Published : 20 Jul 2026, 10:07 AM
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সংরক্ষণে বিশ্বজুড়ে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে বালু, গলিত লবণ বা মানুষের দেহের ঘামের মতো সব অদ্ভুত ও অভিনব উপাদান।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিস্তৃত মরুভূমিজুড়ে গড়ে উঠছে বড় এক পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্প, যা আকারে প্রায় ১২ হাজার ৬০০টি ফুটবল মাঠের সমান। এ প্রকল্পের বড় সাফল্য হচ্ছে, এর মাধ্যমে রাতেও প্রায় পাঁচ লাখ বাড়িতে সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
উপসাগরীয় এ দেশটি ৫দশমিক ২ গিগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ সক্ষমতার সঙ্গে ১৯ গিগাওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারি স্টোরেজ যোগ করে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারি স্কিম বা গ্রিড তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
আরব আমিরাতের বড় এ গ্রিড-স্কেলের বিপরীতে, প্রায় সাড়ে সাত হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে ভিন্ন এক বিপ্লব ঘটছে। সেখানকার ‘ন্যাশনাল রিনিউএবল এনার্জি ল্যাবরেটরি’র গবেষকেরা তৈরি করছেন বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র ব্যাটারি।
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সংরক্ষণের বড় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির তুলনায় এগুলো আকারে নগণ্য। কেবল ৩ ইঞ্চি বা প্রায় ৭.৫ সেন্টিমিটার লম্বা স্যামন ও ইল বা বাইন জাতীয় মাছের পোনা ট্র্যাক বা নজরদারির ইলেকট্রনিক ট্যাগের শক্তি জোগাতে এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যাটারি ডিজাইন করেছেন গবেষকরা।
প্রচলিত বিভিন্ন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আকারে বড় বা ছোট হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত সীমা পার করলেও এর ভেতরের কাঁচামাল নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ রয়েছে।
লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের মতো বিরল খনিজ উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ কারণে বিজ্ঞানীরা এমন বিকল্প ব্যাটারি প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন, যা পরিবেশের ক্ষতি না করেই কম-কার্বন শক্তি ধরে রাখতে পারবে।
সাধারণ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চার্জ ও ডিসচার্জের নির্দিষ্ট সীমা থাকে। তবে উদ্ভাবিত এসব বিকল্প ব্যাটারির অনেক প্রযুক্তিই অনির্দিষ্টকাল ধরে ব্যবহার করা সম্ভব। ২০ বছরের কর্মসক্ষম আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পরও এগুলো ফের ব্যবহার করা যায়।
বর্তমানে পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি, হিটিং নেটওয়ার্ক, কলকারখানা থেকে শুরু করে সামরিক ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি জোগাতে ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সঞ্চয় করতে হরেক রকমের উপাদানের দিকে ঝুঁকছেন গবেষকরা। জ্বালানি সংরক্ষণের এসব নিত্যনতুন উদ্ভাবন এখন প্রযুক্তি বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে।
জ্বালানি সংরক্ষণের এমন কিছু চোখ কপালে তোলা উদ্ভাবন এইরকম –
তরল বাতাস থেকে বিদ্যুৎ
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের ট্রাফোর্ডে সাবেক কয়লাভিত্তিক এক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জায়গায় গড়ে উঠছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক অভিনব জ্বালানি সংরক্ষণ প্রকল্প।
