Published : 07 Jun 2026, 10:09 AM
ইউরোপে গাড়ি তৈরির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহার করতে যাচ্ছে গাড়ি নির্মাতা জার্মান ব্র্যান্ড বিএমডব্লিউ।
কারখানার বর্তমান কাজের পরিবেশে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারা এসব রোবট উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ শ্রমিক সংকট দূর করবে বলে আশা করছে কোম্পানিটি।
‘হেক্সাগন রোবোটিক্স’-এর তৈরি দুটি রোবট আগামী গ্রীষ্মকাল থেকেই মূল উৎপাদনে অংশ নেবে। বর্তমানে জার্মানির লাইপজিগ কারখানায় পরীক্ষামূলকভাবে এগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
বিএমডব্লিউ’র প্রসেস ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাইজেশন বিভাগের প্রধান মাইকেল নিকোলাইডেস বলেছেন, “গাড়ি উৎপাদনের ভবিষ্যৎ হতে যাচ্ছে এটাই।”
গাড়ি শিল্পে রোবোটিক হাত ও অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার কয়েক দশক ধরেই চলছে। তবে হিউম্যানয়েড বা মানুষের মতো দেখতে এসব রোবটের দিকে ঝুঁকছে কেন এই শিল্প?
নিকোলাইডেস বলেছেন, “একটি রোবটের আকৃতি যদি মানুষের মতো হয় তবে আজ যেখানে একজন মানুষ কাজ করছেন, ঠিক সেই জায়গাতেই আপনি রোবটটিকে বসিয়ে দিতে পারবেন। কারণ এর আকার ও কাজের সক্ষমতা একজন মানুষের মতোই।”
বর্তমানে রোবট তৈরির খরচ আগের চেয়ে কমেছে, অথচ একটি কারখানার পুরো অ্যাসেম্বলি লাইন বা উৎপাদন ব্যবস্থা নতুন করে ডিজাইন করা এখনও বেশ ব্যয়বহুল।
ফলে, মানুষের জন্য তৈরি বর্তমান কাজের পরিবেশেই এসব রোবটকে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা বেশি সাশ্রয়ী।
প্রযুক্তি গবেষণা কোম্পানি ‘গার্টনার’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অ্যানালিস্ট বিল রে বলেছেন, “একটা সময় যখন একটি রোবটের দাম ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার ছিল তখন রোবটের সুবিধামতো পুরো কারখানার নকশা নতুন করে সাজাতে হত।
“তবে এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। ফলে এখনকার লক্ষ্য, কারখানার বর্তমান কাজের ধারার মধ্যেই রোবটটিকে খাপ খাইয়ে নেওয়া।”
হেক্সাগনের তৈরি এ হিউম্যানয়েড রোবটটির নাম ‘ইওন’, যার উচ্চতা ১.৬৫ মিটার বা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি, কাজের গতি প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ২.৪ মিটার, ওজন ৬০ কেজি। রোবটটি একটানা ৮ কেজি ও অল্প সময়ের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ কেজি পর্যন্ত ভর বহন করতে পারে।
‘ইওন’ রোবটটিতে মোট ২১টি অত্যাধুনিক সেন্সর রয়েছে। যার মধ্যে আছে ক্যামেরা, রেডার, মাইক্রোফোন ও কাজ করার সুবিধার্থে প্রেসার (বল ও টর্ক) সেন্সর।
বিএমডব্লিউ কারখানায় এসব রোবটকে দুটি পদ্ধতির সংমিশ্রণে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রথমটি টেলিঅপারেশন, যেখানে মানুষের শরীরে সেন্সর বসিয়ে তাদের নড়াচড়া ট্র্যাক করা হয়। দ্বিতীয়টি ডিজিটাল টুইন সিমুলেশন, যেখানে এনভিডিয়া সফটওয়্যার ব্যবহার করে কারখানার হুবহু ভার্চুয়াল রূপ বা ‘ডিজিটাল টুইন’ তৈরি করা হয়েছে। এখানে রোবটটি কৃত্রিমভাবে কাজ শেখে।
ভার্চুয়াল সিমুলেশনে রোবটটিকে একটি কাজ দেওয়া হয় এবং সে সেটি বারবার করার চেষ্টা করে সবচেয়ে সেরা উপায়টি খুঁজে বের করে। প্রযুক্তির ভাষায় একে বলে ‘রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং’।
অন্যদিকে, কোনো পার্টস বা যন্ত্রাংশ কীভাবে তুলে নিতে হবে, তা শেখাতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘টেলিঅপারেশন’। ফলে একজন মানুষ ঠিক কত উপায়ে কাজটি করতে পারে তা রোবটটি নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করতে পারে।
বর্তমানে রোবট প্রশিক্ষণের প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে। কারণ একটি রোবটকে যত দ্রুত কাজ শেখানো যাবে, ততই লাভ।
হেক্সাগনের রোবোটিক্স বিভাগের প্রেসিডেন্ট আর্নো রবার্ট বলেছেন, বাস্তব পৃথিবীতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল বিষয় ‘ইমিটেশন লার্নিং’ বা দেখে দেখে শেখা।
এ পদ্ধতিতে রোবটটি কেবল কোনো কাজের ভিডিও দেখে বা মানুষের দেহের গতিবিধি সেন্সরের ডেটা বিশ্লেষণ করেই কাজটি শিখে ফেলে।
রবার্ট বলেছেন, এ ইমিটেশন লার্নিংয়ের ফলে একটি রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় কয়েক মাস থেকে কমে কেবল কয়েক দিনে নেমে আসতে পারে।
তার ভাষায়, “শিক্ষক (মানুষ) ও ছাত্র (রোবট) উভয়ের শারীরিক গঠন যখন একই রকম হয় তখন কাজ শেখানো ও শেখা সবচেয়ে নিখুঁত হয়।”
তাহলে কি রোবটটি কাউকে বক্স প্যাক করতে দেখেই নিজে কাজ শুরু করে দিতে পারবে?
