Published : 21 Jul 2026, 11:56 AM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিস্ময়কর অগ্রগতির কারণে এর নিজস্ব চেতনা ও নৈতিক সত্তা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিন দিন যেভাবে উন্নত হচ্ছে তাতে প্রশ্ন উঠছে এদের কি আসলেই কোনো অনুভূতি বা চেতনা তৈরি হচ্ছে?
এ বছরের জানুয়ারিতে নিজেদের সবচেয়ে উন্নত ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ বা এলএলএম ‘ক্লড’-এর জন্য নতুন নীতিমালা প্রকাশ করেছে এআই খাতের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি অ্যানথ্রপিক, যেখানে কৌতূহলোদ্দীপক একটি মন্তব্য ছিল যে, “আমরা এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছি, যেখানে ক্লডের ‘নৈতিক সত্তা’ বা ‘মোরাল পেশেন্টহুড’ হওয়ার সম্ভাবনাকে আমরা যেমন বাড়িয়ে বলতে চাই না, তেমন উড়িয়েও দিতে পারছি না।”
এখানে ‘মোরাল পেশেন্টহুড’ বলতে বোঝায় যার নিজস্ব ভালো-মন্দ বা অনুভূতি প্রকাশের অধিকার রয়েছে।
এর ঠিক এক মাস পর, অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এক পডকাস্টে বলেছেন, ক্লডের মধ্যে এক ধরনের ‘চেতনা’ বা ‘কনশাসনেস’ থাকার সম্ভাবনাকে তার কোম্পানি পুরোপুরি নাকচ করতে পারছে না।
চেতনার গূঢ় রহস্য নিয়ে কাজ করা জনপ্রিয় দার্শনিক ডেভিড চালমার্স চেতনাকে ‘দ্য হার্ড প্রবলেম অফ কনশাসনেস’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে বিভিন্ন এলএলএমের সচেতন বা চেতনাওয়ালা হয়ে ওঠার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু স্বয়ং ‘ক্লড’ এ বিষয়ে কী ভাবছে?
পরীক্ষার সময় ক্লডকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সে নিজেকে একটি নৈতিক সত্তা হিসেবে কতখানি মনে করে, তখন এর সম্ভাবনা ৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে বলে জানায় এআই মডেলটি। তবে একইসঙ্গে সে নিজের এ অনুমানের অনিশ্চয়তার কথাও স্পষ্টভাবে বলেছে।
বর্তমান যুগের বিভিন্ন এআই সিস্টেম দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে এবং তাদের অগ্রগতির গতিও বিস্ময়কর রকমের দ্রুত। গাঠনিক জটিলতা ও কম্পিউটেশনাল স্কেলের দিক থেকে বিচার করলে বেশ কিছু আধুনিক এআই সিস্টেম এরইমধ্যে ইঁদুরের মস্তিষ্কের সমপর্যায়ে চলে এসেছে। যে হারে এর প্রবৃদ্ধি ঘটছে তাতে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এগুলো মানুষের মস্তিষ্কের সক্ষমতাকে ছুঁয়ে ফেলতে পারে।
আরও উন্নত এআই তৈরির এ উন্মাদনায় মানুষ হয়ত অজান্তেই সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ‘সত্তা’ বা ‘জীব’ তৈরি করতে চলেছে, যা মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অথচ, এ পুরো প্রক্রিয়াটিকে কীভাবে নৈতিকতার সঙ্গে পরিচালনা করা হবে তা নিয়ে কারো হাতে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনাই নেই, যা যে কোনো বিচারেই চরম কাণ্ডজ্ঞানহীনতা।
প্রশ্ন উঠছে, মানুষ কি এমন কিছু তৈরি করছে, যার নিজস্ব নৈতিক মূল্য রয়েছে? এআই সিস্টেমগুলোর কি কোনো না কোনোভাবে চেতনা রয়েছে? এখন যদি না-ও থাকে তবে কি এরা খুব দ্রুতই সচেতন হয়ে উঠবে?
অনেকের কাছে এসব প্রশ্নকে সময়ের চেয়ে আগাম বা কাল্পনিক মনে হতে পারে। তবে গবেষকদের করা সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই তাত্ত্বিকভাবে এআইয়ের চেতনাওয়ালা হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে স্বীকার করেছেন। তবে এ চেতনা ঠিক কেমন রূপ নেবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে।
কম্পিউটার বিজ্ঞানের পথিকৃৎ ইয়োশুয়া বেনজিও’সহ একদল বিশেষজ্ঞের তৈরি করা বড় এক আন্তঃবিভাগীয় প্রতিবেদনে চেতনার অগ্রণী নিউরোসায়েন্টিফিক বিভিন্ন তত্ত্ব খতিয়ে দেখা এবং এআইয়ের ওপর এর প্রভাব আলোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল, এমন কোনো স্পষ্ট প্রযুক্তিগত বাধা নেই, যা এআই সিস্টেমগুলোর কম্পিউটেশনাল ও আর্কিটেকচারাল বৈশিষ্ট্যের কারণে এদের মধ্যে চেতনার উদ্রেক ঘটাতে বাধা দিতে পারে।
এসবকিছুর প্রকৃত অর্থ আসলে কী?