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের মতে, “এ দশকটি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জন্য ভিক্টোরিয়ান আমলের পর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর সময় হতে যাচ্ছে।”
ব্রিটিশ স্টার্টআপ ‘হাইভিউ পাওয়ার’-এর তৈরি ‘ক্যারিংটন’ নামের এ ‘লিকুইড এয়ার’ বা তরল বাতাসের ক্রায়োব্যাটারি প্রকল্পটিকে কাউন্টির ‘শিল্পায়নে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে’। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তিকে তরল বাতাস হিসেবে জমা করে রাখা হবে, যা কয়েক ঘণ্টা, দিন ও কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।
প্রযুক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এর পেছনের বিজ্ঞান বেশ জটিল। অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বাতাসকে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা হয়। এ চরম হিমাঙ্কে বাতাস তরলে পরিণত হলে এর আয়তন মূল বাতাসের তুলনায় ৭০০ ভাগের এক ভাগে নেমে আসে।
এ তরল বাতাসকে বিশালাকার ট্যাংকে জমিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিলে বা বাজারের দাম বাড়তে শুরু করলে এ তরল বাতাসকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এনে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করা হয়।
গ্যাসে রূপান্তরের সময় বাতাস দ্রুত গতিতে প্রসারিত হয়ে টারবাইনকে ঘোরায়, যা থেকে প্রথাগত গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো কোনো ক্ষতিকর নির্গমন ছাড়াই বিপুল বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
এ বছরের শেষ নাগাদ এ পরিবেশবান্ধব ক্রায়োব্যাটারি প্রকল্পটি পুরোপুরি চালুর কথা রয়েছে। কার্যক্রম শুরু হলে একটানা ছয় ঘণ্টার জন্য ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে, যার মোট স্টোরেজ সক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা।
এ পরিমাণ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি দিয়ে অনায়াসে প্রায় পাঁচ লাখ বাড়িতে বিদ্যুৎ সুবিধা দেওয়া সম্ভব। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে গ্রিডের ভারসাম্য ধরে রাখতে এ লিকুইড এয়ার প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
গলিত লবণ প্রযুক্তি
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে যখন হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় শক্তি বা এনার্জি সংরক্ষণের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা মরুভূমিতে দেখা গেছে ঠিক এর উল্টো চিত্র। সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পদ্ধতিতে তীব্র তাপকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সফল প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছে।
নেভাদার ‘ক্রেসেন্ট ডিউনস’ প্রকল্পে ১০ হাজার আয়না বা প্যানেল ব্যবহার করে সৌরশক্তি সংগ্রহ করা হচ্ছে। গত এক দশক ধরে এ প্রযুক্তি সূর্যের তাপকে কাজে লাগিয়ে পটাশিয়াম ও সোডিয়াম নাইট্রেটের এক বড় আধারকে ৫৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে রাখছে।
সূর্যাস্তের পর টানা ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত এ তীব্র তাপমাত্রা ধরে রাখা সম্ভব। পরবর্তীতে এ সঞ্চিত তাপ শক্তিকে প্রথাগত স্পিনিং টারবাইনে চালনা করে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়। পরিবেশবান্ধব জ্বালানিকে তাপ হিসেবে সংরক্ষণের এ বিশেষ পদ্ধতিটিই ‘মোল্টেন সল্ট স্টোরেজ’ বা গলিত লবণ প্রযুক্তি নামে পরিচিত।
গলিত লবণের বিভিন্ন ব্যাটারি বেশিরভাগ আধুনিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রের মূল শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। এগুলো ‘রিজার্ভ ব্যাটারি’ হিসেবে কাজ করে, যা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় শক্তি ধরে রাখে।
