Published : 07 Jun 2026, 11:53 AM
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎবিহীন এক অভিনব ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অধ্যাপক।
পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ ঘর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এ ডিভাইসটি ভবনের তীব্র কম্পন শুষে নিতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্যোগে অসংখ্য মানুষের প্রাণ ও ভবন রক্ষা করবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ইউনিভার্সিটি অফ শারজাহ’-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক মুসা লেবলুবা সহজ, কার্যকর ও সম্পূর্ণ বিদ্যুৎবিহীন একটি সমাধান তৈরি করেছেন।
যন্ত্রটি একটি সিলিন্ডার, যার কেন্দ্র বরাবর একটি রড রয়েছে এবং এর দুই প্রান্ত সিলিন্ডারের বাইরে প্রসারিত অবস্থায় থাকে। সিলিন্ডারের ভেতরে থাকা রডের অংশটি থেকে ছোট ছোট আরও কিছু রড শাখার মতো চারদিকে ছড়িয়ে থাকে এবং পুরো সিলিন্ডারটি ছোট ছোট স্টিলের বল বা মার্বেল দিয়ে ঠাসা। মূল পরিকল্পনাটি হচ্ছে, এ যন্ত্রটি ভূমিকম্পের তীব্র আঘাত নিজে শুষে নিয়ে তা নিষ্ক্রিয় করে দেবে।
শুনতে যতটা জটিল মনে হচ্ছে বিষয়টি ততটা কঠিন নয়। ‘ইউরেকঅ্যালার্ট!’-এর সঙ্গে আলাপকালে লেবলুবা বলেছেন, এ যন্ত্রটির কাজ করার জন্য কেবল পদার্থবিজ্ঞানের শক্তির প্রয়োজন।
“মূল স্থাপনা বা ভবনটি যখন কাঁপতে শুরু করবে তখন সিলিন্ডারের ভেতরের মূল দণ্ডটি সামনে-পেছনে নড়াচড়া করবে এবং এর সঙ্গে থাকা ছোট আকারের বিভিন্ন রড ঠাসাঠাসি করে থাকা স্টিলের বলগুলোর ভেতর দিয়ে যাতায়াত করবে। এসব বল ও রডের মধ্যকার ঘর্ষণের ফলেই কম্পনজনিত শক্তি শোষিত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।”
পরীক্ষামূলকভাবে যন্ত্রটি প্রায় ১৪ শতাংশ হারে ড্যাম্পিং রেশিও বা কম্পন কমাতে পেরেছে, যার থেকে প্রমাণ মেলে, বেশ ভালোভাবেই নিজের কাজ সম্পন্ন করতে পারে এ যন্ত্র।
অধ্যাপক লেবলুবা ২০২৫ সালে এ ভূমিকম্প-প্রতিরোধী যন্ত্রটির পেটেন্ট বা স্বত্ব পেয়েছেন। তবে বাণিজ্যিকভাবে বা বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে এখনও যন্ত্রটির অনেক কাজ বাকি। বাস্তব ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা পুরোপুরি প্রমাণের জন্য আরও পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন।
এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি
মুসা লেবলুবার এ যন্ত্রটির বেশ কিছু অনন্য সুবিধা রয়েছে। কোনো বিদ্যুৎশক্তির প্রয়োজন না হওয়ায় যন্ত্রটি পুরানো ভবনগুলোতেও যেমন সহজে যোগ করা সম্ভব তেমনই ‘মডিউলার’ বা সহজে খণ্ড খণ্ড অংশ আলাদা করার উপযোগী। যার মানে, প্রকৌশলীরা প্রয়োজন অনুসারে এর যে কোনো অংশ খুলে পরিবর্তন করতে পারবেন, যা যন্ত্রটিকে সবসময় সচল রাখতে সাহায্য করবে।
পাশাপাশি, যন্ত্রটির গঠনশৈলী সহজ হওয়ায় এটি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও কম। এ সরলতার কারণেই প্রকৌশলীরা যে কোনো ভবনের আকার, ওজন ও নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুসারে যন্ত্রটিকে সহজেই মানিয়ে নিতে পারবেন।
তবে এতসব সুবিধার পরেও কিছু বড় বাধা এখনও রয়ে গেছে।
গবেষণা দলটি এ পর্যন্ত যন্ত্রটিকে কেবল ১ থেকে ৫ মিলিমিটারের মতো সূক্ষ্ম কম্পনের মধ্যে পরীক্ষা করেছে। এসব ক্ষুদ্র পরিসরে যন্ত্রটি প্রতি মিলিমিটারে ৫ কিলোনিউটন বল প্রতিরোধের মাধ্যমে ভালো কার্যকারিতা দেখালেও বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে গবেষণাগারের বাইরে বাস্তব পৃথিবীর পরিস্থিতিতে একে পরীক্ষা করা জরুরি।
অধ্যাপক লেবলুবা বলেছেন, তাদের গবেষণা দলটি এখন এ যন্ত্রটির আরও বড় সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা করছে। যার মাধ্যমে ভবনের কৃত্রিম মডেল ব্যবহার করে ভূমিকম্পের বাস্তবসম্মত পরিস্থিতির সিমুলেশন বা মহড়া চালিয়ে এর নকশাটি নিখুঁত করা হবে।
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে থামানো সম্ভব নয় তবে এর জন্য যথাসম্ভব সেরা প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এ দুর্যোগের সময় ‘হারবার ফ্রেইট’-এর মতো জরুরি বিভিন্ন সরঞ্জাম হয়ত সাময়িক সাহায্য করতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্ভাবনই ভূমিকম্পের মতো কঠিন পরিস্থিতি পার হওয়াকে আরেকটু সহজ ও নিরাপদ করে তুলবে।