১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিবকে গৃহবন্দি রাখার অনুমতি দিলেন রাজা

রাজা সুলতান ইব্রাহিমের শর্তসাপেক্ষ ক্ষমায় নাজিব রাজাক কারাগারের পরিবর্তে গৃহবন্দি থেকে ২০২৮ সালের ২৩ অগাস্ট পর্যন্ত সাজার বাকি মেয়াদ কাটাতে পারবেন।

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিবকে গৃহবন্দি রাখার অনুমতি দিলেন রাজা

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 18 Sep 2026, 09:52 PM

Updated : 18 Sep 2026, 10:26 PM

মালয়েশিয়ার কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে বাকি সাজা গৃহবন্দি অবস্থায় কাটানোর অনুমতি দিয়েছেন দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিম।

কয়েকশ কোটি ডলারের ওয়ানএমডিবি দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার কারণে নাজিব রাজাককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

দ্বিতীয়বারের মতো রাজকীয় ক্ষমার আওতায় নাজিব এবার কারাগারের পরিবর্তে তার সাজার মেয়াদের বাকি সময় নিজের বাড়িতে বন্দি অবস্থায় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন।

এর আগে প্রথম রাজকীয় ক্ষমার আওতায় নাজিবের কারাদণ্ডের মেয়াদ ১২ বছর থেকে অর্ধেক কমিয়ে ৬ বছর করা হয়েছিল এবং ধার্য জরিমানাও কমানো হয়েছিল।

নাজিব রাজাক ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

তিনি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারী ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদের (ওয়ানএমডিবি) একটি ইউনিট থেকে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধে ২০২০ সালে দোষী সাব্যস্ত হন।

তবে নাজিব শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

শুক্রবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আইন বিভাগ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রাজা সুলতান ইব্রাহিম নাজিব রাজাককে শর্তসাপেক্ষ ক্ষমা করতে রাজি হয়েছেন।

এর ফলে ২০২৮ সালের ২৩ অগাস্ট পর্যন্ত নাজিব গৃহবন্দি থেকে বাকি সাজা ভোগ করতে পারবেন। তবে তাকে শর্ত অনুযায়ী, আদালতের বেঁধে দেওয়া ৫ কোটি রিঙ্গিত জরিমানা পরিশোধ করতে হবে।

নাজিব প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ২০০৯ সালে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ওয়ানএমডিবি নামে এই সার্বভৌম ফান্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু ২০১৫ সালে ব্যাংক ও বন্ডহোল্ডারদের পাওনা অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর ওই তহবিল নিয়ে প্রশ্ন শুরু হয়।

আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর তদন্তকারী অন্যতম দেশ যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের পর তারা জানায়, এই তহবিলের সাড়ে চারশ কোটি ডলার আত্মসাৎ করা হয়েছে। সেই টাকা বিলাসবহুল বাড়ি, প্রাইভেট জেট, দামি শিল্পকর্ম কেনায়, এমনকি হলিউডের সিনেমা প্রযোজনাতেও খরচ হয়েছে।

‘মালয়েশিয়ার এক নম্বর কর্মকর্তা’ হিসেবে চিহ্নিত এক ব্যক্তি ওয়ানএমডিবি থেকে ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার গ্রহণ করেছেন বলে সে সময় জানান মার্কিন তদন্তকারীরা। পরে জানা যায়, ওই ‘ব্যক্তি’ খোদ নাজিব রাজাক। তবে নাজিবের দাবি, তিনি বিশ্বব্যাপী ছড়ানো এই জটিল ষড়যন্ত্রের বলির পাঁঠা হয়েছেন।

গত বছর ডিসেম্বরে ওয়ানএমডিবি সংক্রান্ত আরেকটি পৃথক মামলায় ক্ষমতা অপব্যবহার ও অর্থ পাচারের দায়ে নাজিবকে নতুন করে ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ২৮০ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।

কারাবন্দি থাকলেও ৭৩ বছর বয়সী নাজিব দেশটির রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও মেরুকরণ সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বহুদলীয় জোট সরকারের অন্যতম প্রধান শরিক দল ‘ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন’ (আমনো)-তে তার শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে।

আনোয়ারের নিজ দল ‘পাকাতান হারাপান’ জোট নাজিবের প্রতি কোনো প্রকার শিথিলতা প্রদর্শনের বিরোধী। ফলে এই রাজক্ষমার সিদ্ধান্ত আনোয়ার প্রশাসনের ভেতর ফাটল আরও চওড়া করতে পারে।

আগামী ২০২৮ সালের আগে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা না থাকলেও আনোয়ার জানিয়েছেন, জোটের ভেতরে ফাটল বাড়লে তিনি আগাম নির্বাচনের কথা বিবেচনা করতে পারেন।

শুক্রবার আনোয়ার জনগণকে রাজার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, তার সরকার দুর্নীতি দমনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মালয়েশিয়া "চৌর্যবৃত্তি ও দুর্নীতির কাছে নতি স্বীকার করবে না" বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, "যেকোনো নেতা বা নাগরিককে আর্থিকভাবে লাভবান করতে অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টিকে এ দেশ আর হালকাভাবে নেবে না। এটাই আমাদের অবস্থান।"

২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হলে প্রতিদ্বন্দ্বী আমনোর সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করে পাকাতান। তবে নাজিবের প্রতি আচরণের ইস্যুসহ বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের জেরে জোটের সম্পর্ক এখন বেশ নাজুক।

আনোয়ারের জনসমর্থন আগের চেয়ে কমেছে এবং আগাম নির্বাচন ডাকা হলে তার জোট কেমন ফল করবে তা স্পষ্ট নয়। গত দুই মাসে রাজ্য নির্বাচনগুলোতে আমনোর ‘বারিসান ন্যাশনাল’ জোটের কাছে দুইবার বড় ব্যবধানে হেরেছে আনোয়ারের পাকাতান জোট।

আমনোর ‘বিশাল বিজয়’

আমনোর সভাপতি আহমদ জাহিদ হামিদি রাজার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, গৃহবন্দিত্বের শর্ত হিসেবে থাকা ৫ কোটি রিংগিত (১ কোটি ২২ লাখ ডলার) জরিমানা পরিশোধে নাজিবকে সহায়তা করতে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে একটি তহবিল গঠন করা হবে।

ফেইসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, "এই উন্নয়ন তার (নাজিব) এবং তার পরিবারের জন্য, সেইসঙ্গে পুরো আমনো পরিবারের জন্য অপরিসীম তাৎপর্য বহন করে, যারা এই পুরোটা সময় আশা ছাড়েনি এবং প্রার্থনা করে গেছে।"

আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে নাজিব ঠিক কবে নাগাদ কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নিজ বাসভবনে যাবেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে নাজিবের আইনজীবীরাও কোনো সাড়া দেননি।

আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শায়জা শুকরি বলেন, এই রাজক্ষমা আনোয়ারের জন্য একটি দুঃসংবাদ এবং আগামী নির্বাচনের আগে নাজিবের দল আমনোর জন্য বড় আশীর্বাদ।

তিনি বলেন, "আনোয়ার ও তার সরকারের ওপর এর প্রভাব খুবই নেতিবাচক হবে, যদি না তারা জনগণকে সংবিধানের বাধ্যবাধকতা ও নিজেদের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি ঠিকমতো বোঝাতে পারেন।"

তিনি আরও বলেন, "এটি আমনোর জন্য একটি বিশাল বিজয়। এর ফলে তারা আগামী দিনে নিজেদের সুবিধামতো কাজ হাসিল করতে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী বোধ করবে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে তারাই যেন আগামী সরকার গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে।"