অস্ত্রটি উৎক্ষেপণের সময় যে তীব্র আতশবাজি সদৃশ তাপ উৎপন্ন হয় তা এ গলিত লবণের ব্যাটারিকে সক্রিয় ও তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল শক্তি অবমুক্ত করে।
এ দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ডেনমার্ক প্রমাণ করেছে, ভারী বিভিন্ন শিল্পকারখানাকে কার্বনমুক্ত করার ক্ষেত্রেও এ গলিত লবণ প্রযুক্তি বড় সমাধান হতে পারে।
উইন্ড পাওয়ার বা বায়ু বিদ্যুতে শীর্ষস্থানীয় এ দেশটি সম্প্রতি এক গিগাওয়াট-ঘণ্টা সক্ষমতাওয়ালা গলিত লবণের ব্যাটারি প্রকল্প উন্মোচন করেছে।
এ প্রকল্পে লবণকে প্রায় ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উত্তপ্ত করে টানা দুই সপ্তাহ পর্যন্ত পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ জমা রাখা যায়। যখনই প্রয়োজন হয় এ উত্তপ্ত লবণ একটি জেনারেটরের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়ে উচ্চ-তাপমাত্রার বাষ্প তৈরি করে, যা সরাসরি বিভিন্ন শিল্পকারখানায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
বালু ও ঘাম থেকে বিদ্যুৎ
লবণ উত্তপ্ত করে বিদ্যুৎ ধরে রাখার মতোই পরিবেশবান্ধব জ্বালানি এবার বালুর মধ্যেও সফলভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ফিনল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের ছোট শহর পোরনাইনেনে হাজার হাজার টন বালু ব্যবহার করে তাপ শক্তি ধরে রাখা হচ্ছে, যা দিয়ে স্থানীয় স্কুল, লাইব্রেরি ও টাউন হলগুলো উত্তপ্ত রাখা হয়।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ফলে ওই অঞ্চলে হিটিং নেটওয়ার্কে তেলের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ ও কাঠের গুড়ার ব্যবহার প্রায় ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
পোরনাইনেনের এ ‘স্যান্ড ব্যাটারি’তে পরিবেশবান্ধব জ্বালানিকে তাপ হিসেবে ধরে রাখতে প্রায় দুই হাজার টন গুঁড়া সাবানপাথর ব্যবহৃত হয়েছে, যা এক মেগাওয়াট তাপীয় শক্তি ও একশ মেগাওয়াট-ঘণ্টা স্টোরেজ সক্ষমতা দিতে পারবে।
প্রায় ১৩ মিটার উঁচু ও ১৫ মিটার চওড়া এ বড় ব্যাটারিটি গ্রীষ্মকালে পোরনাইনেন শহরের প্রায় এক মাসের ও শীতকালে প্রায় এক সপ্তাহের তাপের চাহিদা একাই মেটাতে পারে।
২০২২ সালে দেশটির তৈরি করা আগের সংস্করণের চেয়ে এ ব্যাটারিটি আকারে প্রায় ১০ গুণ বড়, যা দেশজুড়ে কার্বন নির্গমন হ্রাসে বালুর ব্যাটারির বিপুল সম্ভাবনার কথাই জানান দিচ্ছে।
গায়ের ঘামই হবে ব্যাটারির বিকল্প
এদিকে, জাপানের ‘টোকিও ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স’-এর গবেষকেরা এক অভিনব প্রযুক্তির সন্ধান করছেন, যেখানে কীভাবে মানুষের দেহের ঘামকে পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মানুষের দেহকে নিরবচ্ছিন্ন শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচনা করে বিজ্ঞানীরা এমন স্মার্ট ডিভাইস বা সেন্সর তৈরি করতে চাইছেন, যা চার্জ করার জন্য কোনো বাড়তি ভারী ব্যাটারির প্রয়োজন হবে না। এর অংশ হিসেবে তারা পাতলা এক পরিধানযোগ্য প্যাচ তৈরি করেছেন, যা সরাসরি মানুষের ঘাম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।
এ প্যাচটিতে ‘এনজাইমেটিক বায়োফুয়েল সেল’ ব্যবহৃত হয়েছে, যা ঘামে থাকা রাসায়নিক উপাদান, বিশেষ করে ল্যাকটেট সংগ্রহ করে সেটিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে।
ঘাম যখন এ কোষের সংস্পর্শে আসে তখন প্যাচে থাকা বিভিন্ন এনজাইম একটি জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায় ও ইলেকট্রন ছাড়ে। ফলে কোনো বাহ্যিক পাওয়ার সোর্স বা চার্জার ছাড়াই কেবল হাঁটাচলা, ব্যায়াম বা দৈনন্দিন কাজের সময় দেহর থেকে বের হওয়া ঘাম দিয়েই অনায়াসে বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব।