Published : 22 Jul 2026, 03:25 PM
অ্যাপল পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় পুরানো আইফোন দীর্ঘদিন ব্যবহার করা বা নতুনটি কেনার হিসাব কষা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের সরবরাহ কমে যাওয়ায় আইপ্যাড ও ম্যাকবুকসহ ম্যাক কম্পিউটারগুলোর দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। শিগগিরই এই দাম বাড়ার তালিকায় যোগ হবে আইফোনও। ফলে, সামর্থ থাকলে এখনই কেনাকাটা সেরে নেওয়ার উপযোগী সময়।
নতুন আইফোন কেনা বা বর্তমান ফোনটিই আরও কয়েক বছর টেনে চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায় যে, সফটওয়্যার সাপোর্ট, ব্যাটারির সক্ষমতা ও ফোনটির সার্বিক স্থায়িত্ব সব মিলিয়ে একটি নতুন আইফোন আসলে কত দিন টিকতে পারে?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে দুটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, কোনো ডিভাইসের হার্ডওয়্যার নষ্ট না হয়ে ঠিক কত দিন সচল থাকে।
দ্বিতীয়ত, বাজারে আসা অ্যাপলের নতুন আর আকর্ষণীয় বিভিন্ন ফিচারের প্রলোভন সামলে ব্যবহারকারী নিজের পুরানো হ্যান্ডসেটটি ঠিক কত দিন ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারছেন।
ব্যবহারকারীর লক্ষ্য যদি হয় একটি ফোন দীর্ঘদিন ব্যবহার করা তবে আইফোন বেছে নেওয়া তার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত। দীর্ঘমেয়াদি সফটওয়্যার সাপোর্ট বা ওএস আপডেট দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই অনন্য উচ্চতায় রয়েছে অ্যাপল।
সাম্প্রতিক সময়ে গুগল পিক্সেল ও স্যামসাংয়ের নতুন কিছু স্মার্টফোনে সাত বছর পর্যন্ত ওএস আপডেটের ঘোষণা দিয়েছে। তবে এ প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা দেখতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
অন্যদিকে, বহুল আলোচিত ‘ডব্লিউডব্লিউডিসি ২০২৬’ ইভেন্টে অ্যাপল ঘোষণা দিয়েছে, তাদের সর্বাধুনিক আইওএস সংস্করণটি ২০১৯ সালে বাজারে আসা ‘আইফোন ১১’ মডেলটিতেও চলবে।
সফটওয়্যার আপডেটের সঙ্গে কেবল নতুন সুবিধাই যোগ হয় না, বরং নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি বা মেমোরি থ্রেট থেকে ফোনকে সুরক্ষিত রাখতে জরুরি নিরাপত্তা প্যাচ সরবরাহ করে।
অ্যাপলের সফটওয়্যার সাপোর্টের অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বলা যায়, বর্তমানে বাজারে থাকা ‘আইফোন ১৬’ বা ‘আইফোন ১৭’ মডেলগুলো ২০৩১ সাল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে সফটওয়্যার ও সুরক্ষা আপডেট পেতে থাকবে।
অপারেটিং সিস্টেম ছাড়াও আইফোনের আয়ু বাড়ায় যেসব বিষয়
আইফোন বা যে কোনো স্মার্টফোন কত দিন টিকবে তা কেবল সফটওয়্যার সাপোর্টের ওপর নির্ভর করে না। বাস্তবে এমন অনেকেই আছেন যারা বছরের পর বছর ধরে আইফোন আপডেট না করেও কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই ফোন ব্যবহার করছেন।
অ্যাপল ওএস আপডেট বন্ধ করলেও জনপ্রিয় বিভিন্ন থার্ড-পার্টি অ্যাপ সঙ্গে সঙ্গেই পুরানো অপারেটিং সিস্টেমের সাপোর্ট দেওয়া বন্ধ করে দেয় না। যেমন, জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারের জন্য ‘আইওএস ১৫.১’ সংস্করণ প্রয়োজন, যা প্রায় এক দশক আগের ‘আইফোন সিক্স-এস’ মডেলেও অনায়াসে চলে।
ওএস সাপোর্টের চেয়ে গ্রাহকরা সাধারণত যে বড় সমস্যাটির মুখে আগে পড়েন তা হচ্ছে ব্যাটারির সক্ষমতা কমে যাওয়া। অ্যাপল বলেছে, আইফোন ১৫ সিরিজ এবং এর পরের নতুন মডেলগুলোর ব্যাটারি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন এক হাজার বার পূর্ণ চার্জের পরও ব্যাটারি হেলথ অন্তত ৮০ শতাংশ থাকে।
