Published : 10 Jun 2026, 03:52 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অভাবনীয় প্রসারের ফলে তৈরি জ্বালানি সংকট ঠেকাতে এক অভিনব সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছে চীন।
সাংহাই উপকূলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সমুদ্রের তলদেশে বিশ্বের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎচালিত ডেটাসেন্টার চালু করেছে দেশটি।
মে মাসে চালু হওয়া ‘সাংহাই লিংগাং আন্ডারসি ডেটাসেন্টার ডেমোনস্ট্রেশন প্রজেক্ট’ নামের এ প্রকল্পের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ২৪ মেগাওয়াট। ‘হাইক্লাউড টেকনোলজি’ ও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ‘চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন’-এর যৌথ উদ্যোগে এ ব্যতিক্রমী প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করছে দেশটি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, সাংহাই উপকূল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্র তলদেশের প্রায় ১০ মিটার গভীরে বসানো হয়েছে এ ডেটাসেন্টারটি, যার প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে কাছাকাছি থাকা উপকূলীয় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে।
চীন সরকারের দেওয়া তথ্য অনুসারে, প্রচলিত স্থলভাগের বিভিন্ন ডেটাসেন্টারের তুলনায় সমুদ্রের তলদেশের ডেটাসেন্টারটি প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশেরও বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারে।
এ বিপুল পরিমাণ সাশ্রয়ের মূল কারণ ডেটাসেন্টারটি একদিকে যেমন শতভাগ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার করছে, অন্যদিকে সমুদ্রের পানির স্বাভাবিক শীতল আবহাওয়ার কারণে এর সিস্টেম ঠান্ডা রাখার অতিরিক্ত শক্তিও বেঁচে যাচ্ছে। ফলে সার্বিকভাবে এর জ্বালানি চাহিদা স্থলভাগের ডেটাসেন্টারের চেয়ে কম।
স্থলভাগের প্রচলিত ডেটাসেন্টারে বিভিন্ন সার্ভারকে অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকে বাঁচাতে আশপাশে ঠান্ডা পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হয়, আর এর পেছনেই মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ খরচ হয়ে যায়।
এআইয়ের ভৌত মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত প্রচলিত এসব ডেটাসেন্টার এদের অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের কারণেও ইদানীং তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। সেই তুলনায় সমুদ্রের তলদেশে ডেটাসেন্টার বসানোয় বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানির অপচয় ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে।
সম্প্রতি ‘ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথ’ সতর্ক করে বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ডেটাসেন্টারে পানির ব্যবহার ৯.৩ ট্রিলিয়ন লিটারে গিয়ে ঠেকতে পারে, যা সাব-সাহারা আফ্রিকার ১৩০ কোটি বাসিন্দার বার্ষিক গৃহস্থালি পানির চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
হাইক্লাউড ২০১৩ সালেই দক্ষিণ চীনের ক্রান্তীয় দ্বীপ হাইনানে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক আন্ডারওয়াটার ডেটাসেন্টার চালু করেছিল। তবে সাংহাইয়ের এ নতুন প্রকল্পটিই প্রথম, যা পুরোপুরি উপকূলীয় বায়ুবিদ্যুৎ দিয়ে চালানো হচ্ছে।
সাংহাইয়ের পূর্ব দিকে অবস্থিত হাই-টেক ও মুক্ত-বাণিজ্য অঞ্চল ‘লিংগাং’, যেখানে টেসলার এক গিগাফ্যাক্টরিও রয়েছে। এর উপকূল থেকেই এ বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আবছাভাবে দেখা যায়।
ডেটাসেন্টারকে আরও সাশ্রয়ী করতে পানির নিচে তা তৈরি করার পরীক্ষানিরীক্ষায় চীনই প্রথম দেশ নয়। এর আগে, ২০১৮ সালে মাইক্রোসফট স্কটল্যান্ডের অর্কনি অঞ্চলের সমুদ্রে পরীক্ষামূলকভাবে এমন একটি প্রকল্প চালু করেছিল।
দুই বছর পর কোম্পানিটি এর বেশ আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়ার কথা জানালেও পরবর্তীতে তাদের সেই প্রকল্প আর এগোয়নি।
‘হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি’র ড. হানজিয়াং ডং বলেছেন, “মাইক্রোসফট এ ধারণার কার্যকারিতা প্রমাণে প্রথম দিকে এগিয়ে থাকলেও চীন এর বাণিজ্যিক প্রসারে অনেক দূর এগিয়েছে। কারণ তারা বাজারের চাহিদা, শিল্প সক্ষমতা, সামুদ্রিক প্রকৌশল ও সরকারি নীতিগত সহায়তাকে খুব দ্রুত বাণিজ্যিক প্রকল্পের রূপ দিতে পেরেছে।”
চীন এআই খাতের উন্নয়নকে তাদের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। গেল বছর তারা বিশেষ ‘এআই অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রকাশ করেছে, যেখানে ডেটাসেন্টার নির্মাণের গতি বাড়াতে তাগিদ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া চীনা সরকার বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই অবকাঠামো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সরবরাহ ব্যাপকহারে বাড়ানো হবে।
চীন সরকারের দেওয়া তথ্য অনুসারে, এ সাংহাই লিংগাং ডেটাসেন্টারটি নির্মাণে দেশটি প্রায় ১৬০ কোটি ইউয়ান বা ২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে।
তবে পানির নিচের এসব ডেটাসেন্টার সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য কিছুটা ঝুঁকিরও কারণ হতে পারে। যেমন সমুদ্রের তলানির পলিমাটি ওলটপালট হওয়া বা আশপাশের পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
এ উদ্যোগের প্রশংসা করে যুক্তরাজ্যের ‘বোর্নমাউথ ইউনিভার্সিটি’র সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক রিক স্ট্যাফোর্ড বলেছেন, “পানির নিচে ডেটাসেন্টার তৈরির এ ধারণাটি বেশ চমৎকার। সমুদ্রের পানি ব্যবহার করে সিস্টেম ঠান্ডা করার কারণে এর আশপাশের নির্দিষ্ট কিছু এলাকার পানির তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও তার প্রভাব খুব বেশি দূর পর্যন্ত ছড়াবে না।”