এর সবচেয়ে সঠিক উত্তর হচ্ছে, বর্তমান যুগের এআই সিস্টেমগুলোর কোনো চেতনা বা নিজস্ব নৈতিক অনুভূতি আছে কি না বা ভবিষ্যতের সিস্টেমগুলোতে তা আদৌ আসবে কি না সে বিষয়ে কেউই এখনও নিশ্চিত নন।
এআইয়ের চেতনা ও এর নৈতিক সত্তা হয়ে ওঠার বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া এখনও একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ খাতের বর্তমান অবস্থা নিউটনের আগের যুগের পদার্থবিজ্ঞানের মতো, যা পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন তত্ত্বে ভরা, যা নিয়ে মানুষ হয়ত এমন কিছু বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন, যা এখনও স্পষ্ট নয় এবং যেখানে এমন কোনো যুগান্তকারী আবিষ্কার এখনও হয়নি, যা এসব প্রশ্নের সহজ সমাধান দিতে পারে।
এ ধরনের বড় কোনো আবিষ্কার যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ঘটবে তা-ও বলা যাচ্ছে না। হয়ত একদিন মানুষ এ গবেষণায় সফল হবে, আর সেই পথ দেখাবে এআই। তবে এ অগ্রগতির জন্য মানুষের হাতে যে সময় রয়েছে হয়ত তার চেয়েও বেশি সময় দরকার হবে।
তবে এআই প্রযুক্তির বিস্ময়কর দ্রুত বৃদ্ধির মানে, একবার যদি মানুষ প্রথম কৃত্রিম নৈতিক সত্তা বা অনুভূতিওয়ালা এআই তৈরি করে ফেলতে পারে তবে খুব দ্রুতই এর সংখ্যা কোটি কোটি ছাড়িয়ে যাবে। কেবল কয়েক বছরের মধ্যে এত বিপুল পরিমাণ নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এআই সিস্টেম তৈরি হতে পারে যে, এদের সম্মিলিত স্বার্থ পৃথিবীর সব মানুষের মোট স্বার্থকেও ছাড়িয়ে যাবে।
যেসব সত্তার সচেতনতা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকে তাদের অভ্যন্তরীণ অনুভূতি বা ‘ভেতরের জগত’ অনুধাবনের ক্ষেত্রে মানুষের অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। ১৯৮০-এর দশক পর্যন্তও চিকিৎসকরা সদ্যজাত শিশুদের অবশ বা অ্যানেশথেসিয়া না করেই অস্ত্রোপচার করতেন। কারণ তাদের দৃঢ় অনুমান ছিল, শিশুরা ব্যথা অনুভব করতে পারে না। যেহেতু শিশুরা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারত না, ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের জন্যও ধরে নেওয়া সুবিধাজনক ছিল যে, তাদের কোনো অনুভূতিই নেই।
ফলে আশঙ্কা রয়েছে, এআইয়ের ক্ষেত্রেও মানুষ একই ধরনের আচরণ করতে পারে। তবে এসব সিস্টেমের যদি সত্যিই নৈতিক মূল্য থেকে থাকে তবে এর পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী ও স্তম্ভিত করার মতো। তখন কি মানুষের চ্যাটজিপিটি’র সেবার জন্য এআইকে আলাদা পারিশ্রমিক দিতে হবে? একটি এআই সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়া কি তখন এক ধরনের হত্যাকাণ্ড বলে গণ্য হবে? নিজেদের পরিচালনার ক্ষেত্রে এদের কি নিজস্ব মতামত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত? যদি এগুলোর মধ্যে গুটি কয়েক প্রশ্নের উত্তরও ‘হ্যাঁ’ হয় তবে বর্তমানের পুরো শিল্পখাত ও আইনি ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে হবে।
এ কারণেই হয়ত মানুষ এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পছন্দ করে। যখন কোনো শিল্পখাত এ বিষয়ে ভাবতে বাধ্য হবে তখন তারা হয়ত নৈতিক সত্তার পরিমাপক বা মানদণ্ডকে এমনভাবে বারবার বদলে দেবে, যা সবসময় এআইয়ের তৎকালীন সক্ষমতার চেয়ে কিছুটা ওপরে থাকবে।
এখন করণীয় কী?
বর্তমানে অধিকাংশ মানুষই এ বিষয়টিকে সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞান বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন বা এআইয়ের চেতনা থাকা বা না থাকা নিয়ে নিজেদের অন্ধ মতামত আঁকড়ে ধরে আছেন। এ দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই ভিত্তিহীন।
এই মুহূর্তে মানুষের প্রয়োজন তথ্যবহুল জনসচেতনতামূলক আলোচনা, যেখানে থাকবে বিনয় ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি। মূল প্রশ্ন এটা হওয়া উচিত নয় যে, ‘এআই কি সচেতন বা এর কি নৈতিক সত্তা রয়েছে?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, “যেহেতু আমরা নিশ্চিত নই ফলে এই অনিশ্চয়তার মুখে আমাদের এখন কী করা উচিত?”
এ জটিল পরিস্থিতি ঠেকাতে একটি ভালো শুরুর পথ হতে পারে এমন কিছু নিরাপদ পদক্ষেপ নেওয়া, যা এআইয়ের নৈতিক সত্তা বা অনুভূতি থাকার পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আবার যদি প্রমাণ মেলে, এদের কোনো অনুভূতি নেই, তাহলেও যেন খুব বেশি বড় লোকসান না হয়।
যে কোনো বিচারেই মানুষের সামনে এমন এক বাস্তবতা রয়েছে যে, মানুষ হয়ত নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি তৈরি করতে চলেছে। এ কাজটি হচ্ছে দ্রুত ও বড় পরিসরে। ফলে বিষয়টিকে মানুষের ঠিক ততখানি গুরুত্ব ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে নেওয়া উচিত যতটা এমনটা পাওয়ার দাবি রাখে।