Published : 09 Jun 2026, 01:42 PM
রকেট ও স্যাটেলাইট নির্মাতা কোম্পানি স্পেসএক্স’কে শেয়ার বাজারে নিয়ে আসার মাধ্যমে আইপিও জগতে নিজের চেনা ও ব্যতিক্রমী ব্যবসায়িক ধারা নিয়ে হাজির হচ্ছেন ইলন মাস্ক, যা অন্য কোনো কোম্পানি আগে কখনও করেনি।
রেকর্ড গড়া সাড়ে ৭ হাজার কোটি ডলারের লিস্টিং বা শেয়ার বাজারের তালিকায় যোগ হওয়ার মাধ্যমে স্পেসএক্স যেভাবে ওয়াল স্ট্রিটের চেনা ঐতিহ্যগুলো ভাঙছে তাতে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক–
১. ‘নিলে নিন, না নিলে নাই’ স্টাইলে শেয়ারমূল্য নির্ধারণ
স্পেসএক্স তাদের কোম্পানির মোট মূল্য প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার স্পর্শ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং এর প্রতি শেয়ারের দাম ধরেছে ১৩৫ ডলার, যেটার কোনো নড়চর হবে না!
সাধারণ নিয়ম অনুসারে, ওয়াল স্ট্রিটের বিভিন্ন কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মিটিং বা রোডশো করে শেয়ারের চাহিদা কেমন তা বোঝেন ও দামের একটা সীমানা নির্ধারণ করেন। তবে স্পেসএক্স এ মিটিংয়ের আগেই শেয়ারের দাম পাকাপাকি করে ফেলেছে।
আইপিও নিয়ে গবেষণা করা কোম্পানি ‘রেনেসাঁ ক্যাপিটাল’-এর সিনিয়র স্ট্র্যাটেজিস্ট ম্যাট কেনেডি বলেছেন, “এমনটা সাধারণ আইপিও প্রক্রিয়ার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সাধারণত শেয়ারের দামের একটা সীমানা বিনিয়োগকারীদের একটা ধারণা দেয় এবং মিটিংয়ের ফিডব্যাক বা মতামতের ওপর ভিত্তি করে কোম্পানি দাম কমবেশি করার সুযোগ পায়।
“তবে শুরুতেই একটা নির্দিষ্ট দাম ধরে দেওয়ায় এসব মিটিং আর দাম নির্ধারণের আলোচনা না হয়ে কেবল শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।”
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, মাস্ক নিজে এসব মিটিংয়ে সশরীরে উপস্থিত থাকবেন কি না তা এখনও নিশ্চিত নয়। শুরুর দিকের একটি মিটিংয়ের শেষ মুহূর্তে তিনি ভিডিও কলের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিলেন।
অবশ্য স্পেসএক্সের এ একদামে শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা কতটা সফল হবে তা পুরোপুরি নির্ভর করছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এর চাহিদার ওপর।
১১ জুন আইপিও’র চূড়ান্ত দাম নির্ধারণের সময় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে এবং তার পরের দিনই নাসডাক শেয়ার বাজারে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন শুরু হবে।
২. সাধারণ মানুষের জন্য বেশি সুযোগ
স্পেসএক্স কেবল আইপিও’তে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগই বাড়াচ্ছে না, বরং ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলোকে তাদের আইপিও ফি কমানোর জন্যও চাপ দিচ্ছে।
সাধারণত কোটি কোটি ডলার অর্থ বিনিয়োগের সামর্থ্য না থাকা ক্ষুদ্র বা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আইপিও থেকে শেয়ার কেনার তেমন একটা সুযোগ পান না।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, মাস্কের প্রতি ভক্তদের যে সমর্থন রয়েছে সেটিকে কাজে লাগাতে স্পেসএক্স এবার মোট শেয়ারের প্রায় ৩০ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা ভাবছে, যা যে কোনো বড় আইপিও’র ইতিহাসে অস্বাভাবিক রকমের বড় একটি অংশ।
সাধারণ মানুষের জন্য রাখা এ বড় বরাদ্দ নিয়ে ‘অ্যানেক্স ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট’-এর প্রধান অর্থনৈতিক কৌশলবিদ ব্রায়ান জ্যাকবসেন বলেছেন, “সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ এতটাই বড় যে, কোম্পানি সম্ভবত মনে করছে শেয়ার পাওয়ার জন্য বাইরে মুখিয়ে থাকা সাধারণ মানুষের ভিড় তাদের জন্য এক ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করবে।”
এ ছাড়া, নাসডাক ইনডেক্সের নিয়মনীতিতে এমন কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে যার ফলে স্পেসএক্স খুব দ্রুত ‘নাসডাক ১০০’ তালিকায় যোগ হতে পারবে। এমনটা হলে, এ সূচক অনুসরণকারী বহু ফান্ড ও বিনিয়োগকারী স্পেসএক্সের শেয়ার কিনতে বাধ্য হবেন।