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রায় ৯৫০ বার চার্জ দেওয়ার পরও ‘আইফোন ১৫ প্রো’র ব্যাটারি হেলথ ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে, যা অ্যাপলের দাবির সঙ্গে মেলে।
পুরানো হ্যান্ডসেটের ক্ষেত্রে কেবল ব্যাটারি পরিবর্তন করেই প্রসেসিং পারফরম্যান্সে অনেক দৃশ্যমান উন্নতি আনা সম্ভব। তবে একপর্যায়ে ব্যাটারি নতুন হলেও ফোনের র্যাম ও পুরোনো প্রসেসর সময়ের সঙ্গে ধীরগতির হয়ে পড়ে, যা কেবল নতুন ব্যাটারি দিয়ে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় না।
ফোনের পারফরম্যান্স কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগে অতীতে ‘ব্যাটারিগেইট’ বিতর্কের মুখে মোটা অংকের আইনি জরিমানার মুখে পড়েছিল অ্যাপল। এরপর থেকে কোম্পানিটি ব্যাটারি হেলথ ও পারফরম্যান্সের তথ্যে শতভাগ স্বচ্ছতা এনেছে।
বর্তমানে ব্যাটারি হেলথ ৮০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গ্রাহককে ব্যাটারি বদলানোর তাগিদ দেওয়া হয়। চার্জ ধরে রাখতে ফোন নিজেই প্রসেসিং সক্ষমতা কিছু কমায়। তবে ব্যবহারকারীরা চাইলে এখন তা ম্যানুয়ালি বন্ধ করে পূর্ণ গতিতে ফোন চালানোর অপশন পান।
আধুনিক আইফোন টেকসই হওয়ার জন্য তৈরি
পানিরোধক প্রযুক্তি বা স্ক্র্যাচ-প্রতিরোধী গ্লাস ছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইফোনের সার্বিক স্থায়িত্ব ও নির্মাণশৈলীতে এসেছে বড় ধরনের উন্নতি। কেস ছাড়া দীর্ঘ দিন ব্যবহারের পরও ধাতব গায়ে আঁচড় না পড়ার অভিজ্ঞতা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এখন নিয়মিত ঘটনা।
যেমন, ‘আইফোন ১৭ প্রো’ সিরিজে টাইটানিয়াম বদলে একখণ্ডের অ্যালুমিনিয়াম বা ‘ইউনিবডি’ ডিজাইন এনেছে অ্যাপল। অরেঞ্জ রঙের মডেলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হালকা গোলাপি আভা দেখা দেওয়ার দু-একটি ঘটনা ঘটেছে। তবে হ্যান্ডসেটটির শক্তপোক্ত গড়ন নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
আইফোনের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যেও বেশ ইতিবাচক মতামত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রেডিটে অনেক ব্যবহারকারী বলেছেন, ব্যাটারি পরিবর্তন ছাড়া বড় কোনো খরচ ছাড়াই তারা অনায়াসে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে একই আইফোন ব্যবহার করে যাচ্ছেন।
অ্যাপল তাদের পরবর্তী প্রজন্মের নতুন ‘সিরি এআই’ বা ‘ক্যামেরা কন্ট্রোল’-এর মতো উন্নত ফিচারের সুযোগ কেবল সাম্প্রতিক বিভিন্ন মডেলের জন্যই সংরক্ষণ করে রাখছে। তবে একটি পুরোপুরি সচল আইফোন বদলে ফেলার জন্য এসব ফিচার যথেষ্ট– এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।
বাহ্যিক স্থায়িত্বের বাইরে আরও একটি বড় বিষয় নজর এড়িয়ে যায়। যেমন, প্রতিনিয়ত নতুন অপারেটিং সিস্টেমের ভারী সফটওয়্যার চাহিদার চাপ। আধুনিক ‘আইওএস ২৬’-এর ভিজুয়াল ইন্টারফেইস ‘লিকুইড গ্লাস’ দারুণ হলেও রিয়াল-টাইমে দৃশ্যমান স্বচ্ছতার এফেক্ট প্রসেস করতে পুরানো প্রযুক্তির ওপর তীব্র চাপ ফেলে।
‘এএএ’ মানের গ্রাফিক্স গেইম চালানোর উপযোগী ‘আইফোন ১৫ প্রো ম্যাক্স’ও আইওএস ২৬-এ দৈনন্দিন ব্যবহারে অতিরিক্ত গরম হওয়া ও ফ্রেম রেট কমে যাওয়ার মতো সমস্যার মুখে পড়েছে।
আইওএস ২৬-এর এসব পারফরম্যান্সজনিত ত্রুটি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছে অ্যাপল নিজেও। তাদের পরবর্তী ‘আইওএস ২৭’ উন্মোচনের পুরো সময় জুড়েই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে সিস্টেমের স্থিতিশীলতা ও গতিশীলতা বাড়ানোর ওপর। প্রাথমিক বিটা টেস্টেই দেখা গেছে, আগের তুলনায় পুরানো বিভিন্ন আইফোন আইওএস ২৭-এ বেশ সাবলীলভাবে কাজ করছে।