“ভবিষ্যতের চূড়ান্ত লক্ষ্য এটাই,” বলেন রবার্ট।
“আপনি এখন যে পরিস্থিতির কথা বলছেন তা বাস্তবে রূপ নিতে সম্ভবত আর এক বা দুই বছর সময় লাগবে।”
গবেষণা কোম্পানি গার্টনার-এর বিশ্লেষক বিল রে’র অনুমান অনুসারে, আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে এসব রোবট মানুষের সাধারণ মুখের কথা বা ভয়েস কমান্ড শুনেই যে কোনো কাজ সদক্ষতার সঙ্গে শেষ করতে পারবে।
‘ইওন’ রোবটটির ব্যাটারি ব্যাকআপ কেবল তিন ঘণ্টা, অথচ কারখানায় এক একটি শিফটের মেয়াদ আট ঘণ্টা। ফলে রোবটটিকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে সে নিজেই চার্জিং স্টেশনে গিয়ে এবং ফিরে আসাসহ তিন মিনিটের মধ্যে নিজের ব্যাটারি নিজে বদলে নিতে পারে।
বিএমডব্লিউ কারখানায় এসব রোবটের মূল কাজ হবে উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতিতে পার্টস বা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা এবং ব্যাটারি অ্যাসেম্বলির জন্য নির্দিষ্ট জিনিস এক জায়গা থেকে তুলে অন্য জায়গায় রাখা।
এসব রোবট বহুমুখী কাজে পারদর্শী হলেও কারখানার সাধারণ শ্রমিকদের মতোই এদেরও ঘন ঘন কাজের ধরন পরিবর্তন করতে হবে না।
নিকোলাইডেস বলেছেন, যেসব কাজ বারবার করতে হয় বা মানুষের জন্য শারীরিকভাবে খুব কষ্টসাধ্য, সেগুলোতে এসব রোবট দারুণ সাহায্য করতে পারবে। একইসঙ্গে তা কারখানার শ্রমিক সংকটও দূর করবে।
“আমরা জানি, আর কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেবে, আর মানুষের মতো দেখতে এসব রোবট সেই সংকট মেটাতে সাহায্য করবে।
“৭০-এর দশকে আমরা যখন প্রথম গাড়ি উৎপাদনে অটোনমাস প্রযুক্তি এনেছিলাম তখন সবাই বলেছিল, এর ফলে অনেক মানুষ চাকরি হারাবে। তবে বাস্তবে ঘটেছিল তার উল্টোটা। নতুন প্রযুক্তির কারণে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের তৈরি হয়েছিল। হিউম্যানয়েড রোবটের ক্ষেত্রেও আমরা ঠিক এই ইতিবাচক দিকটাই দেখছি।”
কেবল বিএমডব্লিউ নয় অন্যান্য গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিও আধুনিক রোবোটিক্সের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। সফল ট্রায়াল শেষ করার পর ‘অ্যাজিলিটি রোবোটিক্স’-এর তৈরি ‘ডিজিট’ নামের হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে টয়োটা।
নিজস্ব দুটি হিউম্যানয়েড রোবট ইলেকট্রিক গাড়ি বা ইভি উৎপাদনে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করেছে চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি শাওমি। অন্যদিকে, কারখানার শিল্প পরিদর্শনের কাজে ‘স্পট’ নামের রোবট ব্যবহার করছে হুন্দাই।
এ ছাড়া ‘অ্যাটলাস’ হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে হুন্দাই। ‘স্পট’ ও ‘অ্যাটলাস’ এ দুটি রোবটই বস্টন ডাইনামিক্স-এর তৈরি, যার সিংহভাগ শেয়ারের মালিক এখন হুন্দাই।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের স্পার্টানবার্গ কারখানায় হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের কিছু অভিজ্ঞতা বিএমডব্লিউ’র রয়েছে, যেখানে ‘ফিগার ওটু’ নামের রোবট প্রায় ৩০ হাজারটি ‘এক্স থ্রি’ মডেলের গাড়ি তৈরিতে সাহায্য করেছিল এবং তা একদম মানুষের গতিতেই কাজ করেছিল।