তবে শীর্ষস্থানীয় সূচক ‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০’ তাদের নিয়মনীতি পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানানোয় আপাতত স্পেসএক্সের জন্য এর দরজা বন্ধই থাকছে।
এ ইনডেক্সে যোগ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে কোম্পানিটিকে অবশ্যই লাভজনক হতে হবে। তবে স্পেসএক্স এখনও লাভজনক নয়।
৩. ভেতরের মানুষদের আগেভাগে বিদায় নেওয়ার সুযোগ
স্পেসএক্সের আইপিও নথি অনুসারে, স্পেসএক্সের কর্মীরা সাধারণ ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার আগেই ধাপে ধাপে তাদের কিছু শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন।
কারণ, ভেতরের মানুষেরা একযোগে শেয়ার বিক্রি করে দিলে বাজারের ওপর যে বাড়তি চাপ পড়বে তা নিয়ে রকেট নির্মাতা এ কোম্পানিটি মোটেও চিন্তিত নয়।
বাজারে আসা বিভিন্ন শেয়ারের প্রায় পুরোটাই হবে সম্পূর্ণ নতুন বা প্রাইমারি শেয়ার। এ দুটি কৌশল বেশ ব্যতিক্রমী হলেও একদম নজিরবিহীন নয়। তবে মাস্ককে প্রায় এক বছরের জন্য তার নিজের শেয়ার ধরে রাখতে হবে।
৪. চাবিকাঠি মাস্কের হাতেই থাকছে
মাস্ক শেয়ার বিক্রি করছেন ঠিকই তবে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ তিনি কোনোভাবেই হাতছাড়া করছেন না। হাতছাড়া করার কাছাকাছিও কোনো সুযোগ রাখছেন না।
সাধারণত আইপিও’র মাধ্যমে কর্পোরেট নজরদারি বা জবাবদিহিতার পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ে। অনেক প্রযুক্তি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতারা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ‘সুপার ভোটিং’ শেয়ারের সুবাদে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হলেও আইপিও’র পর মাস্ক কোম্পানির সম্মিলিত ভোটিং ক্ষমতার ৮৫.১ শতাংশ নিজের কাছেই রেখে দেবেন।
এ তো কেবল শুরু। সিইও পদ থেকে মাস্ককে বরখাস্ত করা যাবে না, যদি না তিনি নিজে এতে রাজী হন এবং স্পেসএক্স তাদের শাসন প্রক্রিয়ায় এমন কিছু বিধান যোগ করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা আরও কঠিন করে তুলবে।
এর মধ্যে রয়েছে সুনির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ন্যূনতম মালিকানার সীমা নির্ধারণ ও বিনিয়োগকারীদের যে কোনো প্রস্তাবের ওপর বিশেষ বিধিনিষেধ।
৫. অস্তিত্বহীন ব্যবসার ওপর বাজি
অনেক বিনিয়োগকারী স্পেসএক্সকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তির চেয়ে বরং মাস্কের এক ধরনের বাজি হিসেবেই দেখেন এবং তারা এ মানুষটির প্রতিই আস্থাশীল।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, কোম্পানিটির সাড়ে সাত হাজার কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহের বিপরীতে বাজারে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারের দ্বিগুণ চাহিদা দেখা গেছে।
তবে স্পেসএক্স নিজে এখনও প্রমাণ করতে পারেনি যে তার মূল ব্যবসাগুলোর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব থাকবে। কোম্পানিটি বর্তমানে লোকসানে চলছে, যার বড় কারণ এআই কম্পিউটারের পেছনে তাদের মোটা অংকের বিনিয়োগ এবং তাদের পরিকল্পনার মূল অংশই মহাকাশে সৌরশক্তি চালিত ডেটা সেন্টার বসানো।
এ ছাড়া, মঙ্গলে মানববসতি স্থাপনের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কোম্পানিটি মাস্কের সামনে মোটা অংকের আর্থিক প্রণোদনার সুযোগও তৈরি করে রেখেছে।
এ মুহূর্তে তাদের সবচেয়ে লাভজনক ইউনিট হচ্ছে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা। স্পেসএক্সের ভবিষ্যতের বড় সাফল্য নির্ভর করছে সম্পূর্ণ নতুন ও বিশালাকার স্টারশিপ রকেটের ওপর, যা এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
তবে কোম্পানিটির উদ্দেশ্যের মহত্ব ও কাব্যিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্নের অবকাশ নেই।
কারণ, স্পেসএক্সের ভাষ্যমতে, “আমাদের লক্ষ্য এমন সব সিস্টেম ও প্রযুক্তি তৈরি করা, যা জীবনকে বহু গ্রহে ছড়িয়ে দেওয়া, মহাবিশ্বের প্রকৃত রূপ বোঝা ও চেতনার আলোকে তারামণ্ডলী পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন।”