১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘সময় ও স্থান’ সংকোচন করতে পারে চীনের এই সুপার মেশিন

পৃথিবীর সাধারণ অভিকর্ষ বলের চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী কৃত্রিম অভিকর্ষ বল তৈরি করতে পারে এ মেশিন।

‘সময় ও স্থান’ সংকোচন করতে পারে চীনের এই সুপার মেশিন
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও ইউরোপীয় স্পেস সংস্থা ইএসএ-এর মতো বিভিন্ন সংস্থা গবেষণার কাজে এসব মেশিন ব্যবহার করে থাকে। ছবি: চায়না সায়েন্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Jan 2026, 12:03 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:33 PM

তিন দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেন্ট্রিফিউজ বা হাইপারগ্র্যাভিটি মেশিন থাকার রেকর্ডটি যুক্তরাষ্ট্রের দখলে থাকলেও ২০২৫ সালে সেই খেতাবটি চীনের কাছে চলে গিয়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিজেদের নতুন হাইপারগ্র্যাভিটি মেশিন ‘সিএইচআইইএফ১৩০০’ চালু করেছে চীন। এ সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির ভিকসবার্গে অবস্থিত ‘আর্মি ইঞ্জিনিয়ার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ বা ইআরডিসি-এর রেকর্ডটি ভেঙে যায়।

তবে ‘সিএইচআইইএফ১৩০০’-এর রাজত্বও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক মাস পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আরও শক্তিশালী এক মেশিন চালু করে চীন, যার নাম ‘সিএইচআইইএফ১৯০০’। বর্তমানে এটিই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেন্ট্রিফিউজ মেশিন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার।

সিএইচআইইএফ-এর পূর্ণরূপ হচ্ছে ‘সেন্ট্রিফিউগাল হাইপারগ্র্যাভিটি অ্যান্ড ইন্টারডিসিপ্লিনারি এক্সপেরিমেন্ট ফ্যাসিলিটি’।

‘হাইপারগ্র্যাভিটি সেন্ট্রিফিউজ’ মেশিন পৃথিবীর সাধারণ অভিকর্ষ বলের চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী কৃত্রিম অভিকর্ষ বল তৈরি করতে পারে। অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ঘোরার মাধ্যমে এসব মেশিন কৃত্রিমভাবে এ শক্তিশালী অভিকর্ষ বল বা ‘গ্র্যাভিটি’ তৈরি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও ইউরোপীয় স্পেস সংস্থা ইএসএ-এর মতো বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় এসব মেশিন কাজে লাগে। ভূমিকম্পের সময় মাটির আচরণ কেমন হয় তা পরীক্ষা, বড় বড় বাঁধ কেন বা কীভাবে ভেঙে যেতে পারে তা গবেষণা এবং উচ্চ অভিকর্ষ বলের পরিবেশে কোনো জ্যান্ত প্রাণীর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে তা পর্যবেক্ষণ করার মতো কাজে এ মেশিন ব্যবহৃত হয়।

হাইপারগ্র্যাভিটি সেন্ট্রিফিউজ যেমন উচ্চ মাত্রার অভিকর্ষ তৈরি করে ঠিক তেমনই এমন কিছু মেশিনও রয়েছে যা পৃথিবীর চেয়েও কম অভিকর্ষ বল, যেমন চাঁদের বা মহাকাশের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

স্থান ও কাল সংকোচনের মানে আসলে কী?

এসব মেশিন স্থান ও কাল সংকোচন করে– এমন দাবি আসলে আমরা যেভাবে কল্পনা করি ঠিক সেভাবে কাজ করে না। এসব মেশিনের অন্যতম প্রধান কাজ বড় কোনো স্থাপনার ছোট মডেল পরীক্ষা করা। উচ্চ অভিকর্ষ বলের প্রভাবে এসব ছোট মডেল ঠিক তেমনই চাপ বা বল অনুভব করে, যা বাস্তবে এক বিশাল স্থাপনা অনুভব করে। এভাবেই ‘স্থান’ সংকুচিত করার কাজ করে এই মেশিন।

উচ্চ অভিকর্ষের ফলে প্রাকৃতিকভাবে ধীরগতির বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত ঘটে। যেমন মাটির নিচে পানি জমা বা মাটির দেবে যাওয়ার মতো ঘটনা, যা বাস্তবে ঘটতে হয়ত বছরের পর বছর সময় লাগত তবে এ মেশিনের ভেতর তা কেবল কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এভাবেই এ মেশিন ‘সময়’ কমিয়ে আনে বা সংকোচন করে।

বিশাল এসব সেন্ট্রিফিউজের সক্ষমতা পরিমাপ হয় ‘গ্র্যাভিটি-টন’ নামের এককের মাধ্যমে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার করি তা যখন সবচেয়ে দ্রুত ঘোরে তখন কেবল ২ গ্র্যাভিটি-টন বল তৈরি করে।

আমেরিকার মিসিসিপিতে থাকা মেশিনটির সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ গ্র্যাভিটি-টন, যা আমাদের সাধারণ জীবনের অভিজ্ঞতার চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি শক্তিশালী। এ রেকর্ডটি নিজের করে নেওয়ার সময় চীনের প্রথম মেশিনটির সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৩০০ গ্র্যাভিটি-টন।

বর্তমানে চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘সিএইচআইইএফ১৯০০’ মেশিনটি আরও অনেক দূর এগিয়েছে। নাম থেকেই বোঝা যায় মেশিনটি সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯০০ গ্র্যাভিটি-টন পর্যন্ত বল তৈরি করতে পারে।

চীনের রেকর্ড তৈরিকারী এ দুটি হাইপারগ্র্যাভিটি সেন্ট্রিফিউজই সিএইচআইইএফ ফ্যাসিলিটিতে অবস্থিত। এ বিশেষ গবেষণাগারটি চীনের হাংঝু শহরের ‘ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি’ ক্যাম্পাসের একটি অংশ, যেটি তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে।

এ ফ্যাসিলিটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মাটির প্রায় ৪৯ ফুট নিচে বসানো হয়েছে এটিকে, যার মূল কারণ এর কম্পন কমানো। এসব সেন্ট্রিফিউজ চলার সময় প্রচণ্ড গতিতে ঘোরার কারণে যে কম্পন তৈরি হয় তা যেন আশপাশের পরিবেশের ক্ষতি না করে বা গবেষণার নির্ভুলতায় বাধা না দেয় সেজন্যই এটিকে মাটির এত গভীরে বসানো হয়েছে।

কয়েকদিন আগে ‘সিএইচআইইএফ১৯০০’ বসানো হলেও এর আগের সংস্করণ ‘সিএইচআইইএফ১৩০০’ এরইমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য তৈরি বড় বড় বাঁধের ভিত্তি কতটুকু ভূমিকম্পের শক্তি সহ্য করতে পারে তা এই মেশিনের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়েছে।

এ ছাড়া, সমুদ্রের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ফুট গভীরতায় যে প্রচণ্ড পানির চাপ থাকে তা কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে পেরেছে মেশিনটি।