Published : 06 Apr 2026, 07:30 PM
আর্টেমিস টু মিশনের নভোচারীরা চাঁদের উল্টো পাশে গেলে পৃথিবী ও মহাকাশযানের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে চাঁদ। এ সময় রেডিও সিগনাল যাতায়াত করতে না পারায় প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য পৃথিবী থেকে নভোচারীদের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
নভোচারীদের ‘রিয়ার-ভিউ মিরর’ বা পেছনের জানালার আয়নায় পৃথিবীটা যখন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছিল তখনও টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত ‘মিশন কন্ট্রোল’-এর সঙ্গে তাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল।
বিবিসি লিখেছে, নাসার দলের শান্ত ও আশ্বস্ত করা কথাগুলো আর্টেমিস টু ক্রু সদস্যদের জন্য পৃথিবীর সঙ্গে এক স্বস্তিদায়ক বন্ধন হয়ে কাজ করেছে। তবে সেই বন্ধন খুব শিগগিরই ছিন্ন হতে চলেছে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্র সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪৭মিনিটে (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর ৪টা ৪৭ মিনিটে) নভোচারীরা চাঁদের উল্টো পিঠে যাওয়ার সময় পৃথিবী ও মহাকাশযানের মধ্যে যোগাযোগের রেডিও এবং লেজার সিগনালগুলো স্বয়ং চাঁদের আড়ালে পড়ে বাধাগ্রস্ত হবে।
প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য এ চার নভোচারী মহাকাশের অন্ধকারের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকবেন। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকবে কেবল তাদের নিজস্ব চিন্তা ও অনুভূতি, যা হবে এক গভীর নিঃসঙ্গতা আর নীরবতার মুহূর্ত।

এর আগে, আর্টেমিস পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেছিলেন, তার আশা, বিশ্ববাসী এ সময়টুকুকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কাজে ব্যবহার করবেন।
মিশন শুরুর আগে এক সাক্ষাৎকারে গ্লোভার বলেছিলেন, “আমরা যখন চাঁদের পেছনে থাকব ও সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, তখন সেই সময়টিকে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করুন। আপনারা প্রার্থনা করুন, আশা রাখুন এবং আপনাদের শুভকামনা ও অনুভূতিগুলো আমাদের কাছে পাঠান, যেন আমরা পুনরায় ক্রুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি।”
৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরাও তাদের চন্দ্রাভিযানের সময় সিগনাল হারিয়ে এমন নিঃসঙ্গতা অনুভব করেছিলেন। তবে সম্ভবত অ্যাপোলো ১১-এর মাইকেল কলিন্সের মতো এতটা তীব্রভাবে কেউ তা অনুভব করেননি।
১৯৬৯ সালে নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন যখন চাঁদের বুকে প্রথম পা রেখে ইতিহাস গড়ছিলেন কলিন্স তখন কমান্ড মডিউলে একা ছিলেন ও চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছিলেন।
কলিন্সের মহাকাশযানটি যখন চাঁদের উল্টো পিঠে চলে যাবে তখন চন্দ্রপৃষ্ঠে থাকা ওই দুই সঙ্গী ও মিশন কন্ট্রোল উভয় পক্ষের সঙ্গেই কলিন্সের যোগাযোগ ৪৮ মিনিটের জন্য পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
নিজের ১৯৭৪ সালের আত্মজীবনী ‘ক্যারিয়িং দ্য ফায়ার’-এ এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে কলিন্স লিখেছিলেন, তিনি তখন নিজেকে ‘সত্যিই একা’ ও ‘পরিচিত যে কোনো জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন’ মনে করেছিলেন। তবে সেই মুহূর্তে তিনি কোনো ভয় বোধ করেননি।
এদিকে, পৃথিবীতে বসে যারা মহাকাশযানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্বে আছেন তাদের জন্য আর্টেমিস টু নভোচারীদের এ ব্ল্যাকআউট বা যোগাযোগহীন সময়টি বেশ উদ্বেগের হবে।
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে কর্নওয়ালের ‘গুনহিলি আর্থ স্টেশন’-এর এক বড় অ্যান্টেনা ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে সংকেত সংগ্রহ করছে। পুরো যাত্রাপথে মহাকাশযানটির অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে সেইসব তথ্য নাসা সদর দপ্তরে পাঠাচ্ছে এ স্টেশনটি।
‘গুনহিলি’র প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ম্যাট কসবি বলেছেন, “এই প্রথমবার আমরা এমন এক মহাকাশযান ট্র্যাক করছি যাতে মানুষ রয়েছে।
“মহাকাশযানটি চাঁদের আড়ালে চলে যাওয়ার সময় আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকব। তবে আবার যখন তাদের সিগনাল পাব তখন আমরা আনন্দিত হব। কারণ আমরা জানতে পারব যে, তারা সবাই নিরাপদ আছেন।”
আশা করা হচ্ছে, নভোচারীদের এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের ঘটনা খুব শীগগিরই অতীতের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। নাসা ও বিশ্বের অন্যান্য মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি ও অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করলে তখন নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকাটা অপরিহার্য হয়ে পড়বে।
কসবি বলেছেন, “চাঁদে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতির জন্য আপনার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে চাঁদের উল্টো পিঠেও দিনে ২৪ ঘণ্টা সংযোগ থাকা চাই। কারণ চাঁদের ওই অংশটিও আমরা অন্বেষণ করতে চাইব।”
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা বা ইএসএ-এর ‘মুনলাইট’-এর মতো বিভিন্ন প্রোগ্রাম ভবিষ্যতে চাঁদের চারপাশে স্যাটলোইটের এক নেটওয়ার্ক বা জাল তৈরির পরিকল্পনা করছে, যাতে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।
পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগহীন এ সময়টুকু আর্টেমিস নভোচারীদের চাঁদের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেবে।
যোগাযোগের এ ব্ল্যাকআউট থাকার সময়টি তারা চাঁদ পর্যবেক্ষণে কাটাবেন, যার মধ্যে থাকবে ছবি তোলা, চাঁদের ভূ-প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা ও নিছক এর অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা।
চাঁদের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নভোচারীদের পুনরায় পৃথিবীর সঙ্গে সিগনাল পাওয়ার পর পুরো বিশ্ব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। এ ইতিহাস গড়া নভোচারীরা নিজেদের সেই অসাধারণ অভিজ্ঞতার বিভিন্ন দৃশ্য পৃথিবীর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবেন।
মহাকাশে যোগাযোগের মাধ্যম
পৃথিবী থেকে প্রায় আড়াই লাখ মাইল দূর থেকে ডেটা, ভয়েস ও ফোরকে ভিডিও পাঠানোর জন্য হাই-স্পিড লেজার কমিউনিকেশন ও প্রচলিত রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি সিস্টেমের সমন্বয় ব্যবহার করছে আর্টেমিস টু।
পৃথিবী থেতে এত দূরে যোগাযোগ বজায় রাখার মূল মাধ্যম নাসার ‘ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক’ ও ‘নিয়ার স্পেস নেটওয়ার্ক’, যা পৃথিবীতে থাকা বড় সব অ্যান্টেনার সাহায্যে ওরিয়ন ক্যাপসুলটিকে ট্র্যাক করছে।
এছাড়া, আর্টেমিস ২ মহাকাশযানটি পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রধানত তিনটি আধুনিক প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করছে–
১. ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক
‘ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক’ বা ডিএসএন নাসার সবচেয়ে শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা। পৃথিবীজুড়ে, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ায় তিনটি বিশাল রেডিও অ্যান্টেনা এই নেটওয়ার্কের অংশ।
ডিএসএন- এর মাধ্যমেই নভোচারীরা পৃথিবী থেকে কয়েক লাখ মাইল দূরে থেকেও বড় ডেটা, ভিডিও এবং অডিও সিগনাল আদান-প্রদান করতে পারেন।
এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ মেক্সিকোর বিভিন্ন গ্রাউন্ড স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে জরুরি ভয়েস কল, মিশনের তথ্য ও মহাকাশযানের যান্ত্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
২. লেজার কমিউনিকেশন
আর্টেমিস ২ মিশনে নাসা প্রথমবারের মতো ‘ওরিয়ন অপটিক্যাল কমিউনিকেশন’ বা ওটুও প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা প্রচলিত রেডিও তরঙ্গের চেয়ে অনেক দ্রুত।
লেজার রশ্মি ব্যবহার করে ওটুও সিস্টেমটি ইনফ্রারেড আলোর সাহায্যে উচ্চসক্ষমতার ছবি এবং ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীতে পাঠাতে পারে, যা মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
৩. নিয়ার স্পেস নেটওয়ার্ক
মহাকাশযানটি পৃথিবীর কাছাকাছি থাকাকালীন বা উৎক্ষেপণের পরপরই সিগন্যাল ধরে রাখার জন্য নাসার ‘নিয়ার স্পেস নেটওয়ার্ক’ বা এনএসএন নেটওয়ার্কটি ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের আর্থ স্টেশনগুলো, যেমন ইংল্যান্ডের গুনহিলি স্টেশন ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করছে।
তবে প্রযুক্তির এই চরম শিখরে পৌঁছালেও চাঁদের উল্টো পিঠে যাওয়ার সময় প্রায় ৪০ মিনিটের এক রোমাঞ্চকর ব্ল্যাকআউটের মুখে পড়তে হচ্ছে আর্টেমিস টু নভোচারীদের।