অংশ।
তবে ঘটনার সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বিস্ফোরণের সময় সৌভাগ্যবশত অ্যামাজনের স্যাটেলাইটগুলো রকেটের ভেতরে স্থাপন করা ছিল না। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি এড়ানো গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে পিছিয়ে থাকা নিউ গ্লেন রকেটের জন্য এ বিস্ফোরণটি কোম্পানিটির জন্য সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।
নাসার ‘আর্টেমিস’ চন্দ্রাভিযানের আওতায় চাঁদে বিভিন্ন জরুরি যন্ত্রপাতি ও ল্যান্ডার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এ রকেটটির ওপরই ভরসা করা হচ্ছিল, যা দুর্ঘটনার কারণে এখন নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল।
এ বিপর্যয়টি এমন এক সময়ে ঘটল যার কেবল দুই দিন আগে চাঁদের বুকে রোভার বা মহাকাশযান অবতরণের জন্য নাসার কাছ থেকে ১৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের চুক্তি পেয়েছে ব্লু অরিজিন।
এর এক সপ্তাহ আগে কোম্পানিটির প্রধান প্রতিযোগী স্পেসএক্স তাদের পরবর্তী প্রজন্মের স্টারশিপ রকেটের বড় ধরনের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। ব্লু অরিজিনের চেয়ে স্পেসএক্স প্রযুক্তির দিক থেকে বছরের পর বছর ধরেই এগিয়ে রয়েছে।
ব্লু অরিজিন নিশ্চিত করেছে, ‘হট-ফায়ার’ পরীক্ষা চলাকালীন রকেটটিতে একটি ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। এ পরীক্ষায় রকেটটিকে মাটিতে আটকে রেখে এর ইঞ্জিন চালু করা হয়।
এ দুর্ঘটনার পর জেফ বেজোস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে লিখেছেন, “খুবই কঠিন একটা দিন গেল। তবে যা কিছু সারানো দরকার আমরা তা আবার তৈরি করব এবং আবারও উৎক্ষেপণ হবে। এই প্রচেষ্টা সার্থক।”
তবে দুর্ঘটনার মূল কারণ জানার সময় এখনও আসেনি বলে উল্লেখ করেছেন বেজোস।
অন্যদিকে, নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেছেন, নাসা এ ঘটনার তদন্তে ব্লু অরিজিনের পাশে থাকবে ও তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে আইজ্যাকম্যান লিখেছেন, “মহাকাশ অভিযান নির্মম এবং এমন বড় আকারের ভারী রকেট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা তৈরি করা অসাধারণ রকমের কঠিন কাজ।”
তিনি আরও বলেছেন, এ দুর্ঘটনার ফলে নাসার ‘আর্টেমিস’ ও ‘মুন বেইস’ কর্মসূচিতে কোনো প্রভাব পড়বে কি না সেসব তথ্য তারা পরবর্তীতে জানিয়ে দেবেন।
‘রকেট বিজ্ঞান আসলেই কঠিন’
২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পরিকল্পিত মানববাহী চন্দ্রাভিযানের আগেই চাঁদের বুকে মানুষ নিয়ে যাওয়ার দৌড়ে নেমেছে দুই বিলিয়নেয়ারের কোম্পানি মাস্কের স্পেসএক্স ও বেজোসের ব্লু অরিজিন।
এজন্য তারা নাসার ব্যবহারের জন্য চন্দ্রযান বা ল্যান্ডার তৈরি করছে। এ মাসের শুরুর দিকে আইপিও’র পরিকল্পনা প্রকাশ করা স্পেসএক্স মার্কিন শেয়ার বাজারে প্রথম ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পথে রয়েছে।
তবে স্পেসএক্সকেও এমন অনেক ব্যর্থতার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এরপরই তারা বর্তমান পর্যায়ে এসেছে।
গেল বছরের জুনে টেক্সাসে পরীক্ষা চলাকালীন এক টেস্ট ফ্লাইটের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় স্পেসএক্সের বড় আকারের ‘স্টারশিপ’ রকেটটিও ঠিক একইভাবে এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে বিস্ফোরিত হয়েছিল।
গত সপ্তাহে স্টারশিপের এক প্রোটোটাইপের ১২তম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে স্পেসএক্স আংশিক সাফল্য পেয়েছে, যেখানে তারা কিছু স্যাটেলাইট সফলভাবে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে বসাতে ও ভারত মহাসাগরে মহাকাশযানটির একটি নিয়ন্ত্রিত অবতরণ সম্পন্ন করে।
তবে মাস্কের এ কোম্পানিটি তাদের ‘সুপার হেভি বুস্টার’ রকেটটির নিয়ন্ত্রিত অবতরণ করাতে ব্যর্থ হয় এবং তা মেক্সিকো উপসাগরে ভেঙে পড়ে।
ব্লু অরিজিনের এ বিস্ফোরণের ভিডিও দেখে মাস্ক নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “বিষয়টি দুঃখজনক। রকেট তৈরি করা আসলেই কঠিন কাজ।”
ব্লু অরিজিন প্রায় এক দশক ধরে ও শত শত কোটি ডলার খরচ করে এ ২৯ তলা সমান উঁচু ‘নিউ গ্লেন’ রকেটটি তৈরি করছে। এর প্রথম স্তরটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য, যা স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন’ রকেট সিরিজ এবং আরও শক্তিশালী ‘স্টারশিপ’-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য তৈরি করেছে কোম্পানিটি।
এদিকে, মার্কিন ‘ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা এফএফএ বলেছে, তারা এই দুর্ঘটনার বিষয়ে জানে। তবে এমনটা তাদের এখতিয়ারের বাইরে এবং এর ফলে ওই অঞ্চলের প্লেন চলাচলে কোনো প্রভাব পড়েনি।